advertisement
advertisement

বিজয় হত্যা নিয়ে সিরাজগঞ্জ আওয়ামী লীগ টালমাটাল

নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ আগস্ট ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ আগস্ট ২০২০ ০৮:২২
ছাত্রলীগ নেতা বিজয়
advertisement

ছাত্রলীগ নেতা বিজয় হত্যার জেরে সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে এখন টালমাতাল অবস্থা। স্থবির হয়ে আছে মূল ও সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম। প্রশাসনের নির্দেশে দলীয় কার্যালয়ে ঝুলছে তালা। জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে গত ৫০ বছরেও এমন পরিস্থিতি হয়নি বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

গত ২৬ জুন সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্মরণে জেলা ছাত্রলীগ আয়োজিত দোয়া মাহফিলে যোগ দিতে আসার পথে সিরাজগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও কামারখন্দের হাজী কোরপ আলী ডিগ্রি কলেজ শাখার সভাপতি এনামুল হক বিজয়কে কুপিয়ে জখম করে একই সংগঠনের আরেক পক্ষ। ঢাকার নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ৯ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই রুবেল জেলা ছাত্রলীগের ৫ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত ৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপরই জেলা ছাত্রলীগে শুরু হয় প্রকাশ্য বিরোধ। এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় কমিটি ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করে মামলার প্রধান আসামিসহ দুই নেতাকে। তারা হলেন জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শহরের সয়াগোবিন্দ ভাঙ্গাবাড়ী মহল্লার আল-আমিন ও আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক শহরের দিয়ারধানগড়া মহল্লার শিহাব আহমেদ জিহাদ। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদ জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দল থেকে সাময়িকভাবে ওই দুজনকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় কমিটি।

এরই মধ্যে মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগ নেতা আশিকুর রহমান বিজয়, জাহিদুল ইসলাম ও সাগর কারাগারে রয়েছেন। জামিনে মুক্ত আছেন সাংগঠনিক সম্পাদক আল-আমিন। মামলার আসামি শিহাব আহমেদ জিহাদ পলাতক রয়েছেন।

এদিকে বিজয় হত্যা ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রতিবাদে সম্প্রতি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদের নেতৃত্বে নেতাকর্মীদের একাংশ দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে।

জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ নাসিম মারা যাওয়ার পর তার অনুসারীদের মধ্যে এক ধরনের অভিভাবকশূন্যতা তৈরি হয়েছে। নাসিম জেলার প্রতিটি উপজেলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তার সন্তান ও সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় কেন্দ্র কিংবা জেলার রাজনীতিতে এখনো তেমন প্রভাব গড়ে তুলতে পারেননি। এই সুযোগে নাসিমের অনুসারীদের কোণঠাসা করতে মরিয়া হয়ে পড়েছে তাদের বিরোধীপক্ষ। এতে জেলার একজন প্রভাবশালী সাংসদ কলকাঠি নাড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ছাত্রলীগের সংঘর্ষ : ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক বিজয় স্মরণে ৭ জুলাই আয়োজিত মিলাদ মাহফিলকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৪০ জন আহত হন। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়ে পরে তা পুরো এসএস রোড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দুই ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে দফায় দফায় টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। সংঘর্ষের জন্য প্রতিপক্ষকে দায়ী করে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবু ইউসুফ সূর্য ও জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ বিন আহম্মেদ অভিযোগ করেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল লতিফ বিশ্বাসসহ শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে এসএস রোডে অবস্থিত দলীয় কার্যালয়ে নিহত এনামুল হক বিজয়ের জন্য দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভা চলছিল। এ অবস্থায় স্থানীয় এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্নার নেতৃত্বে দুই শতাধিক লোক মিছিল নিয়ে স্মরণসভাস্থলে এসে হামলা চালান। প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায়।

তবে ওই সময় অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ওই মিছিলে আমি ছিলাম না, বাসায় ছিলাম। জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ছাত্রলীগের দুপক্ষের সংঘর্ষের কথা বাসায় থেকেই তিনি জানতে পারেন।

তখন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আহসান হাবিব খোকা পাল্টা অভিযোগ করেন, দেড় শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে দোয়া মাহফিলে যোগ দেওয়ার জন্য দলীয় কার্যালয়ের সামনে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। প্রতিহত করতে গেলে সংঘর্ষ বেধে যায়।

তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফোরকান শিকদার ওইদিন জানিয়েছিলেন, স্মরণসভা চলাকালে দলীয় কার্যালয়ে ঢোকার সময় তর্কবিতকের একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেধে যায়।

এনামুল হত্যা মামলা ডিবিতে, ৩ আসামির রিমান্ড : ছাত্রলীগ নেতা এনামুল হক বিজয় হত্যা মামলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। সদর থানার ওসি হাফিজুর রহমান জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে গত ১৬ জুলাই মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে কারাগারে থাকা তিন আসামি ছাত্রলীগ নেতা আশিকুর রহমান বিজয়, জাহিদুল ইসলাম ও দিয়ারধানগড়ার সাগরকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দেন আদালত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের এসআই বদরুদ্দোজা জিমেল জানান, ওই তিনজনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল।

কামারখন্দ থানায় হামলার আসামি ছাত্রলীগ নেতারা : কামারখন্দ থানায় হামলার অভিযোগে উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মামুন শেখসহ অজ্ঞাতনামা ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার রাতে কামারখন্দ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) পলাশ চন্দ্র দেব বলেন, ৪ আগস্ট রাতে এসআই বিপ্লব মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় এজাহারে বলা হয়েছে, এনামুল হক বিজয় হত্যা মামলার বাদী ও তার বড় ভাই রুবেলকে অপহরণের অভিযোগ এনে তাদের বাবা কাদের প্রামাণিক ৩ আগস্ট থানায় মামলা দায়ের করেন। ওইদিনই মামলার আসামি কামারখন্দ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি পারভেজ রেজা পাভেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মামুন শেখ এক থেকে দেড়শ নেতাকর্মীকে নিয়ে থানায় উপস্থিত হয়ে উস্কানিমূলক শ্লোগান দেয়। এক পর্যায়ে পাভেলকে ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মামুনের নেতৃত্বে অজ্ঞাতনামা আরও ১৪-১৫ জন থানা কম্পাউন্ডে ঢুকে মূল ভবনে প্রবেশ করে। এতে বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং ধস্তাধস্তি করে। এ অবস্থায় লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে অন্যরা পালিয়ে গেলেও অপহরণ মামলার প্রধান আসামি মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ২ আগস্ট বিজয় হত্যা মামলার বাদী রুবেলকে কামারখন্দ বাজার এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করা হয়। হত্যা মামলা তুলে নিতে এবং নিহত বিজয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ও মেমোরি কার্ড দিতে তাকে চাপ দেয় অপহরণকারীরা। একপর্যায়ে রুবেল চিৎকার শুরু করেন। বেকায়দায় পড়ে গিয়ে অপহরণকারীরা তাকে বগুড়ার মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় মাইক্রোবাস থেকে ফেলে দেয়। স্থানীয় একটি মসজিদের মুসল্লিরা তাকে অসুস্থ অবস্থায় পান। শাহজাহানপুর থানা পুলিশ তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে।

ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি ৪টি মামলা হয়েছে। এর জেরে জেলা আওয়ামী লীগে বিভক্তি দেখা দেয়। পরে কেন্দ্রীয় কমিটির হস্তক্ষেপে ৮ জুলাই থেকে জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় তালাবদ্ধ এবং সব অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের দলীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

কামারখন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, এনামুল হক বিজয় হত্যা মামলার বাদী রুবেল প্রামাণিককে অপহরণের অভিযোগে তার বাবা আবদুল কাদের প্রামাণিক বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার পরই থানা এলাকা থেকে আসামি পারভেজ রেজা পাভেল ও মামুন সেখকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কামারখন্দ সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার শাহিনুর কবির জানান, মামুন সেখ অপহরণ মামলার প্রধান আসামি।

advertisement
Evaly
advertisement