advertisement
advertisement

ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ কারাগারে

সিনহা হত্যা মামলা # ৩ আসামির সাত দিনের রিমান্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা ও কক্সবাজার
৭ আগস্ট ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ আগস্ট ২০২০ ২২:৩৪
advertisement

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার মামলায় টেকনাফ থানার প্রত্যাহার হওয়া বহুল আলোচিত ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ পুলিশের ৭ সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই ৭ পুলিশের মধ্যে হত্যামামলার প্রধান আসামি বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীও রয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে ওসি প্রদীপসহ ৭ পুলিশ সদস্যকে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। ৭ আসামির আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন জামিন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

কারাগারে পাঠানো ৭ জন হলেনÑ পরিদর্শক লিয়াকত আলী, পরিদর্শক প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই নন্দলাল রক্ষিত, এএসআই লিটন মিয়া,

কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন। মামলার অপর দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা এখনো পলাতক রয়েছেন বলে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি ফরিদুল আলম জানান।

র‌্যাব ৭ পুলিশ সদস্যকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে একই আদালতে আবেদন করলে বিচারক ওসি প্রদীপ কুমার দাস, পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৭ দিনের রিমাঞ্জ মঞ্জুর করেন।

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যামামলার আসামিদের আদালতে হাজির করার আগেই ওই এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সাংবাদিকদের পাশাপাশি বিপুল উৎসুক মানুষ ওই নিরাপত্তার মধ্যেই আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেই গণমাধ্যমের কাছে খবর আসেÑ চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন টেকনাফ থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। দুপুরে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামের দামপাড়া বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে এসেছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ। তাকে এখন পুলিশ হেফাজতে কক্সবাজারে নেওয়া হচ্ছে। তিনি যেহেতু মামলার আসামি, তাই তিনি সেখানে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।

চট্টগ্রাম থেকে কড়া পুলিশ পাহারায় পরে ওসি প্রদীপ কুমার দাসকে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির করা হয়। এর আগেই সেখানে আনা হয় পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ মামলার অপর ৬ আসামিকে। কড়া পাহারায় তাদের আদালতে রাখা হয়। এর পর ওসি প্রদীপসহ ৭ পুলিশ সদস্যকে আদালতে তোলা হয়।

গত মঙ্গলবার ওসি প্রদীপ অসুস্থ দাবি করে ছুটি নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যান। পরে তিনি চট্টগ্রামের পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হন। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। কক্সবাজারের আগে তিনি চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় জায়গা দখলসহ নানা অভিযোগ ওঠায় তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছিল।

এদিকে দুই বছর আগে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সিনহা রাশেদ খান ‘লেটস গো’ নামে একটি ভ্রমণবিষয়ক ডকুমেন্টারি বানানোর জন্য প্রায় এক মাস ধরে কক্সবাজারের হিমছড়ি এলাকায় ছিলেন। আরও তিন সঙ্গীকে নিয়ে তিনি উঠেছিলেন নীলিমা রিসোর্টে। গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শাপলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের কথা জানিয়ে ওই সময় পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিনহা তার পরিচয় দিয়ে ‘তল্লাশিতে বাধা দেন’। পরে ‘পিস্তল বের করলে’ চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ তাকে গুলি করে। এই ঘটনায় পুলিশ মামলাও করে। তবে পুলিশের এই ভাষ্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিনিধি নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে বুধবারই কক্সবাজারের আদালতে মামলা করেন তার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। মামলার এজাহারে তিনি অভিযোগ করেনÑ ওসি প্রদীপের ফোনে পাওয়া নির্দেশে বাহারছড়া পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের এসআই লিয়াকত আলী গুলি করেছিলেন তার ভাই সিনহাকে। তিনি এজহারে আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৩০২ ধারায় ‘ইচ্ছাকৃত নরহত্যা’, ২০১ ধারায় আলামত নষ্ট ও মিথ্যা সাক্ষ্য তৈরি এবং ৩৪ ধারায় পরস্পর ‘সাধারণ অভিপ্রায়ে’ অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনেন। ঘটনার সময় সিনহার সঙ্গে থাকা সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে (২১) মামলার প্রধান সাক্ষী করা হয়। ঘটনার দিনই তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, মাদক ও অস্ত্র আইনের মামলায় আসামি করে।

জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম তামান্না ফারাহ বুধবার সকালে সিনহার বোনের অভিযোগ হত্যা মামলা হিসেবে আমলে নিয়ে টেকনাফ থানাকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি মামলার তদন্তভার দেন র‌্যাবকে।

এর পর বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ থানায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়, যে থানার ওসি ছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ।

সিনহা নিহতের ঘটনায় জড়িত সব পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে বুধবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সমিতি রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া)।

একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ কক্সবাজারে গিয়ে সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এর পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তারা বলেন, এই ঘটনায় দায়ী হিসেবে যে বা যারা চিহ্নিত হবে, তারাই শাস্তি পাবে। এর দায় বাহিনীর ওপর পড়বে না।

সিনহা হত্যা : প্রদীপ-লিয়াকতসহ ৩ পুলিশ রিমান্ডে

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে গুলি করে হত্যার মামলায় টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ তিন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। প্রদীপ ও লিয়াকতের সঙ্গে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে এসআই দুলাল রক্ষিতকে।

কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. হেলাল উদ্দিন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে র‌্যাবের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে ৭ দিন মঞ্জুর করেন। এ মামলায় আত্মসমর্পণ করা বাকি চার আসামিÑ কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়াকে দুই দিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছেন বিচারক।

মামলার বাকি দুই আসামি এসআই টুটুল ও কনস্টেবল মো. মোস্তফা এখনো পলাতক। আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন।

রাত ৯টায় র‌্যাব সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, তারা রিমান্ডের আদেশ হাতে পাওয়ার পর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেবেন।

টেকনাফ থানায় তদন্ত কমিটি

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দল গতকাল দুপুর ২টার দিকে টেকনাফ মডেল থানায় প্রবেশ করেন। তারা ৩ ঘণ্টা থানায় অবস্থানের পর বেরিয়ে যান। তবে থানা থেকে বেরিয়ে তদন্ত দলের সদস্যরা কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তাদের অবস্থানকালে কাউকে থানার ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এ সময় থানার বাইরে কয়েকশ মানুষ জড়ো হন। তাদের মধ্যে ওসি প্রদীপের হাতে হয়রানির শিকার হওয়া ভুক্তভোগী স্থানীয় মানুষকে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

advertisement
Evaly
advertisement