advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জহুরপুরে দুর্গোৎসব
তরুণরা ভাঙলেন ২০০ বছরের কুসংস্কার

উত্তম ঘোষ যশোর
২৫ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২০ ০০:২৬
advertisement

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু এ উৎসবের গতকাল তৃতীয় দিন দুর্গা দেবীকে অঞ্জলির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে অষ্টমী পূজা। আজ মহানবমী। পূজার আয়োজন চলছে দেশের প্রতিটি শহর, বাজার, গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায়। আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর গ্রামেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আয়োজন করা হয়েছিল দুর্গাপূজার। ঠিক সেই সময়ে গ্রামে বড় ধরনের মহামারী আসে। আর তখন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় সেখানকার পূজা। কুসংস্কারের সেই বেড়াজাল ভেঙে ২০০ বছর পর এ বছর জহুরপুরে দুর্গোৎসব হচ্ছে। গ্রামের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ যুবক এর আয়োজন করেছেন।

ষষ্ঠীর দিন গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বাঘারপাড়া-কালীগঞ্জ মহাসড়কের জহুরপুর বাজারের প্রবেশমুখে গ্রামের রাস্তার শুরুতেই বিশাল তোরণ। সামনে প্রায় ৩০০ ফুট পর্যন্ত রাস্তা মরিচ বাতিতে সাজানো। এর পরেই জহুরপুর সার্বজনীন মন্দির প্রাঙ্গণে সুসজ্জিত দুর্গাপূজার মণ্ডপ। সিসি ক্যামেরায় নিয়ন্ত্রিত এ মণ্ডপে স্বাস্থ্যবিধি মানতে প্রবেশমুখে রাখা হয়েছে সাবান-জল। নারী-পুরুষের জন্য যাতায়াতে আলাদা ব্যবস্থা। সামাজিক দূরত্ব ঠিক রাখতে মণ্ডপের ভেতরে তিন ফুট পর পর সাদা রঙের বৃত্ত। এর মধ্যেই দাঁড়াচ্ছেন প্রতি ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই তারা মণ্ডপের ভেতরে থাকতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সবার মুখে মাস্ক পরা। সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য রয়েছে পুলিশ, গ্রামপুলিশ, আনসার সদস্যসহ নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক।

দুর্গাপূজা বন্ধের সেই ইতিহাস জানতে কথা হয় গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে। অশীতিপর বৃদ্ধ হাজারি বিশ্বাস, মন্দিরের পূজারিণী কল্পনা বিশ্বাস ও পঁচাত্তর বছরের অনাথ সরকার জানান, তারা কখনো গ্রামে দুর্গাপূজা দেখেননি। কিন্তু বংশ পরম্পরায় শুনেছেন প্রায় ২০০ বছর আগে গ্রামে পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। ঠিক ওই সময়ই গ্রামজুড়ে কলেরা (ডায়রিয়া) মহামারী আকারে দেখা দেয়। এতে অনেক লোক মারা যান। সে বছর থেকেই এখানকার দুর্গাপূজার আয়োজন বন্ধ রাখা হয়। তারা আরও জানান, পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল- মা দুর্গা কোনো কারণে অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। যে কারণে ওই মহামারী আসে। সেই বিশ্বাসে তারা এর পর থেকে কখনো পূজার আয়োজন করেননি।

জহুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওই গ্রামেরই সন্তান তাপস কুমার ও পল্লী চিকিৎসক উত্তম বিশ্বাস জানান, আজ থেকে ৩০ বছর আগে একবার দুর্গাপূজা উদযাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সে বছর বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তা প- হয়ে যায়। দুর্গোৎসব আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন বিশ্বাস জানান, সম্প্রতি যশোর সরকারি এমএম কলেজ থেকে গণিতে মাস্টার্স শেষ করেছি। করোনার কারণে এ বছর দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় লম্বা ছুটি। তাই পূজার আগে গ্রামে এসে সমবয়সী ও ছোটদের নিয়ে এবার দুর্গাপূজার আয়োজন করেছি।

কমিটির সভাপতি সরকারি চাকরিজীবী সীমান্ত সরকার বিশ্বাস জানান, প্রায় ২০০ বছর ধরে গ্রামের লোকজন কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল। মা দুর্গার আগমন কখনো অশুভ হয় না। তার প্রমাণ এ বছর গ্রামে আয়োজিত দুর্গোৎসব। এবার মায়ের আগমনে সব অন্ধকার ও দুঃখ-কষ্ট ঘুচে যাবে। করোনারূপী অসুর বিনাশ হবে।

জানতে চাইলে জহুরপুর ইউপি চেয়ারম্যান দীন মোহাম্মদ দীলু পাটোয়ারী বলেন, ‘ইউনিয়নে ছয়টি স্থানে দুর্গাপূজা হচ্ছে। এর মধ্যে জহুরপুর সার্বজনীন মন্দির প্রাঙ্গণের পূজা অন্যতম। কয়েক যুগের ধর্মীয় এক কুসংস্কারকে ভেঙে এবার সেখানে দুর্গাপূজা হওয়ায় তা সবার কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। আয়োজক কমিটিকে সাধ্যমতো আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি ও সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছি।’ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে জহুরপুর ইউনিয়নের দুর্গোৎসব শেষ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া আফরোজ বলেন, ‘বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর দুর্গোৎসব একটু ভিন্নভাবে উদযাপন হচ্ছে। শান্তিপূর্ণভাবে এ উৎসব শেষ করতে ইতোমধ্যে তিনস্তরের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। আশা করছি সরকারি নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সুষ্ঠুভাবে পূজা অনুষ্ঠিত হবে।’

advertisement
Evaly
advertisement