advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

৬ কিলোমিটার পাইপলাইনের ওপর স্থায়ী স্থাপনা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে
নারায়ণগঞ্জে ‘তিতাস বোমা’

লুৎফর রহমান কাকন
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৮:৪৩
সিদ্ধিরগঞ্জে তিতাসের গ্যাস লাইনের উপর গড়ে উঠেছে অনেক স্থাপনা। যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা -আমাদের সময়
advertisement

নারায়ণগঞ্জের তল্লা বাইতুল সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত ৩৩ জন মানুষ মারা গেছেন। ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে গঠিত অধিকাংশ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ওই মসজিদের পাশ দিয়ে যাওয়া একটি আবাসিক গ্যাস পাইপলাইনের কয়েকটি ছিদ্র থেকে গ্যাস বেরিয়ে মসজিদে ঢোকে এবং বিদ্যুতের স্পার্ক থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয়রা বলছেন, শুধু তল্লার ওই মসজিদই নয়, নারায়ণগঞ্জে তিতাসের এ রকম ‘গ্যাসবোমা’ আরও অনেক রয়েছে। জেলার বিভিন্ন জায়গায় তিতাসের মূল সরবরাহ লাইনের ওপর গড়ে উঠেছে বাড়ি-বহুতল ভবন, এমনকি শিল্পকারখানা। সামান্যতম অবহেলায় যেখানে ঘটে যেতে পারে আরও বড় দুর্ঘটনা।

তল্লায় মসজিদে দুর্ঘটনার পর কিছুটা সক্রিয় হয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। তারা সম্প্রতি একাধিক গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তিতাসের পাইপলাইনের ওপর থেকে বাড়িঘর, শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা অপসারণের। তবে কার কথা কে শোনে। এসব বিজ্ঞপ্তিতে কারও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।

বিষয়টি নিয়ে তিতাসের মহাব্যবস্থাপক (পাইপলাইন) প্রকৌশলী আবদুল ওহাব আমাদের সময়কে বলেন, অনেক এলাকায় তিতাসের পাইপলাইনের ওপর মানুষ স্থায়ী বাড়িঘর, শিল্পকারখানা স্থাপন করে ফেলেছে। এগুলো সত্যি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে শিল্পকারখানার নিচ দিয়ে যে পাইপলাইন গেছে, এগুলো কোনো কারণে লিকেজ হয়ে আগুন লাগলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটবে। তিনি বলেন, তিতাস এসব পাইপলাইন চিহ্নিত করে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে শিগগিরই অভিযান চালাবে।

গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ঘুরে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। তিতাসের মূল সঞ্চালন পাইপলাইনের ওপর গড়ে উঠেছে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানা, মসজিদ, বাড়িঘর ও বহুতল ভবন। যে কোনো সময় এসব স্থাপনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে গোদনাইল জেলেপাড়ায় তিতাসের গ্যাসস্টেশন পর্যন্ত ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন রয়েছে। গোদনাইল থেকে সেই সঞ্চালন লাইনটি আবার ফতুল্লার পাগলা বিসিক এলাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অনেক পুরনো সঞ্চালন লাইনটি কয়েক বছর আগে নতুন করে আবার বসানো হয়। তবে এ লাইনের ওপর গড়ে উঠেছে অসংখ্য স্থায়ী স্থাপনা।

তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আলী মো. আল মামুন বলেন, ইতোমধ্যে প্রধান কার্যালয় থেকে সব জোনাল অফিসে নোটিশ পাঠানো হয়েছে তিতাসের পাইপলাইনের ওপর কী কী অবৈধ স্থাপনা আছে সেগুলোর তালিকা করে পাঠাতে। তিনি বলেন, সব জায়গায় সরকারি অধিগ্রহণ করা জমির ওপর তিতাসের সঞ্চালন লাইন স্থাপন করা হয়েছে। যারা এসব পাইপলাইনের ওপর বাড়িঘর, শিল্পকারখানা, মসজিদ বা অন্য কোনো স্থাপনা করেছেন তারা অবৈধভাবে স্থাপন করেছেন। এগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপসারণ করা হবে। যারা অপসারণ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়েরও নির্দেশ রয়েছে পাইপলাইনের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, দুই মাসের মধ্যে সব অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদ করা হবে। একই সঙ্গে যারা তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনের ওপর ঝুঁকিপূর্ণভাবে শিল্পকারখানা, বাড়িঘর স্থাপন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গোদনাইলের একটি গার্মেন্টের মালিক আমাদের সময়কে বলেন, তিতাস যখন কয়েক বছর আগে এখানে নতুন করে পাইপলাইন বসাতে আসে তখন প্রথমে বলেছিল আমার গার্মেন্ট ভেঙে ফেলতে। তবে পরে প্রকল্পের একজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে গার্মেন্টের মাঝখান দিয়ে কিছু অংশ ভেঙে পাইপলপাইন বসানোর ব্যবস্থা করে দেই। পরে সেটার ওপর নতুন করে স্থাপনা তৈরি করে নিয়েছি।

সিদ্ধিরগঞ্জের ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রুহুল আমিন মোল্লা বলেন, আমি যতটুকু জানি তিতাস যে পাইপলাইন স্থাপন করেছে সেই জমি তারা অধিগ্রহণ করেনি। স্থানীয় ভূমি অফিস বা ডিসি অফিসে তিতাস জমি অধিগ্রহণ করে নিয়েছে এমন কোনো রেকর্ডও নেই। এখনো বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়েই পাইপলাইন নেওয়া হয়েছে। এসব জমি ব্যক্তিমালিকের নামে রেকর্ড করা।

তিনি আরও বলেন, তিতাসের পাইপলাইনের ওপর অসংখ্য বাড়িঘর স্থাপনা রয়েছে। আমিও চাই এগুলো সুন্দর করে অপসারণ করুক। তা না হলে হয়তো তল্লার চেয়েও বড় দুর্ঘটনা ঘটবে।

সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম বলেন, তিতাস সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে গোদনাইল পর্যন্ত যে পাইপলাইন স্থাপন করেছে সে জন্য জমি অধিগ্রহণ করেনি। অনেকটা জোর করে মানুষের জমির ওপর দিয়ে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, তিতাস সর্বশেষ যখন পাইপলাইন স্থাপন করতে আসে, তখন মানুষকে জমি অধিগ্রহণের কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি।

শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিতাসের পাইপলাইনের ওপর গড়ে উঠেছে স্থায়ী স্থাপনা। আমাদের সময়ের গাজীপুর কালিয়াকৈর প্রতিনিধি মীর রবিউল করিম জানান, পোশাক শ্রমিক অধ্যুষিত কালিয়াকৈরে কয়েক লাখ অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া গ্যাসের পাইপলাইনের ওপর গড়ে উঠেছে অনেক স্থাপনা, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি আরও জানান, উত্তরবঙ্গ অভিমুখী তিতাস গ্যাসের মূল সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশ দিয়ে। এ পাইপলাইন থেকে কালিয়াকৈরের সফিপুর-মৌচাক এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ওপর গ্যাস বের হচ্ছে। ফলে মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে যানবাহনসহ পথচারীরা।

advertisement
Evaly
advertisement