advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এমসি কলেজে গণধর্ষণ
সাইফুর দোষ চাপাল অন্যদের ওপর

সিলেট ব্যুরো
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১২:৪৭
এমসি কলেজে ধর্ষণকাণ্ডের প্রধান আসামি সাইফুর
advertisement

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-পুলিশ। এ নিয়ে মামলার এজাহারে নাম থাকা ৬ আসামির ৪ জন গ্রেপ্তার হলো। এ ছাড়া সন্দেহভাজন হিসেবে রাজন ও আইন উদ্দিন নামে আরও দুই ছাত্রলীগকর্মীকে আটক করা হয়েছে। গতকাল সোমবার তিন আসামি সাইফুর, অর্জুন ও রবিউলের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রিমান্ড শুনানিকালে সাইফুর ও অর্জুন দাবি করে, ধর্ষণকাণ্ডের মূলহোতা হচ্ছে রাজন, আইন উদ্দিন ও তারেক।

গতকাল প্রধান আসামি সাইফুর ও চার নম্বর আসামি অর্জুনকে আদালতে তোলা হলে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী দাঁড়াননি। আদালত আসামিদের কথা বলার সুযোগ দিলে তারা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে। তারা রাজন, আইন উদ্দিন ও তারেককে ওই ঘটনার মূলহোতা হিসেবে দাবি করে। তারেক এজাহারভুক্ত আসামি হলেও এখনো পলাতক। তারেকের সঙ্গে মাহফুজকেও খুঁজছে পুলিশ। শুক্রবার রাতের গণধর্ষণের ঘটনায় পরদিন সকালে ছয় জনের নাম উল্লেখ করে ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আইন উদ্দিন ও রাজনকে গতকাল সোমবার ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যার ৯-এর একটি দল। অন্য ৪ জনকে রবিবার গ্রেপ্তার করা হয়।

মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট খোকন কুমার দত্ত বলেন, বেলা পৌনে ১২টার দিকে সাইফুর রহমান ও অর্জুন লস্করকে কড়া নিরাপত্তায় আদালতে উপস্থিত করে শাহপরাণ থানার পুলিশ। বিকাল সোয়া ৩টায় রবিউলকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে আদালত ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গ্রেপ্তার রনি, রাজন ও আইন উদ্দিনকে আদালতে হাজিরের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান সিলেট মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) অমূল্য কুমার চৌধুরী।

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গ্রেপ্তার মাহবুবুর রহমান রনির মামা ও চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী জানান, রবিবার রাতে হবিগঞ্জ শহরের অনন্তপুরের একটি বাসা থেকে রনিকে আটক করে র‌্যাব। অন্যদিকে মামলার ৫ নম্বর আসামি রবিউল ইসলামকে নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর আগে রবিবার ভোরে গ্রেপ্তার হয় সাইফুর ও অর্জুন।

গত শুক্রবার এমসি কলেজে স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার হন এক গৃহবধূ। ওইদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে গৃহবধূকে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসে ধর্ষণ করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

এ ঘটনায় পরদিন গৃহবধূর স্বামী শাহপরান থানায় সাইফুর রহমান, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার উমেদনগরের রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক, হবিগঞ্জ সদরের বাগুনীপাড়ার জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, জকিগঞ্জের আটগ্রামের কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর, দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুর (জগদল) গ্রামের রবিউল ইসলাম ও কানাইঘাটের গাছবাড়ী গ্রামের মাহফুজুর রহমান মাসুমের নাম উল্লেখ করে আরও ৩ জন অজ্ঞাত আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন।

ছাত্রাবাসে মাদক ও জুয়ার আস্তানা

করোনার কারণে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে বন্ধ এমসি কলেজ। অথচ খোলা ছিল ছাত্রাবাস। মূলত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই বন্ধের সময় ছাত্রাবাসে থাকতেন। ছাত্রদের পাশপাশি অনেক অছাত্র ছিলেন ছাত্রাবাসে। ছাত্রাবাসকে মাদক ও জুয়ার আস্তানায় পরিণত করেছিলেন তারা। গণধর্ষণের পর ছাত্রাবাসের ভেতরে ছাত্রলীগের নানা অপকর্মের তথ্য বেরিয়ে আসে।

ছাত্রাবাসে অবৈধ অস্ত্রেরও মজুদ করেছিল ছাত্রলীগ। শুক্রবার রাতে ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত একটি কক্ষে অভিযান চালিয়ে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বেশ কিছু দেশি অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ২০১২ সালে এই ছাত্রাবাসই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমসি কলেজে বেড়াতে আসা দর্শনার্থীদের নানা সময় হয়রানি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। বিশেষত নারী দর্শনার্থীদের হয়রানি ও অনেক সময় শ্লীলতাহানির শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের প্রশ্রয়ে এমনটি ঘটত কিনা তা-ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

কলেজের এই ছাত্রবাসের তত্ত্বাবধায়ক জামাল উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বন্ধের সময় কিছু ছাত্রকে মানবিক কারণে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। এরই মধ্যে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটবে তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ আহমদ বলেন, জুয়া বা মাদকের আসর বসানোর কোনো অভিযোগ আমরা আগে পাইনি। তবে কলেজ ছাত্রাবাসে তাদের (ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের) সিট না থাকলেও মাঝেমধ্যে গিয়ে তারা ছাত্রাবাসে থাকত- এমন তথ্য পেতাম। এটি শুনে আমরা তাদের একাধিকবার ডেকেছি, থাকার কারণ জানতে চেয়েছি। তখন তারা বলত, ‘স্যার, মাঝেমধ্যে যাই-টাই’। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটিকে ৭ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তারা কাজ করছেন।

মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল সাইফুর ও রনি :

গণধর্ষণের আসামি সাইফুর রহমান ও শেখ মাহবুবুর রহমান রনি ক্যাম্পাসে ছিল মূর্তিমান আতঙ্ক। শিক্ষক, সাধারণ শিক্ষার্থী, নিজ দলের কর্মী ও কলেজের পাশর্^বর্তী টিলাগড় এলাকার ব্যবসায়ীদের কাছে ত্রাস ছিল তারা। অভিযোগ রয়েছে- সাইফুর ও রনির ইভটিজিং ও নির্যাতনের শিকার হয়ে কলেজ ছেড়েছেন অনেক ছাত্রী। ক্যাম্পাসে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, কলেজে বেড়াতে আসা তরুণীদের হয়রানি ছিল তাদের নৈমিত্তিক কাজ। ক্যাম্পাসে আধিপত্য থাকায় দলের ‘বড় ভাই’দের কাছেও বিশেষ কদর ছিল তাদের। আর নির্যাতনের ভয়ে মুখ খোলার সাহস পেতেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গণধর্ষণের ঘটনার পর ধীরে ধীরে বের হয়ে আসতে শুরু করেছে সাইফুর-রনি ও তাদের সহযোগীদের নানা অপকর্মের কাহিনি।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সাইফুর ও রনি তাদের টর্চারসেল গড়ে তোলে। হোস্টেল সুপারের বাংলো দখল করে থাকত সাইফুর। ভয়ে অন্যত্র থাকতেন হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন। হোস্টেলের নতুন ভবনের ২০৫ নম্বর কক্ষ ও বাংলোতে সাইফুরের নেতৃত্বে বসানো হয় ‘শিলং তীর জুয়া’র আসর। এ ছাড়া প্রতিরাতে বসত মাদকের আসর।

২০১৩ সালে কলেজে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সময় চাঁদাবাজি শুরু করে সাইফুর ও তার সহযোগীরা। এতে বাধা দেওয়ায় নিজ দলের কর্মী ছদরুল ইসলামের বুকে ছুরিকাঘাত করে সাইফুর। পরে নেতাদের চাপে ছদরুল বাধ্য হয়ে মামলা আপস করেন। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় প্রায় আড়াই বছর আগে ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত করে রনি। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায় সে।

রনি ও তার সহযোগী ধর্ষণ মামলার অন্যতম আসামি তারেক নিজেদের র‌্যাব-পুলিশ পরিচয় দিত বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ পরিচয়ে লোকজন অপহরণ করে ছাত্রাবাসে নিয়ে মুক্তিপণ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সাইফুর ও রনি চক্রের হাতে ক্যাম্পাসে একাধিকবার সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।

সাক্ষ্য দিতে বিজ্ঞপ্তি

গণধর্ষণের ঘটনায় সাক্ষ্য দিতে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কলেজ তদন্ত কমিটি। গতকাল সকালে এ বিজ্ঞপ্তি কলেজের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয়। তদন্ত কমিটির প্রধান আনোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত ও কলেজ অধ্যক্ষ সালেহ আহমদের অনুস্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আজ মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় ওই ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকলে কলেজের শিক্ষাবিদ সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দিতে অনুরোধ করা হয়।

ঢাবি ছাত্রদলের বিক্ষোভ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, সিলেটের এমসি কলেজে গণধর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ছাত্রদল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আয়োজনে এ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করা হয়।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে টিএসসি মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়। সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোর্শেদ হোসেনের অব্যাহতি বাতিল করে তাকে চাকরিতে বহাল রাখারও দাবি জানানো হয়।

সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিবুল হাসানের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব আমানের সঞ্চলনায় বক্তব্য রাখেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন, সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল, সিনিয়র সহসভাপতি কাজী রফিকুল ইসলাম শ্রাবণ, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান আমিন প্রমুখ।

 

 

 

advertisement
Evaly
advertisement