advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘নিউ নরমাল’ জীবনে প্রযুক্তি পণ্যের বিক্রি বেড়ে দ্বিগুণ

রেজাউল রেজা
১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২০ ০০:০৬
advertisement

করোনাকালের ‘নিউ নরমাল’ বা ‘নতুন স্বাভাবিক’ জীবনযাত্রায় প্রয়োজনের তাগিদে বেড়েছে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার। অনলাইন ক্লাস থেকে শুরু করে বাসায় বসে অফিসের কাজ সারতে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন যেন ‘জীবনসঙ্গী’। গত ছয় মাসে তাই প্রযুক্তিপণ্যের বেচাকেনা বেড়েছে দুই থেকে তিনগুণ। তবে পণ্য সংকটের কারণে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

রাজধানীর প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনায় বেশিরভাগ মানুষ বাসাবাড়ি থেকে অফিস করছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসও চালু রয়েছে। তাই বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদার সঙ্গে বেচাকেনাও বেড়েছে কয়েকগুণ। ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, মনিটর, মাদারবোর্ড, গ্রাফিক্স কার্ড, ওয়েবক্যামেরা, হেডফোন, রাউটার, মডেমের বিক্রিটাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু করোনার প্রভাবে আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে পণ্য সংকট।

সায়েন্সল্যাবের মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার সিটি সেন্টারের ‘ইলেক্ট্রো সফট’ প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার আরমান হোসাইন বলেন, ‘বর্তমান নিউ নরমাল লাইফস্টাইলে যেসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তার বেশিরভাগই তথ্য প্রযুক্তিনির্ভর। তাই বাজারে প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। জনু-জুলাই মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি ডেস্কটপ কম্পিউটার বিক্রি করেছি। তার থেকেও বেশি বিক্রি হয়েছে ল্যাপটপ। এখনো প্রচুর চাহিদা এসব পণ্যের। তবে বাজারে ল্যাপটপের সংকট তীব্র হচ্ছে। আসুসসহ বেশ কিছু ব্র্যান্ডের কিছু মডেলের ল্যাপটপ নেই বললেই চলে, স্টক শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে এখনো আসেনি। তাই ব্র্যান্ডভেদে ল্যাপটপের দাম চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’

একইভাবে হার্ডওয়ারের সংকটে ক্রেতাদের পছন্দ অনুযায়ী ডেস্কটপ কম্পিউটারও সরবরাহ করতে পারছেন না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। আগের চেয়ে বেশি খরচ পড়ছে। পছন্দের একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার সেট তৈরি করতে এখন বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার মনিটর, মাদারবোর্ড, গ্রাফিক্স কার্ডের সংকট থাকায় এগুলোর দাম বেড়ে গেছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ।

বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি শাহিদ-উল-মুনীর আমাদের সময়কে বলেন, ‘বাংলাদেশে বছরে ১৫ থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার প্রযুক্তিপণ্যের বাজার রয়েছে। করোনায় অন্যান্য ব্যবসা বড় ক্ষতির মুখে পড়লেও প্রযুক্তিবাজারে এ ক্ষতির পরিমাণ কম। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজার আগের চেয়ে চাঙা হয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে লম্বা সময় ধরে আমদানি ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদকরা পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না। এতে দেশের বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ল্যাপটপের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে বর্তমানে। অপরদিকে আমদানি কমেছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। এখন কোনো ব্যবসায়ী ১০ হাজার ল্যাপটপ অর্ডার করলে মাত্র দুই থেকে আড়াই হাজার পাচ্ছেন। অন্যদিকে হার্ডওয়ারের আমদানিও অনেক হারে কমেছে, ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। তবে আগামীতে আমদানি বাড়বে বলে আশা করছি আমরা।’

বাংলাদেশে ল্যাপটপসহ যেসব প্রযুক্তিপণ্য আমদানি করা হয়, তার অধিকাংশের উৎপাদন ও অ্যাসেমব্লিং হয় চীনে। দেশটিতে জানুয়ারি থেকে উৎপাদন বন্ধ ছিল, যা এখনো স্বাভাবিক হয়নি। তাই বিশ্বব্যাপী চাহিদার জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে কোম্পানিগুলো। অপরদিকে পণ্যের আমদানি খরচও ১০ শতাংশের মতো বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দামের ওপরেও। ওয়েবক্যামেরা, হেডফোন, রাউটার, মডেম, মাউস, কিবোর্ড ও পেনড্রাইভের মতো অন্যান্য পণ্যের বিক্রিও কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানান মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার সিটি সেন্টারের ‘মারভেলাস কম্পিউটার’ প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী মো. নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘অনলাইন কলে কথা বলতে যেসব ডিভাইসগুলো ব্যবহার হয় সবগুলোর বিক্রি বেড়েছে। অপরদিকে বেশকিছু পণ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে। তাই দামও কিছুটা বাড়তি। যেমনÑ ব্র্যান্ডভেদে ডেস্কটপ হেডফোনের দাম ৪শ থেকে ৫শ টাকা, ওয়েবক্যামেরা ৬শ থেকে ৭শ টাকা পর্যন্ত, মনিটর এক থেকে দেড় হাজার টাকা, রাউটার ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।’

কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপের মতো স্মার্টফোনের বাজারেও বিক্রি বেড়েছে। বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের স্যামসাংয়ের আউটলেট এক্স-টেলিকমের টেরিটরি ম্যানেজার মো. ফেরদৌস মাহমুদ বলেন, ‘গত পাঁচ মাসে স্মার্টফোনের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রতিদিন গড়ে ৩০টিরও বেশি স্মার্টফোন বিক্রি হচ্ছে। অনলাইন ক্লাস ও অফিস মিটিংয়ের জন্য আমাদের ট্যাবলেটের বিক্রি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, চার থেকে পাঁচগুণ।’

বিক্রি বাড়লেও বাজারে আমদানিকৃত ফোনের সংকট বলে জানান বসুন্ধরা মার্কেটের এমআই ইলেক্ট্রা স্টোরের ম্যানেজার মো. আলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘মার্কেট খোলার পর মিড-বাজেটের স্মার্টফোনগুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি ফোন বিক্রি হয় আমাদের। অনেকগুলো মডেলের ফোন ইতোমধ্যে ফুরিয়েও গেছে। ফলে অনেক ক্রেতাকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।’

একই কথা জানালেন বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদ জাকারিয়া, ‘দেশে প্রতিমাসে ২৫ থেকে ৩০ লাখ মোবাইল ফোন বিক্রি হয়। এর ৩০ শতাংশই স্মার্টফোন। গত ছয় মাসে এই হার আরও বেড়েছে। তবে জুন থেকে আমদানিকৃত ফোনের পরিমাণ অনেক কম। বেশ কিছু কোম্পানির স্মার্টফোনের আমদানি একেবারেই বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি ফোন তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশের আমদানিও অনেকখানি কমে গেছে। এর প্রভাব দেশে ফোনের উৎপাদনশীলতার ওপরেও পড়েছে।’

এদিকে বাজারে পণ্যের সংকট থাকলেও বিক্রি বাড়ায় ব্যবসায়ীরা বেশ খুশি। তারা বলছেন, সংকটের কারণে পছন্দের পণ্য না পেয়ে হাতের কাছে ব্র্যান্ড, নন ব্র্যান্ড যা পাচ্ছেন তাই কিনছেন ক্রেতারা। এতে বিক্রি অনেক বেড়েছে। মাল্টিপ্ল্যান কম্পিউটার সিটি সেন্টারের ‘পিসি হাউজ’ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার মো. শাখাওয়াত হোসেন ফয়সাল বলেন, ‘আগে ক্রেতাদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ। এখন সব শ্রেণির ক্রেতাই মার্কেটে আসছেন। মোটামুটি সব ধরনের পণ্যই কিনছেন তারা। দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি। করোনাকাালে আমাদের অনলাইনের বিক্রি দুই-তিনগুণ বেড়েছে। ব্র্যান্ডের পণ্য শেষ হয়ে যাওয়ায় নন-ব্র্যান্ডের পণ্যও বিক্রি হচ্ছে বেশ। ব্যবসায় ব্যস্ত সময় পার করে আমরা অনেক খুশি।’

advertisement
Evaly
advertisement