advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কন্যা সারাজীবনই কন্যা

মেজর (অব) সুধীর সাহা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২৩:১৩
advertisement

বক্তব্যটি আমার নয়, সম্প্রতি ভারতের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি অরুণ মিশ্রের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এমন বক্তব্য দিয়েছেন। ২০০৫ সালে ভারতে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে পৈতৃক সম্পত্তিতে সমানাধিকার মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু এই সংশোধনীর ‘রেট্রোস্পেক্টিভ এফেক্ট’ নিয়ে এতদিন ধোঁয়াশা ছিল ভারতে। বেঞ্চের অবশিষ্ট দুজন বিচারপতি ছিলেন এস আবদুল নাজির এবং এম আর শাহ। সর্বসম্মতিক্রমে এই বেঞ্চ গত ১১ আগস্ট ২০২০ এ রায় দিয়েছেন। ২০০৫ সালের আগেও কারও বাবা মারা গিয়ে থাকলে তার সম্পত্তিতে তার ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকার রয়েছে। বিচারপতি মিশ্রের কথায় ‘মেয়েরা সারাজীবনই মেয়ে থেকে যায়। ছেলেরা শুধু বিয়ে হওয়া পর্যন্ত ছেলে থাকে।’ এই রায়কে ভারতবর্ষের সব লিঙ্গের সমানাধিকার বিষয়ে অন্যতম প্রধান রায় হিসেবে ধরা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধানে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে বৈষম্য করা হয়নি। কিন্তু পৈতৃক সম্পত্তি ভাগ করা নিয়ে এখানে ব্যবধান বিদ্যমান। ভারতেও ঠিক তেমনটাই ছিল। কিন্তু তাদের বর্তমান রায়টি সব বৈষম্যের অবসান করে দিল তাদের দেশে।

বাংলাদেশের প্রধান তিন ধর্মীয় সম্প্রদায় মুসলিম, হিন্দু এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার আইনে তিন রকম ভিন্ন ব্যবস্থা বিদ্যমান। বৌদ্ধদের জন্য কোনো উত্তরাধিকার আইন বাংলাদেশে নেই। তারা মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের পথ অনুসরণ করে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে নারী এবং পুরুষের পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার নেই। একজন নারী একজন পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তির অধিকারী হয় অর্থাৎ পিতার মৃত্যুর পর পুত্রসন্তান পায় তার সম্পত্তির যেটুকু অংশ, কন্যাসন্তান পায় তার অর্ধেকটা। একজন হিন্দু পিতার মৃত্যুর পর তার কন্যাসন্তান পিতার সম্পত্তিতে কোনো অধিকারই লাভ করে না। পিতার সম্পূর্ণ সম্পত্তিই তার পুত্রসন্তান লাভ করে। অন্যদিকে পিতার সম্পত্তিতে কন্যা ও পুত্রসন্তানের সমান অধিকারের আইন বিদ্যমান আছে খ্রিস্টান ব্যক্তিগত আইনে। এক দেশে তিন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের তিন রকম উত্তরাধিকার আইন বিদ্যমান। বাংলাদেশের সামাজিক এবং নারী আন্দোলনে নারীর সম-অধিকার বিষয়টি একটি শক্তিশালী অধ্যায়। নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এ দেশের নারী সমাজই শুধু নয়, বরং প্রগতিশীল পুরুষ সমাজও সোচ্চার হয়ে শত বছর ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে। নারীর মুক্তি, সমাজে এবং পরিবারে নারীর সম-অবস্থান, নারীর জাগরণ ইত্যাদি অনেক কিছুই মানুষের মুখে মুখে। সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, মিছিল-মিটিংয়ে নারীর সম-অধিকার বিষয়টি উচ্চৈঃস্বরে ধ্বনিত হয় হাজারো কণ্ঠে। ষোলো কোটি জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে অর্ধেকটাই নারী। সেই অর্ধেক নারী সমাজকে উপেক্ষা করে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়- এমন সত্য অনুধাবন করে নারী-পুরুষ সবাই নারী উন্নয়নের স্বার্থে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সমানভাবে জড়িত। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং নারী সমাজের উন্নয়ন সমার্থক শব্দ হিসেবে ধরা দিয়েছে সবার কাছে।

নারীমুক্তির বিষয়টি বাংলাদেশে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দ-ায়মান। স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ের পরিষদেও নারীর আগমন নিশ্চিত করা হয়েছে আইনের মাধ্যমে। সমাজে নারীকে প্রতিষ্ঠা করার স্বার্থে সরকারি কার্যালয়ে নারীর জন্য অগ্রাধিকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাইভেট অফিসগুলোতে অধিক হারে নারীকর্মীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারীকর্মীদের আধিক্যে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নারী আন্দোলনের অন্যতম পাদপীঠে পরিণত হয়েছে। নারীর প্রতি এত খেয়াল দেওয়ার পরও, নারী আন্দোলনে নারীর পাশাপাশি পুরুষের সাহায্য বিদ্যমান থাকার পরও, নারীর শিক্ষা বিস্তারের পরও এবং নারী সমাজের প্রতিটি স্তরে সমানভাবে আবির্ভাব হওয়ার পরও বাংলাদেশে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এখনো সম্ভব হয়নি। নারীর সম-অধিকারের জন্য আজও নারীকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে, পথে নামতে হচ্ছে। সব আছে, সব পাওয়া যাচ্ছে- কিন্তু তার পরও মনে হচ্ছে কিছু নেই। এই পাওয়া আর না পাওয়ার বেদনার সবচেয়ে বড় কাঁটা নারীর উত্তরাধিকার আইনে সমান অধিকার না পাওয়ার আইন। বাংলাদেশে একটি কন্যাসন্তান জন্ম লাভের সঙ্গে সঙ্গে সেই কন্যাসন্তান অসম পরিস্থিতির শিকার হয়। তার পরও কন্যাই সংসারের সুখ-দুঃখের ভাগীদার হয় সবচেয়ে বেশি। কন্যার দায়িত্বের পরিধি বড় হলেও প্রাপ্তির পরিমাণ পুত্রসন্তানের থেকে সর্বদাই কম হয়।

নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পিতা-মাতা থেকেই শুরু হয় বৈষম্য। জীবদ্দশায় পিতা-মাতা এই বৈষম্য পালনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আর তাই এ বৈষম্যের বিষ সময়ের ব্যবধানে আরও শক্তিশালী হয়ে দেখা দেয় পিতার মৃত্যুর পর, যখন তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে কন্যাকে বাদ বা অর্ধেক প্রদানের বিধান মেনে নিতে হয় সমাজকে। যদি তার জন্ম হয় হিন্দু পরিবারে, তবে পিতার মৃত্যুর পর পিতার সম্পত্তির ওপর তার কোনো অধিকারই থাকে না; পুরোটাই চলে যায় পুরুষের হাতে। শ্বশুরের মৃত্যু হলে সেই সম্পত্তিও স্বামীর, আবার পিতার মৃত্যু হলে সেই সম্পত্তিও ভাইয়ের। অন্যদিকে মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া কন্যা পিতার মৃত্যুর পর লাভ করে অর্ধেক অংশীদারিত্ব। শুধু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মেয়েরা পিতার সম্পত্তিতে সমান অধিকার লাভ করছে। আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণেই নারীরা সমাজে অন্যান্য বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ধর্মের অজুহাতেই আইনে এ বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুধর্মে এই বিশ্বাস প্রদান করা হয়েছে যে, কন্যা পিতার ঘরে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বসবাস করার তথা ভরণ-পোষণের সুযোগ পাবে; তার বিয়ের সঙ্গে সঙ্গেই পিতার ঘরের অধিকার থেকে কন্যা বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে মুসলিম কন্যার অধিকার অর্ধেক। ভাইয়ের অর্ধেক পেয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। নারীর মর্যাদা পুরুষের সমান নয়- এমন ধর্মীয় অনুভূতিরই বহির্প্রকাশ এই উত্তরাধিকার আইনে।

নারী-পুরুষকে সমান চোখে দেখতে হলে এবং সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই হিন্দু এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন আনতে হবে। মুখে শুধু নারীর অধিকার মেনে নেওয়া নয়, বরং আইনে যে বৈষম্য বিদ্যমান তা দূর করতে হবে। পিতার প্রতি সব সন্তানের সমদায়িত্ব এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠাই সত্য ও সুন্দর আইনের বহির্প্রকাশ হবে। এতে সমাজ থেকে একটি বড় বৈষম্য দূর হওয়ার পথ খুঁজে পাবে। ভারতের সুপ্রিমকোর্টের এই রায় বাংলাদেশের মানুষের চোখ খুলে দেওয়ার কাজটি করতে পারলে তা বাংলাদেশের প্রগতির জন্য অনেক বড় একটি উৎস হিসেবে কাজ করবে। সেখানে তারা পেরেছেন, তারা উত্তীর্ণ হয়েছেন। আমরাও কি পারব তেমন করে?

মেজর (অব) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement