advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শিক্ষকদের হতে হবে বন্ধুর মতো

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ
২৭ জুলাই ২০২০ ১৭:২১ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২০ ১৭:২৫
advertisement

এভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রধান নির্বাহী ও হেড অব স্কুল মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ। তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের লোকাল ফেসিলিটেটর হিসাবে কাজ করছেন এক যুগ ধরে। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বক্তা হিসেবে অংশ নেন মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব শিক্ষা সম্মেলনে। একই বছর তিনি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডুকেশন লিডারস কনফারেন্সে যোগ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও লক্ষ্য নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন এবং দুবাইয়ের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় আমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি আমন্ত্রিত হয়ে সবার জন্য শিক্ষা বিষয়ের ওপর বক্তব্য দিয়ে প্রায় ১০০ দেশের আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে প্রশংসিত হন।

তিনি এরই মধ্যে ৩৩টি একাডেমিক বই রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। ভিন্ন ধারার ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থার সাথে ইসলামী শিক্ষার সুন্দর সমন্বয় করে দেশে-বিদেশে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন এই সফল উদ্যোক্তা৷  আমাদের শিক্ষার একাল-সেকাল, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক উন্নয়ন, সংকট, শিক্ষা, দুর্নীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ে কথা বলেন। কথা বলেছেন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, এমনকি বর্তমান নেতৃত্ব প্রসঙ্গেও। সেসব আলাপচারিতার মধ্য থেকে দেশের এই প্রথিতযশা তরুণ শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগের সাক্ষাৎকারটি দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

*বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? 

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ : আমরা বাঙালি জাতি এখন সুবর্ণ রেখায় স্বর্ণালি সময় পার করছি। দেশ এখন যথাযথ নেতৃত্বের ভেতর দিয়েই যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর দীর্ঘ সময় আমরা অন্ধকারে ছিলাম, দেশ উল্টো রথের চাকায় চলছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেওয়ার পর, তিনি বিরোধী দলেই থাকুন আর ক্ষমতায় থাকুন, আমরা সঠিক নেতৃত্ব পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তথা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নপূরণে আমরা কাজ করার প্রয়াস পাচ্ছি। কিন্তু কিছু অনিয়ম, দুর্নীতি তো রয়েছেই; যে কারণে আমরা বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকি। তবে বাঙালি পরিশ্রমী জাতি, সাধারণ মানুষ কষ্টসহিষ্ণু, বিপরীতে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের অন্যায়-দুর্নীতি আমাদের আটকে রাখতে পারবে না। আমরা এগিয়ে যাবই। আর এ জন্যই আমাদের বন্ধবন্ধুর দেখিয়ে যাওয়া পথ অনুসরণ করতে হবে। তার আদর্শকে লালন করতে হবে। তবেই আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারব, সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

*শিক্ষকদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: শিক্ষকরা কখনো বিচারকের মতো আচরণ করবেন না। তাঁদের হতে হবে বন্ধুর মতো। শিক্ষককে ধৈর্যশীল ও স্নেহশীল হতে হবে। শিক্ষককে আস্থা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে একজন শিক্ষার্থীর মন জয় করতে হবে। এটা না হলে তিনি আর শিক্ষক থাকবেন না। একজন শিক্ষক হওয়া মাত্রই তাঁকে জানতে হবে, তাঁর টাকা-পয়সা বেশি হবে না। শিক্ষার্থীদের মন জয় করতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে, ভালোবাসতে হবে। যেকোনো সমস্যা আদরের মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে। এ ছাড়া কাউকে অপমান করার অধিকার কোনো শিক্ষকের নেই। একটা স্কুল হচ্ছে একটা বাচ্চার সেকেন্ড হোম। এখানে এসে যদি একজন শিক্ষার্থী শাস্তি পায় তাহলে সে তার ভুবনটা হারাবে।

* বর্তমানে শিক্ষকরা যন্ত্রে পরিণত হয়েছেন। তাঁরা প্রাইভেট-টিউশনিতে ব্যস্ত, আপনার মতামত কী?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ:  আমরা জানি যে, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর এই মেরুদণ্ডের প্রাণ হচ্ছে শিক্ষকরা। প্রাইভেট-টিউশনিতে কিছু সংখ্যক  শিক্ষক ব্যস্ত থাকে সত্য তবে এই সংখ্যা মোট শিক্ষকের ২০ থেকে ২৫ শতাংশের বেশি হবে না। তবে একটা প্রতিষ্ঠানকে বা এর শিক্ষার্থীর মেধাকে ধ্বংস করতে এই সংখ্যাই যথেষ্ট। এটার জন্য অনেকসময় অভাবাবকরা দায়ী থাকেন। আমি জানি এখন বেশিরভাগ বড় স্কুলগুলি প্রাইভেট বা টিউশনিকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন তথাপি কিছু সংখ্যক অভিবাবক স্কুলের চোখ ফাঁকি দিয়েও তাদের বাচ্চাদের জন্য প্রাইভেট-টিউশনির  ব্যবস্থা করে থাকেন।

*দিন দিন শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন কেন?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ : এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে,  শিক্ষার হারের সঙ্গে শিক্ষার মানও এখন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে যারা উদারনৈতিক নয়, তারাই মূলত এই প্রশ্নগুলো তুলছেন। বর্তমান সময়ের শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি বোঝেন ও অনেক বেশি জানেন, এ ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। সময় যতই সামনের দিকে গড়াচ্ছে গোটা বিশ্ব ততই ছোট হয়ে আসছে। সুতরাং গোটা বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের আরও বেশি পুঙ্খানুপঙ্খরূপে ধারণা রাখতে হবে। আমাদের জানতে ও বুঝতে হবে বিশ্বের কোথায়, কখন, কী ঘটছে। জাতির বিবেককে জাগ্রত করতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শিক্ষক, ব্যবসায়ী, তরুণসমাজের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তার এ বক্তব্যকে আমি স্বাগত জানাই। দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে বিষয়গুলো তার নজরে এসেছে। তিনি মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে বলেছেন। কতিপয় শিক্ষকের অশিক্ষকসুলভ আচরণের দায় পুরো শিক্ষকসমাজকে নিতে হচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থের ওপরে দেশের স্বার্থ। এই সত্য শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষকে অনুধাবন করতে হবে। ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগ করতে হবে। নিজের স্বার্থ উদ্ধারে শিক্ষকতার মতো মহৎ পেশাকে কলঙ্কিত করা যাবে না।

*শিক্ষা ব্যবস্থায় বঙ্গবন্ধুর যে আদর্শের কথা আমরা জানি বা বলে থাকি, সেই আদর্শ কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে মনে করেন?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ : প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে পিতার অনেক কিছুই বাস্তবায়নে সচেষ্ট। যেমন— স্কুলগুলোতে মিড ডে চালু করা, প্রাইমারি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা নির্ধারণ করা। এগুলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। কিন্তু তিনি তা করে যেতে পারেননি। কন্যা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন ও আদর্শগুলোকেই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে আমাদেরও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে লালন করতে হবে। আমাদের জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না। এই পদ্ধতি আরো আগে চালু করা উচিত ছিল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেই গলদ রয়েছে। এখন চলছে জিপিএ-৫ পাওয়ার শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে না আমাদের ছেলেমেয়েরা। বঙ্গবন্ধু যেটি চেয়েছিলেন। তিনি কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের শিক্ষা রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই আমরা তাকে হত্যা করলাম। ওই রিপোর্টে ছিল কি? অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হবে। প্রাইমারি পর্যন্ত একমুখী শিক্ষা হবে। যেখানে শিশু শিক্ষার্থীরা বাংলাভাষা জানবে, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিখবে, খেলাধুলার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন করবে। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেকে গড়ে তোলার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাও গ্রহণ করবে। বর্তমানে ওই শিক্ষাব্যবস্থাকেই ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। আগে আমরা যখন পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় মুরুব্বিদের সালাম করতাম, তারা বলতেন ‘মানুষের মত মানুষ হও’। এখনকার অভিভাবকরা বলেন, ‘পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া চাই’। আমাদের এখন ভালো মানুষ সৃষ্টির শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যারা ভালো মানুষ তৈরি করবে, সেই স্কুলের শিক্ষকদেরই তো মান-মর্যাদা আমরা রাখিনি। না আছে তাদের সামাজিক মর্যাদা, না আছে আর্থিক নিরাপত্তা। একটা পরিবারে যদি কয়েকটা ছেলে থাকে, তার কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা থাকলে, আর একটি যদি স্কুল শিক্ষক হয়; তার পরিচয়ও আমরা দিতে চাই না। বলি ও আছে আপাতত একটা স্কুলে, চেষ্টা করছে অন্য কিছু করার। আমাদের এই মানসিকতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ওই স্কুল শিক্ষকের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। নতুবা আমরা ভালো মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হব।

*বিদেশি সংস্কৃতি মানেই বর্জনীয় কি?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: বিদেশি সংস্কৃতি মানেই যে বর্জনীয় এই ধারণাটা ঠিক নয়। আমাদের নিজেদের সংস্কৃতির পাশাপাশি বহির্বিশ্বের সংস্কৃতি সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। সারা জীবন শুধু নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থাকলেই চলবে না। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, বিদেশি সংস্কৃতির মোহে বা প্রভাবে আমরা যেন আমাদের স্বদেশীয় সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় কৃষ্টি, কালচার ভুলে না যাই। আমাদেরও যে একটা স্বাধীন সংস্কৃতিক পরিমণ্ডল আছে, এটা যেন বিলীন হয়ে না যায়। তবে ভালো সংস্কৃতিকে গ্রহণ ও অপসংস্কৃতিকে বর্জন গুরুজনদের এ উপদেশ সব সময়ই থাকবে।

*বর্তমানে বিশ্ব সমাদৃত অনলাইন-লার্নিং ফ্রেমওয়ার্ক সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: যদিও আমাদের দেশে করনাকালীন অনলাইন বা ই-লার্নিং বেশি পরিচিতি পেয়েছে, কিন্তু এই ফ্রেমওয়ার্ক এমন একটি পরিপূর্ণ শিক্ষাপদ্ধতি যেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা উপকরণ, শিক্ষার মাধ্যম, সার্বজনীনতা, গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতাসহ সামগ্রিক বিষয়ের সমন্বয় রয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এ ফ্রেমওয়ার্ককে বেইজ করেই বিভিন্ন দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের ই-লার্নিং শিক্ষাকে এগিয়ে নিচ্ছে।

*দেশে অনেকেই ই-লার্নিং বলতে ইন্টারনেটের শিক্ষা পদ্ধতিকেই বুঝে থাকে। আসলে এর পরিসর কতটুকু?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ:  হ্যাঁ, বিষয়টি অনেকের মধ্যে দেখেছি। এটি পুরোপুরি ঠিক নয়। শুধুমাত্র জুম, গুগল ক্লাসরুম, ইউটিউব এই জনপ্রিয় মাধ্যম গুলিই ই-লার্নিং নয়, সমস্ত ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তিই ই-লার্নিংয়ে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন রেডিও, টেলিভিশন, মোবাইল, সিডিরমসহ নানা ডিভাইস হতে পারে এর মাধ্যম।

*প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে ই-লার্নিং শিক্ষা পদ্ধতির মানগত কতটুকু পার্থক্য কি রয়েছে?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: খ্যাতিমান একজন ইসলামী স্কলার বলেছেন, শিক্ষা কখনোই মুখ থেকে কানে স্থানান্তরিত হয় না, সবসময় হৃদয় থেকে হৃদয়ে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ শিক্ষার্থী আর শিক্ষক কাছাকাছি থেকে যা প্রাদান করা এবং গ্রহণ হয়, তাই প্রকৃত শিক্ষা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনলাইন বা ই-লারনিংকে অস্বীকার বা ছোট করার কোনো সুযোগ নেই। অনলাইন বা ই-লার্নিংয়ে একটা ব্যাপার রয়েছে যে নিজে শেখা। একজন শিক্ষার্থী তার পাঠে নিজে নিজেই আগ্রহী হয়ে থাকে, মনোযোগ তৈরি করে। এতে তার মস্তিস্কের চিন্তাশীল ক্ষেত্রের পরিসর বাড়ে। শিক্ষার্থীর প্রতিযোগিতা তৈরি হয় শেখার সঙ্গে, সহপাঠির সঙ্গে নয়। আমাদের ট্র্যাডিশনাল শিক্ষা পদ্ধতিতে যা একদম উল্টো। বেসিক মানের পার্থক্য এখানেই যে, ই-লার্নিংয়ের মূখ্য বিষয় শেখা। এখানে একজন শিক্ষার্থী বিশ্বের তাবৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাৎক্ষণিক আপডেটগুলো পাচ্ছে এবং সেগুলোর আকর্ষণীয় উপস্থাপনা আরও কৌতুহলী ও আনন্দদায়ক পাঠদানের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। যদিও আমাদের দেশ অনেক পরে অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থার ব্যবহার শুরু হয়েছে।

*পিছিয়ে থেকে শুরুর পর এখন কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব পাওয়া উচিত?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: আমি ধরে নিচ্ছি আমাদের মানসিকতা ও মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটছে। তাহলে প্রথমেই উচিত হবে অনলাইন বা ই-লার্নিংয়ের জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড জাতীয় নীতিমালা তৈরি করা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান রেখে ভিন্ন স্ট্যার্ন্ডাডের শিক্ষার্থীদের জন্য কনটেন্ট তৈরি করা। প্রয়োজন ভাচুর্য়াল শিক্ষার ব্লেন্ডেড লার্নিং, মিক্সড মোড টেকনোলজির প্রয়োগ।

*একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষা কতটুকু প্রয়োজন?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: জাতি হিসেবে আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা বাঙালি, তার চেয়ে বড় পরিচয় আমরা মুসলিম এবং আমাদের ধর্ম ইসলাম যার আভিধানিক অর্থ ‘শান্তি’। আমাদের পরিচয়টা আরও শ্রেষ্ঠতর হয়ে ওঠে যখন আমরা ভাবি আমরা সর্বকালের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও আল্লাহর প্রিয় বন্ধু হযরত মুহম্মদ (সা.) এর উম্মত ও অনুসারী। যাকে কেন্দ্র করে আল্লাহ তাআলা বিশ্ব জাহান এবং মানব সৃষ্টি করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর সৃষ্ট জীবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন একমাত্র মানব জাতিকেই। আর আমাদের এ শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার একমাত্র প্রথম এবং প্রধান উপায় হচ্ছে তৃণমূল থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত পবিত্র কুরআনকে সর্বোত্তম পন্থা এবং আল্লাহর রাসূলকে সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে মেনে নিয়ে জীবন পরিচালনা করা। মাঝে-মধ্যে কিছু বিস্ময় সৃষ্টি করে যখন দেখি কিছু মানুষ ইসলাম সম্পর্কে অল্প জ্ঞান নিয়ে অনেক বিস্তর ও অবিরাম তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে যায়। তথাপি তার আলোচনা কতটুকু সত্য সে হয়তো নিজেও জানে না। তার এই না জানার প্রধান একটা কারণ হচ্ছে একটা ছাত্রছাত্রী গ্র্যাজুয়েট এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তার প্রতিটা ধাপে যে পরিমাণ বাংলা, ইংরেজী সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শন নিয়ে পড়ার যে সময় ও সুযোগ পায় সেই পরিমাণ বললেও হয়তো ভুল হবে, তার কিঞ্চিত পরিমাণও হয়তো ইসলামী সাহিত্য পড়ার জন্য পায় না। সত্য ও সুন্দরের ধর্ম ইসলাম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা বা বিধান হলো পবিত্র কুরআন। এই কুরআন এমনই এক পন্থা যাকে জীবনের আদর্শ হিসেবে মেনে নিলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, তথা সাড়া বিশ্বের সকল সমস্যার সমাধান ও সকল প্রকার উন্নয়ন সম্ভব।

*বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার ভবিষ্যৎ কি?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: আমি মনে করি বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। কারণ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পিতা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার অন্তর্গত টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন দরবেশ শেখ আউয়াল। (শেখ মুজিবুর রহমান, পিতা শেখ লুৎফুর রহমান, পিতা শেখ আবদুল হামিদ, পিতা শেখ তাজ মাহমুদ, পিতা শেখ মাহমুদ ওরফে তেকড়ী শেখ, পিতা শেখ জহির উদ্দিন, পিতা দরবেশ শেখ আউয়াল)। তিনি হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহ.)-এর প্রিয় সঙ্গী ছিলেন। ১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি বাগদাদ থেকে বঙ্গে আগমন করেন। পরবর্তীকালে তাঁরই উত্তর-পুরুষেরা অধুনা গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। জাতির জনক হচ্ছেন ইসলাম প্রচারক শেখ আউয়ালের সপ্তম অধঃস্তন বংশধর। বঙ্গবন্ধুর মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। নানার নাম ছিল শেখ আব্দুল মজিদ। বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফুর রহমানের সুখ্যাতি ছিল সূফী চরিত্রের অধিকারী হিসেবে। জাতির জনক নিজেও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও ইসলামী তরিকা অনুযায়ী জীবন যাপনে অভ্যস্ত। তাদের যোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইসলাম ও ইসলামী শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। তাঁর আন্তরিকতার কারণেই স্বতন্ত্র আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি, মাদরাসা শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করা সম্ভব হয়েছে। তিনি ইসলামী ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধারার সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এতে ইসলামী শিক্ষার প্রতি মানুষের ভুল ধারণা যেমন ভাঙবে, তেমনি ইসলামী ধারার সঙ্গে জড়িতদের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনযাত্রার মান বাড়বে।

*আপনার কাছে সর্বশেষ জিজ্ঞাসা আগামীর বাংলাদেশকে কেমন দেখতে চান?

মোহাম্মদ আনিসুর রহমান সোহাগ: আগামীর বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। শুরুতেই বলেছি বাঙালি কষ্টসহিষ্ণু। বিদেশেও আমরা ভালো করছি। কিছু অসৎ লোকের জন্য হচ্ছে না। কিন্তু তা বাধা হতে পারবে না। এই ক্ষেত্রে সকলের কাজ হওয়া উচিত সৎ ও অসতের পার্থক্য নিরূপণ করা এবং নিজেকে নিজে সঠিক বিচার করা। সাধারণ মানুষ সব কিছু জানবে, বুঝবে আর আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ সুখী, সমৃদ্ধশালী হবে।

advertisement
Evaly
advertisement