advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

রাবি উপাচার্যের ‘নৈতিক স্খলন’ প্রমাণিত, যা আছে ইউজিসির সুপারিশে

জাকির হোসেন তমাল
২২ অক্টোবর ২০২০ ১৭:১৬ | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০২০ ০০:১৩
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান। ছবি : সংগৃহীত
advertisement

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য এম আবদুস সোবহান, ‍উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এম এ বারীর বিরুদ্ধে ওঠা ২৫টি অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠিত তদন্ত কমিটি। দুর্নীতির মাধ্যমে তাদের ‘নৈতিকতার চরম স্খলন’ হয়েছে বলে মনে করছে ইউজিসি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ১১ দফার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটির সদস্যরা। পরে তদন্ত কমিটির সেই প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়।

এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে দৈনিক আমাদের সময় অনলাইন-এ চার পর্বের ধারাবাহিক অনসন্ধানি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নানা অনিয়মের বিষয় উঠে আসে।  

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে সার্বিক মন্তব্যে উল্লেখ করা হয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬২ জন শিক্ষক ও দুজন চাকরি প্রার্থী উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। উপাচার্য এম আবদুস সোবহান তদন্ত কমিটিকে দেওয়া বক্তব্যে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করতে পারেননি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান ও উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়ার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং উপাচার্য কর্তৃক মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট অসত্য তথ্য প্রদান, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে নিজ মেয়ে ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, বিধি মোতাবেক বিভাগীয় সভাপতি নিয়োগ না দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে উত্থাপিত ২৫টি অভিযোগের প্রত্যেকটি অভিযোগই ‘নৈতিকতার মারাত্মক স্খলন’ হিসেবে সন্দেহাতিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিকরণে একদিকে যেমন উপাচার্য পদটির ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, অপরদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধির পরিবর্তে নিম্নগামী করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও বিশ্ববিদ্যালয়টি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় বটে। দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগঠতি এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিধায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কমিটি বেশকিছু সুপারিশ প্রদান করছে।

কমিটির ১১ দফা সুপারিশ নিচে তুলে ধরা হলো :

১. উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি এবং  রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য প্রদান, শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে নিজ মেয়ে ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে কমিটি মনে করে। কারণ এ বিষয়ে উপাচার্যের মতামত জানার জন্য দুবার পত্র দেওয়া হলেও তিনি শুধু বলেছেন যে, অভিযোগগুলো মিথ্যা। কিন্তু তার দাবির স্বপক্ষে কোনো যৌক্তিক দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। তাছাড়া গত ১৯/০৯/২০২০ তারিখে কমিটির সামনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য উপাচার্য উপস্থিত হননি। এমনকি কমিটিকে লিখিতভাবে অবগত করেননি। এটি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির নিকট কাম্য নয়।

২. অধ্যাপক আবদুল হান্নানের সাথে নিয়োগ প্রার্থীর আর্থিক লেনদেন, উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়ার সাথে নিয়োগ প্রার্থীর স্ত্রীর ফোনালাপ ও সহকারী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুর রহমানের সাথে নিয়োগ প্রার্থী নুরুল হুদার লেনদেনের ইঙ্গিত সংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনান্তে উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও তার নিকটতম আত্মীয় সহকারী প্রক্টর গাজী তৌহিদুর রহমান, অধ্যাপক আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটির সত্যতা রয়েছে বলে কমিটির নিকট প্রতীয়মান হয়। তাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা প্রয়োজন।

৩. পর্যালোচনা থেকে পরিষ্কারভাবে দেখা যায় যে, শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগের নীতিমালা অসৎ উদ্দেশ্যে শিথিল করার ফলে অনেক অযোগ্য প্রার্থীর আবেদন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়য়েছে। বিভিন্ন সিলেকশন বোর্ডে অনেক যোগ্য প্রার্থী সাক্ষাৎকার দেওয়া সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীরা নিয়োগ পেয়েছেন। ‘বাচনভঙ্গি ও পাঠদানের যোগ্যতা’ না থাকায় যোগ্য প্রার্থীরা নিয়োগ পাননি, এ ধরনের যুক্তি কতখানি গ্রহণযোগ্য তা ভেবে দেখা উচিৎ। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং চাকরি প্রার্থীদের প্রতি ন্যায়বিচার বিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ যারা এ নিয়োগ বোর্ডে ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যত অনিয়ম সংগঠিত হয়েছে তার সিংহভাগই শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনের কারণেই হয়েছে। তাই ১৯৭৩ এর অ্যাক্ট পরিচালিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালাগুলো অনুসরণ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সংক্রান্ত নীতিমালা জরুরি ভিত্তিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।

৫. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী যে সকল প্রার্থীগণ আবেদনের অযোগ্য ছিল এবং যে সকল বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ৩৪ জন অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে এবং ব্যক্তি স্বার্থ ও ইচ্ছা চরিত্রার্থ করার লক্ষ্যে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালায় বয়স শিথিল করে যে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেওয়া যেতে পারে।

৬. আর্থিক অভিযোগের বিষয়ে সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান/গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অভিযোগে উল্লেখিত (উপাচার্য এম আবদুস সোবহান, উপ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এম এ বারী, অধ্যাপক এম মুজিবুর রহমান, অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল হান্নান, সহকারী অধ্যাপক গাজী তৌহিদুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক শিবলী ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন টুটুল) ব্যক্তিদের এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের আয়ের উৎস, সম্পদ, ব্যাংকের হিসাব বিবরণী ও আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

৭. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর সেকশন ২৯ ‘দ্য ফার্স্ট স্ট্যাটুট অফ দ্য ইউনিভার্সিটি’র ৩ এর ১ ধারা লংঘন করে যে সকল বিভাগে সভাপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা বাতিল করে বিধি মোতাবেক বিভাগীয় সভাপতি নিয়োগ প্রদান করা যেতে পারে।

৮. রাষ্ট্রপতি ও আচার্যের অনুমতি না নিয়ে উপাচার্য এম আবদুস সোবহান পদত্যাগ করে নিজ বিভাগে যোগদান করেন, বিভাগ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন, উপাচার্য পদে পুনরায় যোগদান করেন, নিজের সভাপতিত্বে তা সিন্ডিকেটে অনুমোদন করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উল্লিখিত বিষয়ে আদেশ জারি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড করেন, নিজের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির আর্থিক অনুমোদন করেন এবং রাষ্ট্রপতিকে অসত্য তথ্য দিয়ে আবেদন করেন। উল্লিখিত বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে বিচারাধীন থাকায় এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি কোনো মন্তব্য করছে না।

৯. অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান উপাচার্য হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে ৭ মে ২০১৭ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে উপাচার্যের বাসভবনে ওঠার পর থেকে তার নামে ২০১৩ সাল থেকে অধ্যাপত হিসেবে বরাদ্দকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডুপ্লেক্স বাড়িটি (বাড়ি নম্বর প-২৮) কাগজে-কলমে ২৬ জুন ২০১৭ তারিখ থেকে ছেড়ে দিয়েছেন বলে দেখান। তবে প্রকৃতপক্ষে ১ বছর ৬ মাসের অধিক সময় ধরে মেরামতের নাম করে তার ব্যক্তিগত আসবাবপত্র রাখায় ওই বাড়িটি বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তিভুক্ত করা থেকে বিরত রাখা হয়। এ কারণে প্রতি মাসে ৩১ হাজার ২০০ টাকা হারে ১৮ মাসে সর্বমোট ৫ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়।  এ বিষয়ে দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের কাছ থেকে ওই অর্থ আদায়ের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে।

১০. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এম এ বারী তদন্ত কমিটিকে বিভিন্ন পর্যায়ে অসহযোগিতা করেছেন। তাই তাকে অবিলম্বে এই পদ থেকে সরিয়ে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা যেতে পারে।

১১. যোগ্য ও মোধাবী প্রার্থীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় এনে একটি গ্রহণযোগ্য নিয়োগ পদ্ধতি নির্ধারণ করে তা সঠিকভাবে অনুসরণ করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা স্বাক্ষর করে ৩০০ পৃষ্ঠার ১৭টি অভিযোগ সংবলিত একটি নথিপত্র প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, দুদক ও ইউজিসি বরাবর পাঠান। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একটি গঠিত তদন্ত কমিটি করে ইউজিসি। ওই কমিটির প্রধান ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম। বিস্তর তদন্ত করে ওই কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনর ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলো পড়তে ক্লিক করুন :

পর্ব-১ : কাছের মানুষদের শিক্ষক বানাতে উপাচার্যের যত আয়োজন

পর্ব-২ : উপাচার্যের ক্ষমতাই যেখানে সব

পর্ব-৩ : বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেটাই প্রার্থীর ‘বড় যোগ্যতা’

পর্ব-৪ : আচার্যকে ‘ধোঁকা দিয়ে’ অবসর গ্রহণ, তবুও পদে উপাচার্য

advertisement
Evaly
advertisement