advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:২০
advertisement

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ... রাজিউন)।

তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। মাহবুবে আলমের ছেলে সুমন মাহবুব তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে সুমন মাহবুব লেখেন- ‘আমার বাবা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে মারা গেছেন।’ অ্যাটর্নি জেনারেলের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য শোক জানিয়েছেন।

শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘মাহবুবে আলম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন একজন প্রথম সারির যোদ্ধা।’

শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তিনি একজন প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক আইনি বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ভূমিকা রেখেছেন এবং সব সময় ন্যায়নিষ্ঠ থেকে আইন পেশায় নিয়োজিত ছিলেন, যা অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।’

মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে মন্ত্রিসভার সদস্যরা ছাড়াও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু, দৈনিক আমাদের সময়ের প্রকাশক ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এসএম বকস কল্লোল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সংসদ সদস্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোক জানিয়েছেন।

গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে মাহবুবে আলম জ্বর অনুভব করেন। পরে ৪ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা সিএমএইচে ভর্তি হন। সেখানে নমুনা পরীক্ষায় তার করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। চিকিৎসাধীন তার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটলে গত ১৮ সেপ্টেম্বর আইসিইউতে নেওয়া হয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মাহবুবে আলম ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি দেশের ১৫তম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান। তার পর মৃত্যু অবধি ওই পদে ছিলেন। পদাধিকার বলে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও ছিলেন।

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এ ছাড়া সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন জড়িত থাকা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে থেকে লড়েছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের মামলায়ও যুক্ত ছিলেন মাহবুবে আলম। আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবীর দায়িত্বে ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলাও রাষ্ট্রপক্ষে থেকে অনেক দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন। মাহবুবে আলম সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির ১৯৯৩-৯৪ সালের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সম্পাদক ও ২০০৫-০৬ সালের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনে জয়ী হয়ে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে ২০০১ সালের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন মাহবুবে আলম। ২০০৭ সালে দেশে জরুরি অবস্থা জারির আগে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। সেনা নিয়ন্ত্রিত ওই সরকার আমলে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হওয়ার পর শীর্ষ আইনজীবীদের অনেকে পিছটান দিলেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। দৃশ্যত সে কারণেই তার ওপর আস্থাবান ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১৩ জানুয়ারি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তার পর থেকে টানা ১১ বছর ধরে তিনি এ দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে জন্মস্থান মুন্সীগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন মাহবুবে আলম। তবে তাকে প্রার্থী না করে অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বই চালিয়ে যেতে বলা হয়। মাহবুবে আলমের জন্ম ১৯৪৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মৌছামান্দ্রা গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং ১৯৬৯ সালে লোকপ্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি নেন। ছাত্রজীবনে বাম আন্দোলনে যুক্ত মাহবুবে আলম পরে বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভক্তির পর রাজনীতি ছেড়ে আইন পেশায় পুরোদমে সক্রিয় হন। তিনি অবশ্য ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে তালিকাভুক্ত হয়ে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। মাহবুবে আলম ১৯৭৫ সালে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৮০ সালে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি পান।

ভ্রমণপ্রিয় হিসেবে পরিচিত এই আইনজীবী দেশে ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশ নিতে বিভিন্ন সময় ভারত, শ্রীলংকা, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, হংকং, কোরিয়া ও তানজানিয়াসহ অনেক দেশ সফর করেছেন। রবীন্দ্র সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী মাহবুবে আলমের স্ত্রী বিনতা মাহবুব একজন চিত্রশিল্পী। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে সুমন মাহবুব দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় ছিলেন। মেয়ে শিশির কণা আইন পেশায় রয়েছেন।

advertisement
Evaly
advertisement