advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সব খবর

advertisement

দাম না পেয়ে হতাশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা -শোরের চামড়ার মোকাম

উত্তম ঘোষ যশোর
৯ আগস্ট ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ আগস্ট ২০২০ ০১:১৬
advertisement

ঈদুল আজহার দিন সকাল থেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রতি পিস ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দরে ১০০ গরুর চামড়া কিনেছিলেন নড়াইলের লোহাগড়ার ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী সানাই বিশ্বাস। সেগুলো বাড়িতে লবণজাত করে রেখে গতকাল শনিবার বাড়তি দামের আশায় এসেছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে। চামড়ার এ বৃহৎ মোকামে এসে তিনি প্রতি পিস চামড়ার দাম ৩০০ টাকার বেশি পাচ্ছেন না। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এ ব্যবসায় জড়িত সানাই। কয়েক বছর ধরে চামড়ার দাম না পেয়ে এ বছর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যবসা ছাড়ার।

শুধু সানাই বিশ্বাসই নন, এমন অবস্থা প্রায় সব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। তবে চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি সরকার নির্ধারিত দামেই কেনাবেচা হচ্ছে এ হাটে। ফলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে ঈদ পরবর্তী দ্বিতীয় হাট বসে শনিবার। এদিন অন্তত ২ কোটি টাকার চামড়া নগদ বেচাকেনা হয়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুলের। এদিন ট্যানারি প্রতিনিধি ও বাইরের ব্যাপারীদের সমাগম এবং চামড়ার আমদানি বেশি থাকলেও দাম নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চামড়া নিয়ে খেলছে ট্যানারি মালিকরা। তারা দিনের পর দিন বকেয়া পরিশোধ না করে টালবাহানা করছেন। এতে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। মোকামে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানালেও ট্যানারি মালিকদের রোষানলে পড়ার ভয়ে অনেকেই সাংবাদিকের কাছে কথা বলতে চাননি।

গতকাল সরেজমিন ঘুরে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যশোর-খুলনা মহাসড়কের রাজারহাট এলাকায় এ চামড়ার মোকাম। দেশের অন্যতম বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের এ হাটে প্রায় ৩০০ আড়ত রয়েছে। এ হাট বসে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার। যশোর ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলো থেকে ব্যবসায়ীরা এ হাটে চামড়া নিয়ে আসেন। কোরবানি ঈদ ঘিরে প্রতিবারই রাজারহাটে ১৫ থেকে ৩০ কোটি টাকার চামড়া বেচাকেনা হয়। কিন্তু গত শনিবার ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে বৃষ্টির কারণে চামড়া নিয়ে আসতে পারেননি ব্যাপারীরা। ফলে সীমিত পরিসরে হাট জমলেও গত হাটে অর্ধকোটি টাকারও চামড়া বেচাকেনা করতে পারেনি। তবে শনিবার রাজারহাট চামড়ার হাটের চিত্র ছিল ভিন্ন। এদিন হাটে চামড়ার সরবরাহ ছিল আশাব্যঞ্জক। অনেক ব্যবসায়ী হাটে চামড়া রাখার জায়গা পর্যন্ত পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই রাস্তার ওপর চামড়া নিয়ে বসেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে বাড়তে থাকে ভিড়। ট্যানারি শিল্পে দেওয়ার জন্য স্থানীয় আড়তদাররা চামড়া কিনে মজুদ করেন। এদিন হাটে ভালো চামড়া উঠলেও দাম নিয়ে সন্তুষ্টি নন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীররা। প্রতি পিস গরুর চামড়া মান ভেদে ১০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ২০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেছেন তারা। কিন্তু বাজারে সরকার নির্ধারিত দাম না পেয়ে আসল যেমনÑ তেমন লবণ খরচও উঠবে না তাদের।

এদিন হাটে চামড়া বিক্রি করতে আসা যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার চামড়ার ব্যবসায়ী সুনিল ঘোষ জানান, গত হাটে ১০০ পিস চামড়া আনলেও বাইরের ব্যবসায়ী ও হাট না জমায় চামড়া বিক্রি করেনি। শনিবার হাট জমলেও চামড়ার ঠিক দাম পাচ্ছি না। তিনি আরও বলেন, প্রতি পিস ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা দরে কিনেছি। এর পর লবণ ও পরিবহন মিলে চামড়াপ্রতি খরচ হয়েছে তার ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এখন হাটে ২০ টাকার বেশি দাম উঠছে না। লাভ হওয়া দূরে থাক, লবণের দামই উঠছে না। পুঁজিতেই টান পড়ছে তার।

অভয়নগরের সেলিম হোসেন নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, এবার চামড়ার দাম নিয়ে ভয় থাকায় অনেক হিসাব করে চামড়া কিনেছি। তিনি ২০০ পিস গরু ও ১০০ পিস ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছেন। ছাগলের চামড়া ৩০ টাকা আর গরু চামড়া ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার বেশি দাম উঠছে না। অথচ ছাগলের চামড়া কেনা পড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা পিস আর গরু ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পিস। পাইকারদের দামে চামড়া বিক্রি করলে লবণের খরচও উঠবে না।

যশোরের রাজার হাটে চামড়া নিয়ে আসে মাগুরা জেলার রানা হোসেন। এ সময় তিনি জানান, লাগাতার কয়েক বছর ধরে চামড়ার দাম না পেয়ে এ বছর সিদ্ধান্ত নিয়েছি ব্যবসা ছাড়ার। কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন তিনি। লাভের আশায় এবারও চামড়া ক্রয় করছেন। তবে ট্যানারি মালিকরা দাম না বাড়ালে এবারও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিয়ে চামড়া নিয়ে ট্যানারি মালিকরা খেলা করছেন। তাদের কারণে চামড়ার বাজারে অরাজকতা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা পাচ্ছেন, ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ চামড়া কিনছেন বাকিতে। কোটি কোটি টাকা বাকিও ফেলে রাখছেন বছরের পর বছর। গত দুবছরে তিনি ঢাকার ট্যানারি মালিকের কাছে ৩৮ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এ টাকাগুলো পেলেই কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারতেন বলে তিনি মনে করেন।

তবে ঢাকার হেমায়েতপুর চামড়ার ব্যবসায়ী মেসার্স হালিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী হাজি হালিম বলেন, গেল বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি চামড়ায় ২০০ টাকা বেশি। গ্রেড অনুযায়ী চামড়ার দাম নির্ধারণ হয়। সেহেতু যে চামড়ার যেমন দাম তেমনি পাবেন তারা। এতে তাদের লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

রাজার হাট চামড়ার হাটের ইজারাদার হাসানুজ্জামান হাসু জানান, সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে এ হাটে। তবে ঈদের আগে ব্যবসায়ীরা বকেয়া টাকা পেলে বেচাকেনা আরও ভালো হতো বলে তিনি জানান।

যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল জানান, কোরবানি ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে রাজারহাটে প্রায় চামড়ার হাট না জমলেও দ্বিতীয় হাট জমেছে। এদিন প্রায় ২ কোটির টাকার বেশি চামড়া বিক্রি হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত দামেই কেনাবেচা হচ্ছে এ হাটে। ফলে ব্যবসায়ীদের লোকসান হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এ দিকে জেলা বিপণন কর্মকতা সুজাত হোসেন খান জানান, সরকার বেঁধে দেওয়া দামেই এ হাটে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে। তা ছাড়া চামড়া পাচার হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই বলে তিনি জানান।

 

advertisement
Evaly
advertisement