advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

স্বামীকে বেঁধে নববধূকে ছাত্রাবাসে গণধর্ষণ

সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

সিলেট ব্যুরো
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০১:৩৩
advertisement

ফের নেতিবাচক সংবাদ শিরোনামে সিলেটের এমসি কলেজ শাখা ছাত্রলীগ। কলেজ ক্যাম্পাসে বেড়াতে আসা নববিবাহিত এক দম্পতিকে তুলে ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়ার পর স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে এমসি কলেজের ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার রাত আটটায় এ কা-ের তিন ঘণ্টা পর ভুক্তভোগী দম্পতিকে উদ্ধার করে পুলিশ। কিন্তু এ সময়কালে নানাভাবে সময়ক্ষেপণ করে ধর্ষকদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুুলিশের বিরুদ্ধে।

এদিকে ধর্ষিতাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে গাইনি বিভাগের এক অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে, জানিয়েছেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায়।
অন্যদিকে সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার জানিয়েছেন, অপ্রীতিকর যে কোনো ঘটনা এড়াতে ছাত্রাবাসে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ছাত্রাবাস ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সভা আহ্বান করা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজের প্রধান ফটকের দারোয়ান রাসেল মিয়া এবং চৌকিদার সবুজ আহমদ রুহানকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে জানান এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ। তিনি বলেন, এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হয়েছে। জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হবে।

শুক্রবারের এ ধর্ষণকাণ্ডের জেরে ছাত্রলীগ কর্মী শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, এম সাইফুর রহমান, মাহফুজুর রহমান মাছুম, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম ও তারেকের নাম উল্লেখসহ ৯ জনকে আসামি করে শাহপরান থানায় মামলা করেছেন নির্যাতিতার স্বামী। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায়, মাহফুজুর রহমান মাছুমের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলায়, অর্জুনের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে, রনির বাড়ি হবিগঞ্জে এবং তারেক সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা। অভিযুক্তরা স্থানীয় ছাত্রলীগের রণজিৎ গ্রুপের কর্মী বলে জানা গেছে। অভিযোগ আছে, এসব ছাত্রলীগ নেতাকর্মী অবৈধভাবে ছাত্রাবাসের বিভিন্ন কক্ষ ও শিক্ষকের বাসভবন দখল করে ক্যাম্পাস এবং এর আশপাশের এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন।
উপপুলিশ কমিশনার জানান, আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। শুক্রবার রাতেই পুলিশ অভিযান চালিয়ে ছাত্রাবাসের সাইফুর রহমানের রুম থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্র ও ছোরা উদ্ধার করেছে। ধর্ষণে অভিযুক্ত সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনেও আরেকটি মামলা হয়েছে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, সাইফুরের কোনো কক্ষ ছিল না। শিক্ষকের বাসা দখল করে বসেছিল সে; সেখান থেকেই অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

যেভাবে ধর্ষণ : পুলিশ, অভিযোগকারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রাইভেট কারযোগে স্বামীকে নিয়ে এমসি কলেজে বেড়াতে আসেন দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ির ভুক্তভোগী ওই নববধূ। তারা একটি প্রাইভেট কারে করে আসেন। গাড়িটি স্বামী নিজেই চালাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে কলেজ ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের বাইরে গাড়ি পার্ক করে একটি দোকানে সিগারেট কিনতে যান স্বামী। তার স্ত্রী গাড়ির ভেতরেই অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গাড়িটি ঘিরে ধরেন এবং অস্ত্রের মুখে নববধূকে জিম্মি করে গাড়িসহ ছাত্রাবাসের সামনে হাজির হন। অন্যদিকে তার স্বামী সিগারেট নিয়ে ফিরে এলে তাকেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একাংশ ধরে নিয়ে যান সেখানে। এর পর ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে স্বামীকে বেঁধে রেখে ছাত্রাবাস কম্পাউন্ডে রাখা প্রাইভেট কারটির ভেতরে একজনের পর একজন ধর্ষণ করেন তার স্ত্রীকে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এ সময় পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার একটি অপচেষ্টা চালানো হয় বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ হীন কা- আর চাপা থাকেনি। ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব না হলেও সময়ক্ষেপণের কারণে ধর্ষকরা সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, বলছে একটি সূত্র।
অসমর্থিত সেই সূত্রে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ভয় দেখিয়ে দম্পতিকে ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্য একটি সূত্র বলছে, পূর্ব বিরোধের জের ধরে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ কর্মী শাহ মাহবুবুর রহমান রনি অন্যদের সঙ্গে নিয়ে তরুণীকে তুলে নিয়ে যায় ও গণধর্ষণ করে।

ফেসবুকে অভিযুক্তরা : ফেসবুকে সরব এমসি কলেজে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এ গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত আসামিরা। তারা অনলাইনে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে সাফাই গাইছে। গতকাল সকালেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে গণধর্ষণ মামলার ৫ নম্বর আসামি রবিউল ইসলাম ও ৬ নম্বর আসামি মাহফুজুর রহমান মাসুমকে।
বেলা ১১টার দিকে রবিউল ফেসবুকে লেখেন, আমি এই নির্মম গণধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নই, আমাদের পরিবার আছে। যদি আমি এই জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত থাকি তা হলে প্রকাশ্যে আমাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। আমাকে এবং আমার প্রাণের সংগঠন ছাত্রলীগের নামে কোনো অপপ্রচার করবেন না।
আর মাহফুজুর লেখেন, এ রকম জঘন্য কাজের সঙ্গে আমি জড়িত নই। যদি জড়িত থাকার প্রমাণ পান প্রকাশ্যে আমাকে মেরে ফেলবেন।
ফেসবুকে সরব থাকার পরও আসামিদের গ্রেপ্তার করতে না পারা প্রসঙ্গে শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী জানান, আমরা তাদের গ্রেপ্তারে সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছি।

ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভের উত্তাপ
গণধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনে নেমেছেন এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছেন অন্যান্য কলেজের সহপাঠীরাও। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এমসি কলেজ ও সরকারি কলেজের শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তারা অভিযোগ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরও ছাত্রাবাস খোলা রেখে অপরাধের ক্ষেত্র তৈরি করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ধর্ষণকা-ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান বিক্ষোভকারীরা।
এ ছাড়া প্রগতিশীল ছাত্রজোটসহ কিছু ছাত্র সংগঠন সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায়ও মানববন্ধন করে।

প্রতিবাদের ঢেউ সুনামগঞ্জেও
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে এবং এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে সুনামগঞ্জে মানববন্ধন হয়েছে। গতকাল বিকালে পৌর শহরের আলফাত স্কয়ারে এ মানববন্ধন হয়। ‘ধর্ষণ ও নির্যাতনবিরোধী সুনামগঞ্জের জনগণে’র ব্যানারে আয়েজিত এ মানববন্ধনে শহরের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার লোকজন অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা দেশব্যাপী নারী নির্যাতন বন্ধে সরকারকে কঠোর ও সব ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং কঠিন বিচার দাবি জানান। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরী ভট্টাচার্য, কবি ও লেখক শামস শামীম, জেলা যুব ইউনিয়নের সভাপতি আবু তাহের, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সুব্রত সরকার, সাবেক যুুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিন্টু চৌধুরী, জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি সত্যজিৎ আচার্য ও নরেন ভট্টাচার্য, সুনামগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিব রহমান, জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আসাদ মনি প্রমুখ।

advertisement
Evaly
advertisement