advertisement
advertisement

১৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প তবু জলাবদ্ধ সিলেট নগরী

সজল ছত্রী সিলেট
১৬ জুলাই ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২০ ২৩:৩২
advertisement

সিলেট নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে ১১ বছরে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। এর বিনিময়ে বাস্তবতায় নগরবাসী যা পেয়েছেন তা হলো শুকনোয় ধুলা আর বর্ষায় জলকাদা। গত কদিনের থেমে থেমে বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ গলিতে এখন হাঁটুপানি। ডুবেছে অনেক প্রধান সড়কও। অন্তত ২০টি এলাকায় বাসাবাড়িতে ঢুকেছে নর্দমার নোংরা পানি। প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক ব্যবসায়ী।

গতকাল নগরীর তালতলা, উপশহর, যতরপুর, কানিশাইল, মীরাবাজার, জামতলা, তেররতন, সুবিদবাজার এলাকা ঘুরে ও এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল এক সপ্তাহ ধরেই তারা পানির মধ্যে বসবাস করছেন। এসব এলাকার ড্রেন উপচে সড়ক ভাসিয়ে বাসাবাড়িতে ঢুকেছে পানি।

সোবহানিঘাট এলাকার বাসিন্দা সালমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাতে বৃষ্টি এলে ঘুমাতে পারি না। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে জেগে থাকতে হয়। কখন পানি ঘরের ভেতর ঢোকে তার ঠিক নেই। নোংরা পানি ঘরে ঢোকায় আশপাশের অনেকে তো বাড়িই ছেড়েছে।

এলাকার দর্জি মাহবুব আলী বলেন, কাউন্সিলরকে অভিযোগ করেছিলাম, তিনি বলেছেন তার ঘরেও নাকি পানি ঢুকেছে; কিছু করার নেই।

উপশহরের বাসিন্দা মাসুক আমিন বলেন, উপশহর নাকি অভিজাত এলাকা! অথচ সবকিছু অপরিকল্পিত। কয়েক ঘণ্টা ভারী বৃষ্টি হলেই উপশহর ডুবে যায়। নদীতে পানি বেশি হলে উপশহরের জমা পানি নামতে সময় লাগে অন্তত তিন দিন।

নগরবাসীর অভিযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংস্কার না হওয়া, শহরজুড়ে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি আর ছড়া-খাল দখলের কারণে অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যাওয়া নগরবাসীর নৈমত্তিক নিয়তি হয়ে পড়েছে।

শহর ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ প্রধান সড়কেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও সড়ক প্রশস্তকরণ, কোথাও বা নানান ধরনের লাইন সরানোর কাজ চলছে। ভরাবর্ষায় কোথাও চলছে নতুন ড্রেন তৈরির কাজ। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা উপশহরের। অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকার সব সড়কই নোংরা পানির নিচ তলিয়ে আছে।

নগরবাসীর ভোগান্তি বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, উপশহরের পরিকল্পনাতেই ভুল। একটি হাওর ভরাট করে শহর করা হয়েছে, পানি নেমে যাওয়ার কোনো পথ নেই। আর সুরমা নদী খনন হয়নি একশ বছরেও। আমি যতই ড্রেন সংস্কার করি না কেন, কোনো সুফল আসবে না। সুরমা নদী খনন করতে হবে। তা না হলে শহরের বৃষ্টির পানি কোথায় যাবে?

ড্রেন আর খোঁড়াখুঁড়ির জন্য জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সিলেট শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন ভালো। খোঁড়াখুঁড়ি কিছু আছে। শহরে মাটির নিচ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন টানা হচ্ছে, সড়ক বড় করা হচ্ছে। অনেক কাজ চলছে একসঙ্গে। এর মধ্যে করোনার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যায় মাঝপথে। সেজন্য কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। বৃষ্টি কিছুটা কমে এলে দ্রুত কাজ করা হবে।

প্রশ্ন উঠেছে জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েও। ছড়া উদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এতো প্রকল্প সত্ত্বেও জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি না মেলায় প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইসঙ্গে নগরীর অপরিকল্পিত উন্নয়নকেও দায়ী করেছেন অনেকে।

সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে সুরমা নদী ছাড়াও প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় ১৪টি ছড়া ও খাল। মূলত প্রভাবশালীরা ছড়া ও খালগুলো দখল করে রাখায় বর্ষা মৌসুমে লেগে থাকে জলাবদ্ধতা।

৭২ কিলোমিটারের এসব ছড়া-খাল উদ্ধার, সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যে গত ১১ বছরে নেওয়া হয় তিনটি প্রকল্প। ২০০৯ সালে নগরীর ছড়াগুলো উদ্ধারে ১১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করে সিলেট সিটি করপোরেশন। এর পর ২০১৩ সালে একই লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয় ২০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। এর পর ২০১৬ সালে নেওয়া হয় ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প। এর মধ্যে এই তিনটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। গত ডিসেম্বরে অনুমোদন মিলেছে ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প। এতো প্রকল্প সত্ত্বেও জলবদ্ধতার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না নগরবাসী।

এ প্রসঙ্গে সিসিক মেয়র বলেন নিচু এলাকায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা হয়। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি। এই দুর্ভোগ লাঘবে প্রতিটি এলাকায় গভীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন খাল ও ছড়া উদ্ধার করে সেগুলো পরিষ্কার করে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে সিসিক কাজ করে যাচ্ছে। আর ১২০০ কোটি টাকার যে প্রকল্প তার টাকা এখনো আমরা হাতে পাইনি। করোনার প্রভাবে সেটি নাকি সি ক্যাটাগরির প্রায়োরিটিতে চলে গেছে। কবে এই টাকা পাব তার তো ঠিক নেই।

তিনি বলেন, আমরা বসে নেই। নগরীতে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান। আর সেজন্যই কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে। বৃষ্টি কমে এলে কাজের বাস্তবায়ন দেখতে পারবে মানুষ; কিন্তু নিচু এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে সুরমা নদী খনন ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় শহরের পানি তো নামছেই না উল্টো কোথাও কোথাও নদীর পানি শহরে প্রবেশ করছে। যে ছড়া-খাল দিয়ে সিলেট নগরীর পানি নদীতে নামে তার অনেকাংশই উদ্ধার হয়েছে; কিন্তু নদী ভরাট থাকলে পানি নামতে পারবে না।

advertisement