advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ও কিছু কথা

ড. আফরোজা পারভীন
১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০৫
advertisement

ধর্ষণ শব্দটা শুনতে যেমন অশ্লীল, বানান তেমন কঠিন, উচ্চারণও জঘন্য। কিন্তু এ শব্দটিই এখন সমাজ জীবনে সবচেয়ে সহজলভ্য শব্দ। আমাদের চারপাশে সর্বক্ষণ উচ্চারিত হচ্ছে। এই যে আমি লিখছি, এই সময়ের মাঝেই হয়তো ঘটে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ধর্ষণ।

একটা সময় ছিল, যখন ধর্ষণ করার জন্য আড়াল লাগত। অন্ধকার লাগত, নির্জনতা লাগত। মানুষের মনে এই বোধ ছিল যে, ধর্ষণ একটা খারাপ কাজ। কিন্তু এখন ধর্ষণ এক মহোৎসবের কাজ। একা একা করলে চলে না, দলবদ্ধ হয়ে উল্লাস করে করতে হয়। যেমন হয়েছে এমসি কলেজে। বেগমগঞ্জের ভিকটিম বলেছেন, তাকে ধর্ষণ করা হয়নি। কিন্তু যেভাবে দলবেঁধে তার সর্বাঙ্গে টর্চ মেরে মেরে দেখা হয়েছে, নানা ধরনের জিনিস ব্যবহার করা হয়েছে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিজাতীয় আনন্দে, আর সেগুলো ভিডিও করা হয়েছে, তাতেই বোঝা যায় আমাদের এখন আর মানুষ বলা চলে না। আমার এক পুরুষ বন্ধু বেগমগঞ্জের ভিডিওটা দেখতে গিয়ে বমি করেছে। তা হলে সহজেই অনুমেয় একজন নারী ও ভিডিও দেখলে তার মনে কী মারাত্মক বিবমিষার উদ্রেগ হবে। কতটা ক্ষতি হবে তার শারীরিক মানসিক!

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। ইতোমধ্যে মহামান্য রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। সংসদ চলমান না থাকায় এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় বিষয়টি জরুরি বিবেচনা করে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের কতিপয় ধারা সংশোধন করে অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছে। পরবর্তী সংসদে অধ্যাদেশটি আইনে রূপ নেওয়ার কথা। আর অধ্যাদেশ জারির পর টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে অপহরণের পর দল বেঁধে ধর্ষণের দায়ে পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদ- দিয়েছেন আদালত।

কোনো সন্দেহ নেই, সবার জানা, জনদাবির মুখে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। দেশে প্রতিনিয়ত যেভাবে ধর্ষণ হচ্ছে, তাতে দাবি ওঠা যৌক্তিক। কিন্তু ‘ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-’ এই অধ্যাদেশ জারি করলেই কি ধর্ষণ কমবে? বা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- এই রায় দিলেই কি তা কার্যকর হবে?

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯/১ ধারায় ধর্ষণের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- ছিল। এ ধারাটি সংশোধন করে মৃত্যুদ- বা যাবজ্জীবন কারাদ- করা হয়েছে।

ধর্ষণ এবং ধর্ষণের ফলে মৃত্যুর কারণে ইয়াসমিন হত্যাসহ একাধিক মামলায় ধর্ষকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। তাতে ধর্ষণ মোটেও কমেনি। আমার কথা হচ্ছে, আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- রাখা হয়েছে ভালো কথা। কিন্তু আমরা ধর্ষণ ঘটে যাওয়ার পর কী শাস্তি হবে, সেটা নিয়ে আগাম চিন্তা করব নাকি ধর্ষণ যাতে না হয় সে চিন্তা করব? একটি মেয়েকে ধর্ষণ করা হলো, তার পর মামলা-মোকদ্দমা হলো, ধর্ষকের ফাঁসি হলো। তাতে মেয়েটার লাভ কতটুকু? লাভ এতটুকুই যে, তাকে ধর্ষণ করার একটা শাস্তি হলো। কিন্তু ধর্ষণের কারণে তার জীবনটা যে তছনছ হয়ে গেল, সে এই পিছিয়ে থাকা সমাজ-সংসারে যে অসম্মানের জীবনযাপন করল, তার কি কোনো কিনারা হলো এই শাস্তির কারণে! এ সমাজ এমন যে, একটা মেয়ে ধর্ষিত হলেই ধরে নেয় সে খারাপ তাই ধর্ষিত হয়েছে, সেই দোষী। আমি এই আইনের বিপক্ষে বলছি না। কিন্তু আমি বলছি, এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন যাতে পুরো দেশ, পুরো সমাজ, পুরো সংসারে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উচ্চারিত হয়। তা হলেই ধর্ষণ কমা বা বন্ধ হওয়া সম্ভব। এমনিতেই ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরিবার ধর্ষণের কথা প্রায়ই চেপে যায় সমাজে জানাজানি হওয়ার ভয়ে। তার পরও যারা সাহস করে থানা অবধি যায়, থানা তাদের অনেকেরই মামলা নিতে চায় না। কারণ ধর্ষকরা ক্ষমতাশালী হয়। মামলা যদি করতেও পারে ক্রমাগত হুমকি আসতে থাকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য, জীবনের হুমকি আসে। এসব কিছু পার করে যারা টিকে থাকে এবার তারা পড়ে মামলার দীর্ঘসূত্রতার কবলে। ভুয়া সাক্ষী দেওয়া, ভুয়া প্রমাণ জোগাড় করার লোকেরও অভাব হয় না ক্ষমতাশালীদের পক্ষে। কাজেই রায় অবধি পৌঁছার সুযোগ খুব কম ভিকটিমেরই হয়। বেগমগঞ্জের কথাই ধরি। ঘটনাটি ঘটেছিল এক মাস আগে। সমাজ-সংসারের ভয়ে মেয়েটি চেপে রেখেছিল। আর এখন যে জানাজানি হয়েছে মেয়েটি রাত কাটাচ্ছে আজ এর, কাল ওর বাড়ি। ওই মেয়ের জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে! কতদিন দেবে!

মৃত্যুদ- সর্বোচ্চ শাস্তি মানে ধর্ষকের সতর্কতা বেশি হবে। স্বভাব তো তাদের বদলাবে না। তারা ধর্ষণ করবে, তবে প্রমাণ রাখবে না। এখন মেয়েগুলো ধর্ষণের পর বেঁচে যায়, এর পর অনেক ক্ষেত্রেই তারা আর বাঁচবে না। মামলা করার জন্য, সাক্ষী দেওয়ার জন্য, ধর্ষককে চেনার জন্য ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীকে বাঁচিয়ে রাখা হবে না। তাই যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে এবার শুধু ধর্ষণ নয়, ধর্ষকের হাতে হত্যাও বাড়বে। আর যদি সে মেয়ে বাঁচেও আইনের ফাঁকফোকর আগেও ছিল, এখনো আছে। আদালতের ওপরও আছে আরও বড় আদালত। তাই ফাঁসি পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

আবার অন্য সম্ভাবনাও আছে। যেহেতু সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-, কিছু ফলস মামলাও সাজানো হতে পারে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। ধনীদের মধ্যে একশ্রেণির নারী আছে তাদের দিয়ে অনেক কিছুই করানো সম্ভব। মাত্র কিছুদিনের মধ্যে এমন অনেক প্রমাণ আমরা পেয়েছি। আর টাকার লোভে দরিদ্র কোনো কোনো নারী এমনটা করবেন না, তাও বলা যায় না।

শাস্তি বাড়ানোতে ধর্ষণ কমবে বলে মনে হয় না। শাস্তি বাড়ালেই যে মামলা বাড়বে, এমনও নয়। আসল বিষয় হচ্ছে প্রতিরোধ। এই ডিটিজাল যুগে এমন কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না যে, কোথাও এ ধরনের ঘটনা সংঘটিত হলে একটা অ্যালার্মের মতো বাজতে থাকবে। সবাই জেনে যাবে। বুঝতে পারবে কোন স্পটে বিষয়টি ঘটছে। পাড়া-মহল্লায় কি প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলা যায় না। একসময় এ দেশের সেরা ছাত্ররা ছাত্র রাজনীতি করত। আজকাল ছাত্র রাজনীতির কথা শুনলেই সবার নাক কুঁচকে ওঠে। এই ছাত্রনেতাদের কি কাজে লাগানো যায় না ধর্ষণ প্রতিরোধে? তাদের দিয়েই কি গঠন করা যায় না ছোট ছোট স্কোয়াড?

পুলিশকে আরও কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া দরকার। মামলা দিতে এলেই যেন তারা মামলা না নিয়ে বিদায় না করে দেয়, সেটা দেখা দরকার। পুরো ঘটনা শুনে, আলামত দেখে যেন পুলিশ ব্যবস্থা নেয়, সেটা দেখা প্রয়োজন। পুলিশ যেন হয় নির্যাতিতের পক্ষে মানবিক পুলিশ, নির্যাতনকারীর পক্ষে নয়। সবশেষে ধর্ষকদের বয়কট করা দরকার। প্রথম বয়কট হবে ঘর থেকে। যে ঘরের ছেলে এটি করবে তাকে বাবা-মা খেতে দেবে না, তার সঙ্গে কথা বলবে না, আলটিমেটাম দেবে। তার পর সামাজিকভাবে বয়কট করা দরকার। যে পরিবারের কেউ ধর্ষক হবে, সে পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। তাদের সঙ্গে বিয়েশাদি, সামাজিক আচার-আচরণ বাদ দিতে হবে। বন্ধুরা তাদের সঙ্গে মিশবে না, আত্মীয়স্বজন পরিচয় দেবে না, এমনকি সবাই যদি তাদের সঙ্গে কথা না বলে, দোকানদাররা যদি তাদের কাছে জিনিসপত্র বিক্রি না করে, সেটা হবে বিরাট শাস্তি। মানুষের ঘৃণার চেয়ে বড় শাস্তি আর নেই।

ধর্ষকের পক্ষে যেন কোনো উকিল না দাঁড়ায়, সেটা দেখা দরকার। প্রশ্ন উঠতে পারে, তা হলে কি অপরাধী আইনের সহায়তা পাবে না! এমন কিছু অপরাধ আছে, যা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, অপরাধীরা প্রকাশ্য। সেখানে তো আইনের সহযোগিতা না পাওয়াই উচিত।

প্রয়োজন যুগপৎ সচেতনতা, জাগরণ, প্রতিরোধ ও শাস্তি। চেষ্টা করতে হবে যেন আমাদের সন্তানরা ধর্ষক না হয়ে ওঠে, আর চেষ্টার পরও যদি তারা ধর্ষক হয়, তা হলে আইনের শাস্তি কার্যকর করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

ড. আফরোজা পারভীন : কথাশিল্পী, গবেষক ও কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement