advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল সাহেদ

সাতক্ষীরা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও সাতক্ষীরা
১৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২০ ২৩:২১
advertisement

বোরকা পরে অবৈধভাবে দেশত্যাগের সময় রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গতকাল বুধবার ভোরে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্তবর্তী কোমরপুর গ্রামের লবঙ্গবতী নদী এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে তাকে নিয়ে তার উত্তরার কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‌্যাব।

সাহেদকে ঢাকায় আনার পর তার ছবি তোলার সময় সাংবাদিকদের উদ্দেশে সাহেদ বলেন, আমারও পত্রিকা আছে। এভাবে আমার ছবি তোলা দেখিয়ে দেব। আমাকে ছয় মাসের বেশি আটকে রাখা যাবে না।

অভিযান শেষে গতকাল বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর উত্তরার র‌্যাব সদর দপ্তরে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, সাহেদকে ধরতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। সাহেদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মাসুদ পারভেজকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সাহেদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার দেশত্যাগের পরিকল্পনার তথ্যও জানান। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাতক্ষীরার সীমান্ত এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের

পর তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনা হয়। তার উত্তরার কার্যালয় থেকে এক লাখ ৪৬ হাজার জালটাকা উদ্ধার করা হয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে র‌্যাবের ডিজি বলেন, সাহেদ অনেক কিছু বলেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাবে না।

পলাতক অবস্থায় সাহেদ কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির আশ্রয়ে ছিলেন কিনা জানতে চাইলে র‌্যাবের ডিজি বলেন, তাকে কেবল গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার সঙ্গে কথা বললে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। সে কখনো নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত বা কখনো চাকরিরত সেনা কর্মকর্তা, কখনো মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, কখনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পরিচয় দিত বলে জানতে পারি। সে নিজেকে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করলেও প্রকৃত অর্থে সে একজন ধুরন্ধর লোক।

র‌্যাবের ডিজি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে সাহেদ বলেছেÑ ঢাকাসহ কক্সবাজার, কুমিল্লা, সাতক্ষীরার বিভিন্ন অঞ্চলে সে আত্মগোপন করেছিল। বিভিন্নভাবে যানবাহন ব্যবহার করেছে। কখনো হেঁটে, কখনো ট্রাকে; আবার কখনো ব্যক্তিগত গাড়িতে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছে।

র‌্যাবপ্রধান জানান, রিজেন্ট হাসপাতাল থেকে কোভিড ১৯-এর প্রায় ১০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করে ছয় হাজারের মতো ভুয়া রিপোর্ট দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে তারা জানতে পেরেছেন। এ ছাড়া সাহেদ একদিকে রোগীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে টাকা চেয়ে বিল জমা দিয়েছেন। রিকশাচালক, বালু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসার নামে প্রতারণা ছাড়াও এমএলএম ব্যবসার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার খবরও মিলেছে।

তার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে, তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি আল মামুন। তিনি বলেন, ৫০টির অধিক মামলা আছে, এ রকম শোনা গেছে। আমরা যাচাই করে দেখছি।

সাহেদ গ্রেপ্তার হওয়ার খবরে ভুক্তভোগী অনেকেই র‌্যাব কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ করছেন। সে বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন জানতে চাইলে র‌্যাবের ডিজি বলেন, যারা আসছেন, তাদের আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার বলেন, দালালের মাধ্যমে লবঙ্গবতী নদীর ইছামতি খাল দিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন সাহেদ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ২টা থেকে ওই এলাকায় অভিযান শুরু করেন র‌্যাব সদস্যরা। কিন্তু সে ঘন ঘন স্থান পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তার করতে একটু সময় লেগেছে।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেমের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, চেহারা পরিবর্তন আনার জন্য সাহেদ চুলে কলপ করিয়েছিলেন। গোঁফও ছেঁটেছিলেন। বোরকা পরিহিত অবস্থায় নৌকায় করে পাশের দেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সাহেদকে ঢাকায় আনার পর গতকাল সকালে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর সড়কের ৬২ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় র‌্যাব। সেটি সাহেদের আরেকটি অফিস। ওই বাড়িতে অভিযানের সময় বাড়ির সামনে গণমাধ্যমকর্মীরা ভিড় করেন। পরে বাড়ি থেকে জালটাকাসহ বেশ কিছু আলামত জব্দ করার কথা জানায় র‌্যাব।

র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাহেদ গ্রেপ্তারে এড়াতে গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আত্মগোপন করেছিলেন। সবশেষ তিনি সাতক্ষীরা গিয়ে ঘাঁটি গাড়েন। লক্ষ্য অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পাড়ি জমানো। এ জন্য সাতক্ষীরার নির্জন এক মাছের ঘেরে ছিলেন তিনি। বিনিময়ে ঘেরের সংশ্লিষ্টদের কিছু টাকা দেন সাহেদ। সাহেদকে প্রায় ১২ ঘণ্টা নিজেদের হেফাজতে রেখে সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে তুলে দেয় র‌্যাব। র‌্যাবের মামলাটি এখন ডিবিই তদন্ত করছে। তবে মামলাটির তদন্তের ভার চেয়ে আবেদন করবে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

এদিকে সাহেদের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে তার প্রতারণার শিকার হওয়া অনেকেই ছুটে যান র‌্যাব সদর দপ্তরে। এমন একজন শামসুল মাওলা। সিলেটের এই ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাহেদ ২০১৯ সালে ৩০ লাখ টাকার পাথর কেনেন। কিন্তু মূল্য পরিশোধ করেননি আজও। এই ব্যবসায়ী বলেন, সাহেদ কথা বলেন ভালো ভালো, আর কাজ করেন জঘন্য। তার বিচার চাই। আমার টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

গত ৭ জুলাই রাজধানীর উত্তরার কোভিড ডেডিকেটেড রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালান র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান পরিচালনাকালে উঠে আসে হাসপাতালের অনিয়মের ভয়াবহ সব তথ্য। পরীক্ষা না করেই দেওয়া হতো করোনা পজিটিভ-নেগেটিভ রিপোর্ট। পরে রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুরের শাখা দুটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। আর করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণাসহ নানা অভিযোগে সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করে র‌্যাব। এ মামলার আসামির মধ্যে শীর্ষ দুজন হলেন সাহেদ ও সহযোগী মাসুদ। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে মাসুদকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাবের সাতক্ষীরা কোম্পানি কমান্ডার বজলুর রশীদ বলেন, দেবহাটা উপজেলার কোমরপুর বেইলি ব্রিজের দক্ষিণ পাশের লবঙ্গবতী নদীর পাড় থেকে সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। নদীর ধারে একটি নৌকা ছিল। ওই নৌকায় উঠে বোরকা পরে ভারতে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাহেদ। ঠিক সেই সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হ্যান্ডক্যাফ পরিয়ে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে যায় র‌্যাব।

র‌্যাবের সদর দপ্তরের কর্নেল তোফায়েল আহমেদ বলেন, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে সাহেদ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাচ্চু নামের একজন মাঝি তাকে নদী পার করে দিচ্ছিল। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে বাচ্চু সাঁতরে ভারতে চলে গেছে। সাহেদকে চেনার উপায় ছিল না জানিয়ে কর্নেল তোফায়েল বলেন, তার গোঁফ কামানো ছিল আর চুল কালো করা ছিল।

advertisement