advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জলবায়ু বিতর্কে ঘি
বিজ্ঞানের প্রতি ট্রাম্পের অবজ্ঞার শেষ কোথায়?

জাহাঙ্গীর সুর
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:৩৮
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুরোনো ছবি
advertisement

‘বৈজ্ঞানিক নিয়মের প্রতি অবজ্ঞা মানুষের পক্ষে কত স্বাভাবিক আমরা প্রতিদিনই তাহার প্রমাণ পাই।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পঞ্চভূত লিখতে গিয়ে ‘বৈজ্ঞানিক কৌতূহল’ গল্পে এ কথা বলেছিলেন। কিন্তু, এতদিন পরেও, এই একুশ শতকের বিশ্বে, এমনকি মহাশক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রধানও বিজ্ঞানকে ক্রমাগত অবজ্ঞা করছেন, এটা বিস্ময় বটে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আবার বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বেশ্বিক উষ্ণায়ন সম্পর্কে ‘বিজ্ঞান (এবং বিজ্ঞানীরা) কিছু জানে বলে মনে হয় না’। তারই প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন তাকে ‘জলবায়ুতে অগ্নিসংযোগকারী’ বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞানী ড. হারুনর রশীদ খান এ ধরনের অবজ্ঞাকে জনসমাজ ও বিজ্ঞানমহলের জন্য ক্ষতিকর বলে অভিহিত করেছেন।

আবার আগুনে ঘি

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে ‘বিজ্ঞানকে আগ্রাহ্য না করা’র জন্য ট্রাম্পের প্রতি আহ্বান করা হচ্ছে বেশ কিছুদিন থেকেই। কিন্তু সোমবার তিনি দাবানলে বিপর্যস্ত ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় দাবানলের জন্য তিনি দুর্বল বন ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। তখন এক কর্মকর্তা প্রেসিডেন্টকে ‘বিজ্ঞান অগ্রাহ্য না করার’ অনুরোধ করেন। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘(আবহাওয়া) শীতল হতে শুরু করবে, আপনি শুধু দেখেন।’ ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয় না আসলে যা ঘটছে তা বিজ্ঞান বুঝতে পারছে।’

বিবিসি জানিয়েছে, আগস্টের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলীয় ক্যালিফোর্নিয়া, ওরিগন ও ওয়াশিংটন রাজ্যে শুরু হওয়া দাবানলে প্রায় ২০ লাখ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৬ জন। কিন্তু এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, দাবানলের জন্য ‘আমি মনে করি, ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিই দায়ী।’

বিজ্ঞানীর প্রতিক্রিয়া

মানুষের কর্মকা- জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী কি না, আমাদের সময় জানতে চেয়েছিল পরিবেশবিজ্ঞানী ড. হারুনর রশীদ খানের কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞানের এ অধ্যাপক গতকাল টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ লেখককে বলেন, ‘অবশ্যই। গ্রিন হাউজ গ্যাস এবং জলীয় বাষ্পসহ পরিবেশে নির্গত নানা ধরনের গ্যাস বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য অর্ধেক দায় দেওয়া হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ওপর, মানুষ যা নিঃশ্বাস ফেলার সময় বাতাসে ছাড়ে। ড. খান তুলনা স্বরূপ বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ‘কার্বন-ডাই-অক্সাইডে চেয়ে সমপরিমাণ মিথেন গ্যাস ২৬-৩২ গুণ, নাইট্রাস অক্সাইড ১৫০-২৫০ গুণ এবং সিএফসি এক হাজার থেকে ১০ হাজার গুণ বেশি’ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বায়ুদূষণও- যেমন বায়ুতে থাকা ধূলিকণা- উষ্ণায়ন বাড়ায়। আর এই উষ্ণায়ন দাবানলের অন্যতম কারণও বটে।

ড. খান যেমনটা বলেছেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়া বা ওই অঞ্চলে ৩.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা বাড়লে দাবানলের মাত্রা এখনকার চেয়ে চারগুণ বেড়ে যাবে।’

তবুও ট্রাম্প এ সত্যকে অবজ্ঞা করেই যাচ্ছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক খান বলেন, ‘বিজ্ঞানকে অবজ্ঞা করা ঠিক হবে না।’ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এই উপাচার্য বলেন, ‘বিশেষত কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের অবজ্ঞা কোনো বিজ্ঞানীই আশা করেন না।’

এ রকম একজন রাষ্ট্রনায়কের মুখ থেকে বিজ্ঞান বিরোধিতা কি সাধারণ মানুষের মনে কিংবা বিজ্ঞানমহলে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে? ড. খান তা মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘বরং বিজ্ঞানীরাই তাকে উপেক্ষা করবেন। এতে উল্টো তারই ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এটা তারই দুর্বলতা।’

ট্রাম্পের বিজ্ঞান বিরোধিতা

২০১৮ সালে ব্রিটিশ আইটিভি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছিলেন, বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিজ্ঞানীরা যা বলেন এবং পরিসংখ্যানে যা উঠে আসে, এর সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। তার দাবি, পৃথিবী একই সঙ্গে উষ্ণ ও শীতল।

২০১৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় নিশ্চিত হওয়ার পর পরই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ঠেকাতে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে সংশয়ী হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশঙ্কাকে সত্যি করে ২০১৭ সালের জুনে বৈশ্বিক জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সমর্থন তুলে নেয়। প্যারিস চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পক্ষে ট্রাম্পের যুক্তি- এটি মার্কিন স্বার্থবিরোধী।

রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই বলতে হচ্ছে, ‘জীবিকার ক্ষেত্রে স্বার্থের স্বাতন্ত্র্য মানুষের সত্যকে এতদিন অবজ্ঞা করে এসেছিল, সেখানে স্বার্থের সম্মিলন সত্যকে আজ প্রমাণ করবার ভার নিয়েছে।’ সেই ‘ভার’ শৃঙ্খলা ফেরাক।

 

advertisement
Evaly
advertisement