advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রেশমা এখন সব চূড়ার ঊর্ধ্বে

রাজধানীতে মাইক্রোবাসের চাপায় প্রাণ গেল পর্বতারোহীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ আগস্ট ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ আগস্ট ২০২০ ২২:২৩
advertisement

পাহাড়ের হাতছানিতে আর ছুটে যাবেন না রেশমা নাহার রত্না; বুকে ধারণকৃত শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন আর তাড়িয়ে বেড়াবে না ৩৩ বসন্ত পেরিয়ে আসা প্রাণচঞ্চল এ মানুষটিকে। সব কিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন তিনি; সড়কে পিষ্ট হয়ে গেছে তার শীর্ষে ওঠার স্বপ্ন। গতকাল শুক্রবার সকালে সংসদ ভবন এলাকার চন্দ্রিমা উদ্যানসংলগ্ন লেক রোডে সাইক্লিং করার সময় বেপরোয়া একটি মাইক্রোবাসের চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন রত্না। কালো রঙের গাড়িটির চাপায় দুমড়ে-মুচড়ে গেছে তার প্রিয় সাইকেলটি।

রত্না রাজধানীর আইয়ুব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। কিন্তু শৈশব থেকেই গান, আবৃত্তি, বইপড়া, সাইকেল চালনার ভীষণ সখ ছিল তার। তবে সব ছাপিয়ে পর্বতারোহী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন তিনি, সে পথেই হাঁটতে হাঁটতে এগিয়েছিলেনও অনেকটা। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের পাহাড় কেওক্রাডংয়ের চূড়া স্পর্শ করার মাধ্যমে শুরু হয় রত্নার পর্বতারোহের অভিযান। ২০১৯ সালের ২৪ আগস্ট ছয় হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার ভারতের লাদাখে অবস্থিত স্টক কাঙরি পর্বত এবং ৩০ আগস্ট কাং ইয়াতসে-২ পর্বতে সফলভাবে আরোহণ করেন তিনি। স্বপ্ন দেখতেন একদিন উঠে

যাবেন এভারেস্টের চূড়ায়ও। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পিষ্ট হয়ে গেছে পিচঢালা সড়কে। পেছনে অঝর অশ্রু রেখে তিনি চলে গেছেন সব কিছুর ঊর্ধ্বে, সবার ঊর্ধ্বে।

গতকাল দুপুরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রত্নার নিথর দেহের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন শোকার্ত স্বজনেরা। তাদের আর্দ্রতা ছড়িয়ে যায় চারপাশে, সৃষ্টি হয় এক বেদনাবিধুর পরিবেশ।

শেরেবাংলা নগর থানার ওসি মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, শুক্রবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে সংসদ ভবন এলাকার চন্দ্রিমা উদ্যানের লেক রোড ধরে গণভবনমুখী সড়ক হয়ে সাইক্লিং করছিলেন রত্না। চন্দ্রিমায় ঢোকার ব্রিজের সামনের সড়কে বেপরোয়া একটি মাইক্রোবাস

তাকে চাপা দিলে মাথায় আঘাত পান তিনি। পথচারীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন রত্নাকে।

ঘাতক গাড়িটির হদিস মেলেনি জানিয়ে ওসি আবুল কালাম বলেন, পুরো এলাকার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেগুলো দেখে গাড়ি শনাক্ত করে দায়ী চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রত্নাদের গ্রামের বাড়ি নড়াইলে। তার বাবা এস আফজাল হোসেন বীরবিক্রম একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। আগে বড় বোনের সঙ্গে পুরান ঢাকায় থাকতেন রত্না। কর্মস্থল পরিবর্তন হলে মিরপুরে চলে যান তিনি। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে আসেন নিহতের দুলাভাই মনিরুজ্জামান। রত্নার মৃত্যুকে হত্যাকা- আখ্যা দিয়ে তিনি জানান, মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সাইক্লিস্ট সাবিনা ইয়াসমীন মাধবী জানান, উদ্যমী রত্না তুখোড় পর্বতারোহী, দৌড়বিদ ও সাইক্লিস্ট ছিলেন। গান, আবৃত্তি, পাঠচক্রেও নিয়মিত অংশ নিতেন। ভালোবাসতেন সাইকেল চালাতে। তিনি সকালে সাইকেল চালিয়ে রমনায় গিয়ে শরীরচর্চা করে হাতিরঝিল যেতেন। সেখানে কয়েক চক্কর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে ফিরতেন বাসায়।

আরেক পর্বতারোহী মীর শামসুল আলম বাবু জানান, নিয়মিত শারীরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে রত্না গতকাল সকালে ২০ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নিয়েছিলেন। অনুশীলন শেষে সাইকেল চালিয়ে হাতিরঝিল থেকে মিরপুরের নিজের বাসায় ফিরছিলেন।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে মৌলিক প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের উত্তরাখ-ে নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টিইনিয়ারিংয়ে যান তিনি। কিন্তু অ্যাডভ্যান্স বেজক্যাম্পে তার পায়ে ফ্র্যাকচার হয়। সুস্থ হতে লেগে যায় দীর্ঘদিন। পরবর্তী সময়ে নিজ উদ্যোগে সফলভাবে পর্বতারোহণের মৌলিক ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন রত্না। গত বছর লাদাখের স্তোক কাংরি পর্বত জয় করেন তিনি। এ ছাড়া আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো ও মাউন্ট কেনিয়া জয়ের জন্য গিয়েছিলেন রত্না।

রত্নার বন্ধু সাখাওয়াত হোসেন জানান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠচক্রের একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন রত্না। তার স্বপ্ন ছিল নিজেকে পর্বতারোহী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন। সে জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আজ শেষ করে দিল অনিরাপদ সড়ক। ঝরে গেল একটি প্রতিভা। তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ রাখেন, সড়কে আর কোনো রত্নাকে যেন হারাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে।

advertisement
Evaly
advertisement