advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মূল টার্গেট ছিলেন শেখ মুজিব

ড. আতিউর রহমান
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:১৩
advertisement

আগের পর্বে আমরা দেখেছি শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর তৃণমূলের সাধরণ মানুষ কতটা খুশি ও আশ্বস্ত হয়েছিলেন। তারা তাকে চিঠি লিখে তাদের খুশি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। কী করে দলকে আরও সক্রিয় করা যায়, তারা এ জন্য কী করতে পারেন- এসব কথা ওইসব চিঠিতে লেখা হয়েছিল। সব চিঠি গোয়েন্দারা তার কাছে পৌঁছাতে দেননি। তবে তার ব্যক্তিগত ফাইলে সব চিঠির অনুলিপি রাখা হয়েছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হওয়ার ফলে আমরা ওইসব চিঠির কথা শুধু জানতেই পারছি, তা নয়। শেখ মুজিব এবং তার দলের প্রধান মওলানা ভাসানী ও জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর চলাচল এবং কথাবর্তার রেকর্ডও আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। জনইতিহাস চর্চায় এসব তথ্যের গুরুত্ব যে কতটা, তা বলে শেষ করতে পারব না। জেল থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি দল গোছাতে নেমে পড়েন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা গেছে, তিনি চরকির বেগে পুরো পূর্ববাংলা ঘুরে বেড়িয়েছেন। আবার নেতার সঙ্গে দেখা করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান গিয়েছেন। সেখানেও তিনি ওই অঞ্চলের রাজনীতিক, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে গভীরভাবে মতবিনিময় করেছেন। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাদের মনে সরকারি প্রপাগান্ডার কারণে যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল, তিনি সেসব কষ্ট করে দূর করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তার নেতা সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গেও ভাষা আন্দোলন প্রশ্নে তিনি দ্বিমত করতে সামান্য দ্বিধা করেননি। পরে অবশ্য সোহরাওয়ার্দী মত বদলেছেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

শেখ মুজিব ১৯৫৩ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সমমনা অন্যান্য দলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে শুরু করেন। উদ্দেশ্য পরের বছর ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করা। এ জন্য তিনি ও মওলানা ভাসানী দল গঠনে বিশেষভাবে মনোযোগ দিলেন। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে নিজেই লিখেছেন, ‘মওলানা ভাসানী, আমি ও আমার সহকর্মীরা সময় নষ্ট না করে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। পূর্ববাংলার জেলায়, মহকুমায়, থানায় ও গ্রামে গ্রামে ঘুরে এক নিঃস্বার্থ কর্মীবাহিনী সৃষ্টি করতে সক্ষম হলাম। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্ররা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে মনপ্রাণ দিয়ে রুখে দাঁড়ায়। দেশের মধ্যে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করেছিল। শাসনযন্ত্র শিথিল হয়ে গিয়েছিল। সরকারি কর্মচারীরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারত। খাদ্য সংকট চরম আকার ধারণ করে। বেকার সমস্যা ভীষণভাবে দেখা দিয়েছে। শাসকদের কোনো প্ল্যান প্রোগ্রাম নাই। কোনোমতে চললেই তারা খুশি। ... ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির কথা কেউই ভুলে নাই। আমরা তাড়াতাড়ি শাসনতন্ত্র করতে জনমত সৃষ্টি করতে লাগলাম। পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন দাবি মেনে নেওয়া ছাড়া এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্যভাষা না মেনে নিলে আমরা কোনো শাসনতন্ত্র মানব না। এ সময় ফজলুর রহমান সাহেব আরবি হরফে বাংলা লেখা পদ্ধতি চালু করতে চেষ্টা করেছিলেন। আমরা এর বিরুদ্ধেও জনমত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। কোনো কোনো মুসলিম লীগ নেতা এককেন্দ্রিক সরকার গঠনের জন্য তলে তলে প্রপাগান্ডা করছিলেন। আওয়ামী লীগ ফেডারেল শাসনতন্ত্র ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবির ভিত্তিতে প্রচার শুরু করে জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল। বিনা বিচারে কাউকে বন্দি করে রাখা অন্যায়। ফলে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠেছিল। প্রগতিশীল যুবক কর্মীরাও আওয়ামী লীগে যোগদান করতে আরম্ভ করল’ [শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ২০১৯ (নবম মুদ্রণ), পৃষ্ঠা ২৪৩-৪৪]। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দিন, তারিখ, ঘণ্টা ধরে এ সময়টায় শেখ মুজিবের চলাচলের বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। তা ছাড়া বিভিন্ন নেতাকর্মীকে তিনি যেসব চিঠি লিখেছেন, তারা তাকে যেসব চিঠি লিখেছেন- এসবেরই বিবরণ স্থান পেয়েছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৫৩ সালের ২৮ জুলাই মিসেস আনোয়ারা খাতুন এমএলএকে তিনি সোহরাওয়ার্দীর বার্তা পাঠিয়ে চিঠি দিয়েছেন। তাকে অল পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত করেছেন সোহরাওয়ার্দী- এ খবরটি দেওয়ার জন্য ওই চিঠি লিখেছিলেন তিনি। অন্যদিকে ৩৬ র‌্যাংকিন স্ট্রিটের এস আকবর আলি ১৯৫৩ সালের ২৯ জুলাইয়ের এক চিঠিতে শেখ মুজিবকে জানান সাংগঠনিক কাজের উদ্দেশ্যে তিনি সিরাজগঞ্জ রওনা হচ্ছেন। এ ছাড়া তার সম্ভাব্য ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালী সফরের খবরও গোয়েন্দারা লিখে রেখেছেন। নরসিংদী ও ভৈরব থেকে যে দুটি চিঠি লেখা হয়েছে, তার কাছে তাও ‘ইন্টারসেপ্ট’ করেছিলেন গোয়েন্দারা। নীলফামারীর খয়রাত হোসেনকে ১৯৫৩ সালের ৪ আগস্ট যে চিঠিটি লিখেছিলেন শেখ মুজিব, এরও কপি করেছেন গোয়েন্দারা এবং তা পরে ডেলিভারি করার সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ক্যাপটেন শামসুল হককে যে চিঠিটি লিখেছিলেন, এরও কপি তার ব্যক্তিগত ফাইলে সংরক্ষণ করেছিলেন গোয়েন্দারা।

এত বিস্তারিতভাবে লিখলাম এ জন্যই যে, পাঠকরা যেন অনুমান করতে পারবেন- কত নিবিড়ভাবে তাকে গোয়েন্দারা অনুসরণ করতেন। এ থেকেও বোঝা যায়, সেদিনের রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে কতটা গুরুত্ব দিত। এমন অনেক চিঠির কথা আছে প্রতিবেদনগুলোয়। অন্য আরেক চিঠিতে শেখ মুজিব তার নেতা সোহরাওয়ার্দীকে জানান, “শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ‘পাকিস্তান কৃষক প্রজা পার্টি’ গঠন করলেও তিনি শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশে যাবেন” (গোয়েন্দা প্রতিবেদন নম্বর ১৭১, খ- ৩, পৃষ্ঠা ৩৫৪)। এ ছাড়া ১৭৬ নম্বর প্রতিবেদনে (৩০ আগস্ট ১৯৫৩) উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার সূত্রাপুরে একটি নাগরিক সভায় উপস্থিত হয়ে তিনি জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে জনস্বার্থে প্রচ- শব্দদূষণকারী একটি তেলের কল সরিয়ে নেওয়ার দাবি করেছেন। এ ছোট ছোট জনদাবিই শেষ পর্যন্ত তাকে তৃণমূলে এতটা জনপ্রিয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল।

শেখ মুজিব বরাবরই যে তার নেতার সব কথা অন্ধভাবে মেনে নিতেন, তা নয়। ১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর (গোয়েন্দা প্রতিবেদন নম্বর ১৮৬) করাচি থেকে সোহরাওয়ার্দীকে যে চিঠিটি তিনি লিখেছেন, তা থেকে স্পষ্ট অনুমান করা যায়- বাংলা ভাষা ও পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে তাদের মতের অমিল ছিল। সোহরাওয়ার্দী মনে করতেন, শেখ মুজিব অনেকটাই বাম ঘেষা হয়ে পড়েছেন এবং পাকিস্তানের অখ-তাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। শুরুতে বাংলা ভাষাকে একটি প্রাদেশিক ভাষা বলতে চেয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী। কিন্তু শেখ মুজিব করাচি গিয়ে তার নেতাকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন- উর্দুর বিরুদ্ধে নয়, বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বাঙালিরা আন্দোলন করেছেন। পরে সোহরাওয়ার্দী বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন এবং বাংলার মর্যাদা রক্ষায় তার ভূমিকা পালন করেছেন। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির নানা মত সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মওলানা ভাসানী ও ফজলুল হক মিলে যুক্তফ্রন্ট গড়লেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও পরে তারা সঙ্গে নিলেন। শেখ মুজিব মুরুব্বিদের কথা মানতেন। তাই তিনি যুক্তফ্রন্ট্রের পক্ষে কাজ শুরু করে দিলেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান হওয়ায় শেখ মুজিব কাজে উৎসাহ পেতে শুরু করলেন। পুরনো মুসলিম লীগ ও নামসর্বস্ব দলের অনেক নেতা ফজলুল হকের ওপর ভর করে নমিনেশন পেয়ে গেলেন। আওয়ামী লীগের অনেক পোড়খাওয়া নেতাকে নমিনেশন না দিতে পারার দুঃখ শেখ মুজিবের মনে ছিল। তবুও তিনি লিখেছেন- ‘নেতারা ভালো বুঝে যা করেছিল, তাতে দেশের ভালোই হতে পারে।’ এভাবেই চলল নির্বাচনের প্রস্তুতি।

শেখ মুজিব গরিব মানুষের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে শুধু নিজে নয়, বিপুলভাবে আওয়ামী লীগ ও যুক্তফ্রন্টকে বিজয়ী করতে সক্ষম হলেন। ৩০০ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পেয়েছিল। তাই তিনি লিখেছেন, ‘দুনিয়ার ইতিহাসে একটি ক্ষমতাসীন দলের এভাবে পরাজয়ের খবর কোনোদিন শোনা যায় নাই। বাঙালিরা রাজনীতির জ্ঞান রাখে এবং রাজনৈতিক চেতনাশীল। এবারও তারা তা প্রমাণ করল। ... এমনকি পূর্ববাংলার প্রধানমন্ত্রী জনাব নূরুল আমিনও পরাজিত হন’ (ওই, পৃষ্ঠা ২৫৭)।

পূর্ববাংলার মানুষের এই বিজয় বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। বাঙালির অসাধারণ বিজয় দেখে ‘শাসকগোষ্ঠী, শোষকগোষ্ঠী ও আমলারা অনেকেই ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তবু আশা ছাড়েন নাই। তারা চক্রান্তমূলক নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করতে চেষ্টা করতে লাগলেন’ (ওই, পৃষ্ঠা ২৫৭)। তাই এমন বিপুলভাবে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার (যার কনিষ্ঠতম মন্ত্রী হয়েছিলেন শেখ মুজিব) মাত্র কিছুদিনের মধ্যেই কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে ক্ষমতাচ্যুত হয়। আর একমাত্র মন্ত্রী শেখ মুজিবকে জেলে যেতে হয়। কেননা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একমাত্র টার্গেট ছিলেন যে তিনিই। পূর্ববাংলার দুঃখী মানুষের ভরসার প্রতীক হিসেবে ততদিনে তিনি তার অবস্থান সুদৃঢ় করে ফেলেছেন। এ কারণে পাকিস্তানি এলিটদের চক্রান্তের পুরো চাপটি তাকেই বেশি করে বহন করতে হয়েছে।

(চলবে)

সংশোধনী : এই সিরিজের গত (২২) কলামে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খাজা নাজিমুদ্দিনের নামটি ভুলবশত লেখা হয়েছিল। আসলে তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোহাম্মদ আলী, বগুড়া। তারই বৈমাত্রেয় ভাই ছিলেন ওমর আলী চৌধুরী।

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

advertisement
Evaly
advertisement