advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দুর্গাপূজা : মহামারীর মধ্যেই মাতৃ-আরাধনা

স্বপন কুমার সাহা
২২ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০২০ ২৩:৪২
advertisement

শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালি জীবনে উৎসবের বার্তা নিয়ে আসে। প্রকৃতি ও জনজীবনে দুর্গতিনাশিনীর আগমনী বার্তা ঘোষিত হয় আগেই। প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসবের। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম। করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত সারাবিশ্ব। বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। বিশ্বে এরই মধ্যে মৃতের সংখ্যা সোয়া দশ লাখ পেরিয়ে গেছে। আক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন কোটি। বাংলাদেশে মৃত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। আক্রান্ত প্রায় পৌনে চার লাখ। অর্থনীতির গতি হয়ে পড়েছে মন্থর। জীবন-জীবিকার ওপর বিস্তৃত হয়েছে করোনার থাবা। এরই মধ্যে দুর্গতিনাশিনী মা আসছেন। এবার মা আসছেন দোলায়, শাস্ত্রীয় নিয়মে মড়ক অবশ্যম্ভাবী। তার আলামত আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি। করোনাসৃষ্ট ভয়াবহ মহামারীর মধ্যেই মা আসছেন। তবে সুসংবাদও আছে, মা পুজোর পরে যাবেন গজে, ফল শস্যপূর্ণ বসুন্ধরা। অন্ধকারের পরে সূর্যোদয়, দুর্যোগের পরে আলোর বন্যা। এ তো প্রাকৃতিক নিয়ম। তার ব্যত্যয় হতে পারে না। নইলে সৃষ্টি থাকে না। এবারের দুর্গাপূজা তাই সমৃদ্ধির আগমনী বার্তাও ঘোষণা করছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা মানবজাতির জন্যই সমৃদ্ধি ও কল্যাণের বার্তা। দুর্গতি থেকে মানুষকে মুক্তি দিতেই দুর্গতিনাশিনীর মর্ত্যে আগমন। মায়ের আশীর্বাদে করোনাসৃষ্ট বিপর্যয় অবশ্যই পরাজিত হবে, কেটে যাবে দুঃসময়।

মহামারীর মধ্যেই মাতৃ-আরাধনা। স্বাভাবিকভাবে পুজোয় মহামারীর প্রভাব পড়েছে। পাঁচ দিনের পুজো। এবারের ধারা ব্যতিক্রম। মহালয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর দুর্গাপূজা হচ্ছে। মল মাস পড়ার কারণেই এই ব্যতিক্রম। মহালয়ায় দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এবার বিরাজিত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তানরা মায়ের পূজার্চনা করবেন, অঞ্জলি দেবেন। প্রার্থনা জানাবেন শান্তি-সমৃদ্ধির, মহামারী থেকে মানবজাতির মুক্তির, অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের মানুষের জন্যই এই প্রার্থনা। বিপর্যয়ের পর নতুন জীবনের প্রার্থনা।

করোনার কারণে উৎসব, আনন্দ আয়োজন সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে বলা বাহুল্য। পূজা হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে, স্বাভাবিকভাবে ভক্তসমাগম কম হতে পারে। পূজর দুটি দিক- একটি সামাজিক, অন্যটি ধর্মীয়। মায়ের পূজায় ভক্তরা অংশ নেবে, অঞ্জলি দেবে, হৃদয়ের আকুতি ব্যক্ত করবে মায়ের কাছে। মায়ের আরতি হবে। পরিবারের সবাই শরিক হবে পূজায়। মায়ের পূজায় হৃদয়ের দিকটি বড়। পাঁচ দিনব্যাপী পূজায় নানা আনুষ্ঠানিকতা, প্রত্যেকটি অনুষ্ঠান গভীর অর্থবহ। ধর্ম ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সবার অংশগ্রহণে পূজা হয় সর্বজনীন।

এখানে সামাজিক দিকটি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কারণ শারদীয় দুর্গাপূজা কার্যত একটি সামাজিক সম্মিলনী। বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের বারো মাসে তেরো পার্বণ, প্রত্যেকটি পার্বণের সঙ্গে প্রকৃতি ও জীবন সম্পর্কিত, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ লক্ষণীয়। আরও লক্ষণীয়, ঋতুর সঙ্গে সম্পর্ক। দুর্গাপূজা শরৎকালে, যখন বর্ষাধৌত প্রকৃতি নতুন রূপ ধারণ করে। মাঠের ফসল ঘরে ওঠার অপেক্ষার ক্ষণগণনা শুরু হয়। বাঙালি রূপকল্পনায় এ সময় দেবী মর্ত্যে আসেন পরিবারের সব সদস্যকে নিয়ে, এই আগমনকে কন্যার বাপের বাড়ি আসার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দশমীর দিন যেভাবে মা বিদায় নেন, তাতে পিত্রালয় থেকে কন্যার বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়ার চিত্রটিই ফুটে ওঠে। বাঙালি মানসিকতায় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিই প্রধান। দুর্গম নামে অসুর বধ করে দুর্গা, মানবজাতিকে দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করে দুর্গতিনাশিনী, কিন্তু তিনি পরিবারে একাধারে মা, কন্যা, স্ত্রী। আর পরিবারটিও একটি রাষ্ট্রকাঠামোরও প্রতীক। এক কন্যা শিক্ষা বা বিদ্যার দেবী সরস্বতী, আরেক কন্যা লক্ষ্মী, ধনের দেবী। এক পুত্র দেব সেনাপতি কার্তিক, আরেক পুত্র গণেশ-গণদেবতা। স্বামী শিবঠাকুর আছেন, তবে অনেকটা আড়ালে। মায়ের দশ হাতে দশ প্রকরণ বা অস্ত্র। প্রত্যেকটি অস্ত্রের ব্যাখ্যা আছে। সঙ্গে পশুরাজ, বিষধর সাপ। পশুশক্তির মোকাবিলায় দেবী দুর্গা সবাইকে সম্পৃক্ত করেছেন। এই ভাব মর্ত্যরে মানুষের জন্য একটি বার্তা বহন করে, পশুশক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে এক হয়ে লড়াই করতে হয়। অস্পৃশ্যতা এক অভিশাপ। কোনো ধর্ম এই অস্পৃশ্যতা সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু দুর্গাপূজা সব পেশার, স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া হয় না। আসলে কোনো পূজাতেই অস্পৃশ্যতার স্থান নেই, এটা মনুষ্যসৃষ্ট। স্বার্থ প্রণোদিত। পূজা সব সময় সর্বজনীন। দুর্গাপূজা এই সত্যটাকে আরও ভালো করে প্রকটিত করে। তাই দুর্গাপূজাকে মানুষের মেলবন্ধনের ভিত্তি বলা যায়।

করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই সামাজিক মেলবন্ধনের, সহজ কথায় পূজার সামাজিক দিকটি। সেটাই পূজার উৎসব। শারদীয় দুর্গাপূজা মূলত বাঙালির উৎসব। প্রত্যেক পরিবারে এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই সবার সম্মিলন ঘটে। মা আসছেন, তাই পরিবারের সব সদস্য একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করেন। আগে দেখা যেত শারদীয় দুর্গাপূজায় বাঙালি ঘরে ফিরত, সারা বছরের মধ্যে বিদেশে কর্মরতদের এটা পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার একটা বড় উপলক্ষ। তৎকালীন সামাজিক অবস্থার বিবরণ থেকে জানা যায়, তখন পারিবারিক পূজা ছিল বেশি। সর্বজনীন বা বারোয়ারি পূজা ছিল কম। তবুও পূজায় বাড়ি ফিরতেন সবাই। লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত অবস্থান করতেন, এর পরই কর্মস্থলে ফেরার পালা। তাই পূজাই ছিল কার্যত পারিবারিক উৎসব। বর্তমানে পূজা বেড়েছে। বলা যায়, বাড়ির কাছেই পূজা। বেড়েছে সম্পৃক্ততা। সারাদেশে ৩২ হাজারেরও বেশি পূজা হয়েছে গত বছর। অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে পূজা বাড়ছে। স্বাভাবিক অবস্থা থাকলে এ বছর পূজা আরও বাড়ত। কিন্তু এবার করোনার কারণে বাড়বে তো নাই-ই, বরং কিছু কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অবশ্যই এ অবস্থা সাময়িক, করোনাকাল কেটে যাবে, আবার উৎসব ফিরবে উৎসবের আঙ্গিকে। তবে সামাজিক সম্মিলনে যে ব্যাঘাত ঘটবে আমরা সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুস্থ ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে কাটিয়ে উঠতে পারি কিছুটা। অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে পূজার সৌন্দর্য ব্যাহত হওয়ার মতো কিংবা ধর্মীয় চেতনা ক্ষুণœ হতে পারে এমন কিছু যেন না হয়।

পূজার ধর্ম ও সামাজিক বন্ধন ছাড়াও আরেকটি দিক রয়েছে। পূজা মানসিক দৃঢ়তা ও একাগ্রতা বাড়ায়। মায়ের কাছে ভক্তপ্রাণ জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শক্তি ও জয় প্রার্থনা করে। বলতে দ্বিধা নেই, করোনাকালে পূজা এই দৃঢ়তাকে আরও শক্ত ভিত্তি দেবে। লড়াই করার মানসিক শক্তি বাড়াবে। আমরা মায়ের কাছে শুধু নিজের জন্য প্রার্থনা করি না, সারাবিশ্বের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্যও প্রার্থনা করি। এবারের প্রার্থনা হোক করোনামুক্ত পৃথিবীর নতুন জীবনে অভিষেক। করোনাও এক ভয়াবহ অসুর, এ অসুরও পরাস্ত হবে। মানুষ তো হারতে পারে না। এখানে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয়, ঢাকেশ্বরী অঙ্গনে আমরাই প্রথম জন্মাষ্টমীর গীতাযজ্ঞে গোটা মানবজাতির কল্যাণে আহুতি দিই, প্রার্থনা করি। সব ধর্ম মিলেই মানবধর্ম, মানুষের কল্যাণেই বিশ্বের কল্যাণ। শারদীয় দুর্গাপূজায়ও এই ভাব বিস্তৃত হয়েছে। বিস্তৃত হয়েছে সারাদেশে পূজা কমিটিগুলোর মধ্যে।

এবারে মাতৃ-আরাধনায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে আর এক বেদনার মুখোমুখি আমরা। আমাদের পথনির্দেশক বীর মুক্তিযোদ্ধা, অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) সি আর দত্ত বীরউত্তম আর আমাদের মধ্যে নেই। শেষ কিছুদিন তিনি আমেরিকায় প্রবাস জীবনে ছিলেন। সেখানেই গত ২৪ আগস্ট (বাংলাদেশের হিসাবে ২৫ আগস্ট) অনন্তধামে যাত্রা করেন। তিনি চোখের আড়ালে গেলেও আমাদের হৃদয়ে তিনি আলোকবর্তিকা। মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যে আলোকবর্তিকা তিনি প্রোজ্জ্বলিত করেছিলেন, নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের মনে লড়াইয়ের যে সাহস ও শক্তি এনে দিয়েছিলেন তা আজও অটুট আছে। মানুষের শারীরিক মৃত্যু হয়, কিন্তু আদর্শের মৃত্যু হয় না। আদর্শ শাশ্বত। জেনারেল দত্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে পূজার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিপীড়ক, বিভেদকামী শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রদীপ জ্বালিয়ে লড়াই করার বীজ বপন করেছিলেন, সে বীজ আজ মহীরুহ।

আজ ঢাকেশ্বরী মন্দির জাতীয় মন্দিরে পরিণত। সারাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে পূজার মাধ্যমে ঐক্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি। এই তাগিদ যিনি সৃষ্টি করেছিলেন তিনি আমাদের নেতা, শিক্ষক জেনারেল দত্ত। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মাঝে পূজা বা ধর্মচর্চার মধ্য দিয়ে অধিকার বোধের চেতনাকে জাগ্রত করার ধারা নজিরবিহীন। আমাদের নেতারা এই ধারা তৈরি করেছেন। বিশ্বের ইতিহাসে দেখা যায়, সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তার কারণে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের অধিবাসী হয়ে থাকতে চান, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় ব্যাপৃত থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ একমাত্র ব্যতিক্রম। এখানে সংখ্যালঘুরা মূল গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করেন। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকারের লড়াই, গণঅভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধ- সংখ্যালঘুরা এক স্রােতধারায় মিলিত হয়েছে, রক্ত মিশেছে সবার রক্তের সঙ্গে। সর্বজনীনতার ধারাটি এভাবে তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আমরা পূজার মাধ্যমে তা বিস্তৃত করার চেষ্টা করছি। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ কিংবা ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই চেতনার মূল সুর ঢাকেশ্বরী অঙ্গন থেকেই উৎসারিত হয়েছিল, যা গোটা জাতি আজ গ্রহণ করেছে।

তাই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধকেও আমরা সর্বজনীন চেতনায় দেখতে চাই। দুর্গতিনাশিনীর কাছে আমরা সবার প্রার্থনাই নিবেদন করি।

স্বপন কুমার সাহা : সিনিয়র সাংবাদিক

advertisement
Evaly
advertisement