advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বাজারে আগুন, দমকল বাহিনী কার হাতে

অঘোর মন্ডল
১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০৫
advertisement

পেঁয়াজের সেঞ্চুরি! অবশ্য তার একটা ডাবল সেঞ্চুরি ছিল গত মৌসুমে। হাফ সেঞ্চুরি পেরিয়ে গেছে আলু! শিম-পটোল-ঢেঁড়স-বেগুন সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি। সবজির দাম যেভাবে আকাশমুখী তাতে সবচেয়ে বিপাকে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষগুলো। কিংবা মাসিক বেতন দিয়ে যাদের সংসার চালাতে হয়। পেঁয়াজের ঝাঁজ আর বাজারে দামের আগুনে পোড়া আলু দেখে বিপন্ন সাধারণ মানুষ। আলু-পেঁয়াজের দামের এই ঊর্ধ্বমুখী লাফ দেখে কৃষকের হাততালি দেওয়ার কিছু নেই। কারণ আলু-পেঁয়াজ মৌসুমের শুরুতেই তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। সেটা খুব সস্তা দামে। এখন ক্রেতার পকেট কেটে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন যারা তারা মজুদদার। মধ্যস্বত্বভোগী। বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগটা ভালোভাবেই কাজে লাগাচ্ছেন তারা। সরকারের আদেশ-নির্দেশ কোনো কিছুরই পরোয়া করার প্রয়োজন পড়ে না তাদের। কারণ মজুদদার, ফড়িয়া, মধ্যস্বত্বভোগীরা বুঝে গেছেন, সরকার তাদের স্বার্থটাই দেখবে! সরকারের মধ্যে মন্ত্রী-জনপ্রতিনিধিরা বেশিরভাই ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের স্বার্থ অক্ষুণœ থাকবে, তার অলিখিত একটা গ্যারান্টি পেয়ে যান তারা।

যদি তাই না হতো, তা হলে সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর আলুর খুচরা দাম সর্বোচ্চ ত্রিশ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বাজারে সেই আলু কীভাবে বিক্রি হচ্ছে পঞ্চাশ টাকার ওপরে। বাজারে আলুর সরবরাহ কম তাও নয়। হিমাগারে আলু পড়ে আছে। একটু একটু করে ছাড়া হচ্ছে। দাম চড়া রাখা হচ্ছে। পেঁয়াজের দাম যখন লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে গেল, তখন বাণিজ্যমন্ত্রী বললেন, ‘ভারত হঠাৎ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় দাম বেড়েছে। অন্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে। এলে ঠিক হয়ে যাবে।’ পেঁয়াজ এসেছে। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব নেই। আর আলু তো বিদেশ থেকে আনার দরকার নেই। তা হলে তার দাম এভাবে বাড়ল কেন? আলু-পেঁয়াজের যখন বাড়তি দাম, তখন অন্য সবজি কম মূল্যে ক্রেতার ব্যাগে ঢুকবে কেন?

খুচরা বিক্রেতাদের কাছে জানতে চাইবেন সবজির বাজার কেন এত চড়া? একটা উত্তরÑ বারকয়েক বন্যা হয়েছে। সবজিক্ষেত নষ্ট হয়েছে। তাই বাড়তি দাম। বন্যার কথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে আলু তো আর বন্যায় ভেসে যায়নি। কিংবা আলুক্ষেতও বন্যায় নষ্ট হয়নি। তার দাম কেন এত চড়া হবে? সাম্প্রতিক অতীতের একটা সেøাগানকে ভুল প্রমাণ করা এর একটা অন্যতম কারণ হতে পারে। ‘বেশি বেশি আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান।’ এখন চালের দাম আর আলুর দাম সমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চালের দাম কম। আলুর দাম বেশি! ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। সেই ছোটবেলা থেকে কথাট শুনে আসছি। মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত বাঙালির জন্য কথাটা ঠিক। কিন্তু যাদের মাছ কেনার পয়সা নেই কিংবা দুবেলা দুমুঠো ভাত জোগাড় করার সামর্থ্য ছিল না তাদের কাছে আলুভর্তা-ভাতই বড় প্রাপ্তি। সেই আলুভর্তা-ভাত জোগাড় করা এখন দিনমজুরদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ আলুর দাম নাগালের বাইরে।

একে তে করোনাকাল, তার ওপর নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, সাধারণ মানুষের নাভিশ^াস ওঠার জোগাড়। জাতিসংঘ বলছে, ক্ষুধার হার কমাতে হবে। সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারও সেই কথাগুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছে না। কিন্তু তার পর অতিমুনাফালোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার কাজটা বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সমাজ আর রাষ্ট্রের ভিতটা এখন দাঁড়িয়ে গেছে অসাম্যের পিলারের ওপর। দেশ স্বাধীনের পরপর বঙ্গবন্ধু বারবার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, মুনাফাখোর-ঘুষখোরদের কারণে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নটা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধুর কথাটাই অধিকতর সত্য হিসেবে ফুটে উঠছে। তার নিজের হাতে গড়া দলটাও আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। দলটা চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে। রাজনীতি-দল-রাষ্ট্র যখন ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করবেন, তখন আলু-পেঁয়াজের দাম অকারণে বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

পণ্য মজুদ আইনে পরিবর্তন না আনলে মজুদদারদের কারসাজিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। যার সুফল পাবে না কৃষক। আর বাজার হবে নিয়ন্ত্রণহীন। যার ভোগান্তি পোহাতে হবে সাধারণ ক্রেতাকে।

অত্যাবশ্যক পণ্য আইন দেশে হয়তো একটা আছে। যাতে পেঁয়াজ-আলু ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সীমাবহির্ভূত মজুদ বন্ধ থাকার থাকা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ফড়ে-দালাল-মহাজনদের দাপটে ওইসব আইন-টাইনের কোনো বালাই নেই। যে কারণে বাজারের জোগান বা সরবরাহে কৃত্রিমভাবে রাশ টেনে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে। এই অনৈতিক মুনাফালোভী কারবারির কারণে বাজারের এই বেহাল!

আসলে খলের-ছলের অভাব নেই। পেঁয়াজের দাম বাড়ল কেন? ব্যবসায়ীদের উত্তরÑ পেঁয়াজ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোজ্যসামগ্রী। আমদানিও হয়েছে। কিন্তু এটা পচনশীল খাদ্যসামগ্রী। তাই দাম কমানো সম্ভব নয়। সরকারও নিশ্চুপ। পেঁয়াজ তো নতুন করে পচনশীল পণ্য হয়নি! তা হলে মাসদুয়েক আগে কীভাবে পঁচিশ থেকে ত্রিশ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে? আসলে উত্তরটা খুব সহজ। কৃত্রিমভাবে জোগান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ মুনাফা করছে মজুদদাররা। সুযোগটা পাচ্ছেন তারা আইনের নজরদারি না থাকায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষক এবং ক্রেতার অধিকার ও স্বার্থ কোনোটাই অক্ষুণœ রাখা যাচ্ছে না। ফড়িয়া-দালাল আর মজুদদাররা একচেটিয়া বাজার দখল করে নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর জোগান আর মূল্য নিয়ন্ত্রণের রশিটি এখন তাদের হাতে। লাগামহীন মজুদ, কালোবাজারি, আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং তা নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মনে অন্যরকম এক উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। মানুষের মনের এই ভয়-শঙ্কা-উদ্বেগ দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। অসাধু কারবারিরা যেভাবে আলু-পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটে নিচ্ছে তা কার্যত প্রশাসনের বিরুদ্ধেই বড় চ্যালেঞ্জের শামিল।

আমাদের দেশে ফেব্রুয়ারি বা মার্চের দিকে যখন বাজারে নতুন আলু আসে তখন বেশিরভাগ কৃষক পানির দামে তা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। কারণ প্রথমত, পেটের দায়। দ্বিতীয়ত, আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগারের অভাব। তা হলে হিমাগারে আলু রাখেন কারা? বেশিরভাগ আলু মজুদ রাখেন হিমাগারের মালিকরা। সঙ্গে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী ‘ফড়ে’রা। আলুর বাজারের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক এখন তারাই। তাই সরকারের বেঁধে দেওয়া ত্রিশ টাকা দামের আলুর কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বিনা বাধায়। হিমাগারের লাইসেন্স কাদের নামে, তারা কী পরিমাণ আলু মজুদ করেছেন এসব তথ্য কি সরকারি কর্তাদের জানা নেই। আছে। কিন্তু তাদেরও করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। মাঝে মধ্যে কিছু অভিযান চালানো, খুচরা মূল্য-পাইকারি মূল্যের তালিকা চেক করা ছাড়া তারাই বা করবেন কী! কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, বর্ষার সময় বা তার পরপর যখন প্রকৃতির নিয়মে বাজারে অন্যান্য সবজির জোগান কমে আসে ঠিক সেই সময় মজুদদাররা আলু-পেঁয়াজের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেন।

শীত আসার আগে এ ব্যাপারে প্রশাসনের শীত ঘুম ভাঙবে বলে মনে হয় না। এর মধ্যে আলু-পেয়াঁজের দাম নিয়ে হইচই পড়ে গেছে। তার মাঝে অন্যান্য সবজির দাম খুব দ্রুতগতিতে ঊর্ধ্বমুখী। এই ঊর্ধ্বমুখী দাম কোথায় গিয়ে থামবে তা বাজার অর্থনীতিবিদরা বলতে পারছেন না। তবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফাকারীরা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান।

সরকার চাইলে দালাল-ফড়ে-মজুদদারদের তৈরি এই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফা লোটা বন্ধ করা সম্ভব। ধান-চাল-গম কেনার ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগী হয়ে যদি সাফল্য দেখাতে পারে; তা হলে আলু-পেঁয়াজ নিয়ে ‘বাড়তি মুনাফা’র এই খেলা কি বন্ধ করা সম্ভব নয়? কৃষকের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়, মজুদ এবং বিপণন এই দায়িত্বটা সরকারকেই নিতে হবে।

অঘোর মন্ডল : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement