advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মিন্নিরও ফাঁসি, সঙ্গে ৫ জনের

চার জন খালাস

মাহবুব আলম মাননু, বরগুনা
১ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ অক্টোবর ২০২০ ০০:২৯
advertisement

মেয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার।

ন্যায়বিচার পাননি বলে দাবি মিন্নির বাবার। আপিল করবেন। রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন রিফাতের বাবা

বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় প্রাপ্ত বয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ জনকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪ আসামি বেকসুর খালাস পেয়েছেন।

বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এ হত্যা মামলার প্রাপ্ত বয়স্ক ১০ আসামির বিচার শেষে গতকাল বুধবার এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত ৬ আসামির মধ্যে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ছাড়া বাকি ৫ আসামি হলেন- মোহাইমিনুল ইসলাম ওরফে সিফাত (১৯), রাকিবুল হাসান রিফাত ফরাজি (২৩), রাব্বি

আঁকন (২১), রেজওয়ান আলী খান হৃদয় (২২) ও মো. হাসান (১৯)। মামলায় খালাসপ্রাপ্ত ৪ আসামি হলেন- মো. সাগর, কামরুল ইসলাম সাইমুন, মো. মুসা ও রাফিউল ইসলাম। এর মধ্যে মো. মুসা পলাতক।

রাষ্ট্রপক্ষ ও নিহত রিফাত শরীফের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ এ রায়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আর মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরসহ আসামিপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করে উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, এ রায় নিঃসন্দেহে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নিশ্চয় বিচার বিভাগে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

রায় ঘোষণা উপলক্ষে গতকাল সকাল ৯টার আগেই বাবা মোজাম্মেল হক কিশোরের মোটরসাইকেলে করে আদালতে উপস্থিত হন জামিনে থাকা আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। এ ছাড়া বাকি ৮ আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। রায়ের আগে মিন্নি ও তার বাবা বলছিলেন, খালাস পাবেন বলে তারা বিশ্বাস করেন।

বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে রায় ঘোষণা শুরু করেন বিচারক মো. আছাদুজ্জামান। এ সময় পলাতক মুসা ছাড়া মিন্নিসহ বাকি ৯ আসামি এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। আদালত ২০০ পৃষ্ঠার রায়ের মূল অংশ পড়ে শোনান। রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় দ-িত বাকি আসামিদের সঙ্গে মিন্নিকেও আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ভুবনচন্দ্র হাওলাদার বলেন, সাক্ষ্য প্রমাণে আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি বলেই আদালত ৬ জনকে ফাঁসির রায় দিয়েছেন।

জানা যায়, মামলার ১ নম্বর আসামি রাকিবুল হাসান ওরফে রিফাত ফরাজী (২৩) বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে। সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে যে তিনজনকে রাম দা হাতে রিফাত শরীফকে কোপাতে দেখা গিয়েছিল, তাদের মধ্যে রিফাত ফরাজী একজন। আদালত তাকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন। আসামি আল কাইয়ুম ওরফে রাব্বি আঁকন (২১), মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত (১৯), রেজোয়ান আলী খান হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় (২২) এবং মো. হাসানকেও (১৯) একই সাজা দিয়ে আদালত বলেছেন, হত্যাকা-ের সময় তারা চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছিল। হত্যাকা-ে তাদের সহযোগিতার বিষয়টি প্রমাণিত।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর আদালতে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। আমরা অবিচারের শিকার। আমার মেয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব। মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলামও আপিল করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, আমরা বলেছিলাম, রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এ রায়ে সংক্ষুব্ধ।

অন্যদিকে মামলার বাদী রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আমরা রায়ে সন্তুষ্ট।

২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে শত শত লোকের উপস্থিতিতে স্ত্রী মিন্নির সামনে রিফাত শরীফকে (২৫) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সে দিনই রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করার একটি ভিডিও ফুটেজ দেশব্যাপী ভাইরাল হয়। এতে দেখা যায়, ধারালো দা দিয়ে রিফাতকে একের পর এক কোপ দিতে থাকেন দুই যুবক। ওই সময় রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি খোলা অস্ত্র হাতে উদ্যত দুই যুবককে বারবার প্রতিহতের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত রিফাতকে বরিশালের হাসপাতালে নেওয়ার পর সেদিনই বিকালে তিনি মারা যান। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে বরগুনা থানায় হত্যা মামলা করেন; এতে মিন্নিকে প্রথমে করা হয় প্রধান সাক্ষী। যার নেতৃত্বে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়, হত্যা মামলার প্রধান আসামি সেই সাব্বির আহম্মেদ ওরফে নয়ন বন্ড (২৫) গত বছরের ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। ঘটনার কিছুদিন পর আরেকটি ভিডিও ভাইরাল হলে মামলার প্রধান সাক্ষী মিন্নিকে গত বছরের ১৬ জুলাই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের তদন্তে স্বামী হত্যায় ফেঁসে যান মিন্নি। পরদিন তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। দুদিন পর মিন্নিকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।

পরদিন বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মিন্নি তার স্বামী রিফাত শরীফ হত্যাকা-ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। এ হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

অবশ্য মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন শুরু থেকেই অভিযোগ করেন, নির্যাতন করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে মিন্নিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে পুলিশ। এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের হাত আছে।

গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর মিন্নিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি রিফাত হত্যা মামলার প্রাপ্ত বয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। এর পর ৭৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারিত হয়। সে অনুযায়ী গতকাল রায় দেন আদালত।

এদিকে এ মামলার ১৪ অপ্রাপ্ত বয়স্ক আসামির বিচারে তাদের পাঠানো হয় শিশু আদালতে। এই ১৪ জন হলো- হাজতে থাকা রিসান, রিফাত হাওলাদার, রায়হান, অলিউল্লাহ (অলি), নাঈম, তানভীর এবং জামিনে থাকা চন্দন, রাতুল, নাজমুল হাসান, নিয়ামত, মারুফ বিল্লাহ, মারুফ মল্লিক, আরিয়ান শ্রাবণ ও প্রিন্স মোল্লা। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু আদালতে এসব অপ্রাপ্ত বয়স্ক আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জেরা করা হয়। এ সময় আদালতে উপস্থিত সব আসামি নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বক্তব্য দেয়। আগামী ৫ থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য করেছেন আদালত।

advertisement
Evaly
advertisement