advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কাজ না করেই উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট

রাঙামাটি জেলা পরিষদের ২৩ প্রকল্প

জিয়াউর রহমান জুয়েল রাঙামাটি
২৫ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২০ ০৯:০৫
ভুষণছড়া থেকে এরাবুনিয়া সরকারপাড়ায় ভেঙে পড়া এই সেতুটি সংস্কার দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে টাকা। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

কাজের বাস্তবায়ন হয়নি; কিন্তু তুলে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থ। পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিবদমান অস্থিরতার সুযোগে তদারকিতে অনীহা আর উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তঃসমন্বয় না থাকায় সরকারি বরাদ্দের এ অর্থ নয়ছয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। আমাদের সময়ের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বরকল উপজেলায় রাঙামাটি জেলা পরিষদের ২৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ‘কাগজে-কলমে সম্পন্ন’ করেই ভুয়া বিলে অন্তত সোয়া ২ কোটি টাকা লোপাটের। জেলা পরিষদের প্রকৌশল শাখার যোগসাজশে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেখিয়েই এ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কোনো কাজ না করেই ‘শতভাগ কাজ’ সম্পাদনের প্রত্যয়ন দাখিল করে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও বরকল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সবীর কুমার চাকমার নেতৃত্বেই সরকারি অর্থ বেহাত হচ্ছে। অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সবীর কুমার চাকমা। তবে ‘তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে’ বলে জানিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ুয়া।

২০১৮-২০ অর্থবছরে ১৪টি প্রকল্পে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা লুটে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৬ থেকে ২০১৮ অর্থবছরেও নয়টি প্রকল্পে ৮১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একই সিন্ডিকেট। এসব প্রকল্পে রাস্তা সংস্কার, সেতু নির্মাণ, কমিউনিটি সেন্টার, মৎস্যবাঁধ, সেচ ড্রেন, গভীর নলকূপ স্থাপন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জামাদি ক্রয় এবং সেলাই ও পাম্প মেশিন সরবরাহ দেখানো হয়েছে।

সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তালিকায় থাকলেও বাস্তবে সিংহভাগ প্রকল্পের কোনো অস্তিত্বই নেই। নামমাত্র দু-একটি প্রকল্পের কাজ করে বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ২০১৮-২০ অর্থবছরে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দের ভুষণছড়া থেকে এরাবুনিয়া যাতায়াতের ইটের সড়কে সেতু নির্মাণকাজ না করেই অর্থ তুলে নেওয়া হয়। ১০ লাখ টাকা বরাদ্দে ভুষণছড়া বাজার থেকে ভা-ারিপাড়া পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, ৩ লাখ টাকায় গরইছড়ামুখ থেকে বগাছড়ি দজরপাড়া কাঁচা রাস্তা নির্মাণ ও ৫ লাখ টাকায় আমতলা মাদ্রাসায় অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ প্রকল্পের অস্তিত্ব মেলেনি।

৩০ লাখ টাকা বরাদ্দের কামিনী চাকমার জমির ওপর মৎস্যবাঁধ ও পাকা সেচ ড্রেন নির্মাণ, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সরঞ্জাম সরবরাহ নামে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১০ লাখ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৮ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে কাগজে-কলমে। আইমাছড়া মোনপাড়া গ্রামে সাড়ে ৩ লাখ টাকায় কৃষি ও মৎস্যবাঁধ নির্মাণ এবং দুটি ১৬ হর্স পাওয়ার পাম্প মেশিন সরবরাহ করা হয়নি। সুবলংয়ের চন্দ্র চাকমার জমিতে মৎস্যবাঁধ সংস্কার কাজে ১০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সেখানে জমি ও বাঁধের অস্তিত্ব নেই। সেখানে একটি পাহাড়ি ঘোনায় জলের ওপর নেট টানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বেকার যুবক-যুবতীদের মধ্যে সেলাই মেশিন সরবরাহ দেখানো হলেও কাকে এই সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে তা স্থানীয়রা বলতে পারেননি।

তবে কয়েকটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করলেও তা কোনো কাজেই আসেনি। ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দে ভুষণছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের ধারক দেয়াল নির্মাণকাজের বড়জোর ৩ লাখ টাকায় হ্রদের মাঝপানিতে একটি দেয়াল করা হলেও সেটি কোনো কাজে আসেনি। ভুষণছড়া মেইন রোড থেকে সরকারপাড়া পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণকাজে ৭ লাখ টাকার বরাদ্দে মাত্র ৩২ হাজার টাকার মাটির কাজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ৫ লাখ টাকায় সুবলং বরুণাছড়ি যমচুগ রাস্তা সংস্কার কাজে ২০ শতাংশ টাকাও খরচ করা হয়নি।

২০১৬-১৮ অর্থবছরে পূর্ব এরাবুনিয়া মৎস্যবাঁধ থেকে হারুণটিলা এলাকার আহাদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার (১-২ কিলোমিটার) প্রকল্প ১০ লাখ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাড়িটির মালিক আহাদ আমাদের সময়কে বলেন, তিনি প্রকল্পের নামও শোনেননি। প্রতিবেশী মোতালেব মেম্বার বলেন, একটি কোদালের কোপও পড়েনি ওই প্রকল্পের নামে। ২০১৭-১৮ অর্থবছর ৭ লাখ টাকা বরাদ্দে সুবলং বাজারে পানীয়-জলের ব্যবস্থাকরণসহ গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ১০ লাখ টাকায় সুবলং বাজার ক্যাম্প থেকে মাজারঘাট পর্যন্ত ইট বিছানোর কাজে ইট বিছানো হয়েছে বড়জোর ৮০-১০০ ফুট।

আবার সুবলং বাজারে একুশে ক্লাবের নির্মাণাধীন চারটি পিলার দেখিয়ে ‘সুবলং কমিউনিটি সেন্টার ও পাকা সিঁড়ি নির্মাণকাজ’ প্রকল্পের ৯ লাখ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। একুশে ক্লাবের সহসভাপতি দীপন বড়–য়া, সুবলং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও একুশে ক্লাবের নেতা মো. আবুল কালাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘সদস্যদের চাঁদায় চারটি পিলার তৈরি করেছি। ক্লাবকে কমিউনিটি সেন্টার দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা প্রতারণা ও অপরাধ। আমরা এর বিচার চাই।’

১৫ লাখ টাকা বরাদ্দে বড়হরিণা ইউনিয়নে কুকিছড়া বাজার থেকে শ্রীনগর বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ও ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দের আইমাছড়া ইউনিয়নে জগন্নাথছড়া থেকে ঠেগা খুব্বাং পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের কাজটিও অস্তিত্বহীন। জগন্নাথছড়া গ্রামের প্রধান জীবন মোহন কারবারি ও ভুবন বিজয় চাকমা বলেন, জেলা পরিষদের নেওয়া প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানেন না। গ্রামের লোকরাই স্বেচ্ছাশ্রমে মাটি কেটে তিন কিলোমিটার রাস্তা বানিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর গত বছর সেখানে ইট বিছিয়েছে।

এসব কাগুজে উন্নয়ন প্রকল্পে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখিয়ে সব টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সম্প্রতি বরকলের স্থানীয় বাসিন্দা দয়াল কুমার চাকমা ও রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে সবীর কুমার চাকমার বিরুদ্ধে রাঙামাটির সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দীপংকর তালুকদারসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। দুজনই সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে সরেজমিন তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বরকল আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক জাফর ইকবাল, আবদুর রাজ্জাক, উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অংচাসিং মারম ও মো. রাশেদ এবং বর্তমান সভাপতি বেলাল হোসেন, সাবেক মেম্বার আবদুল মজিদ, স্থানীয় মোটরবাইকচালক সমিতির সভাপতি মো. রাশেদসহ স্থানীয়রা বলেন, ‘তালিকা ধরে সরকার বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তদারকি না থাকায় কোনো কাজ না করেই শতভাগ কাজ সম্পাদনের প্রত্যয়ন দাখিল ও বিল উত্তোলন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন সবীর কুমার চাকমা। সরকার এ বরাদ্দের অর্থ ফেরত নিয়ে প্রতারকদের শাস্তির ব্যবস্থা করুক।’

অভিযোগের বিষয়ে সবীর কুমার চাকমা বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকির দায়িত্ব জেলা পরিষদের প্রকৌশল শাখার। কাজেই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা তারা জানবে। আর প্রকল্পের উপকারভোগীরা যদি কাজ শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়নপত্র দেয়, তাতে আমার কী করার আছে?

তবে ‘সব প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে’ বলে দাবি করেছেন এসব প্রকল্পে তদারকির দায়িত্বে থাকা রাঙামাটি জেলা পরিষদের উপসহকারী প্রকৌশলী রিগ্যান চাকমা। তিনি বলেন, নিজেই সব প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে তদারক করেছেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী বিরল বড়ূয়া বলেন, প্রকল্পের ফাইলপত্র না দেখে কিছুই বলতে পারব না। তবে এ ধরনের একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

advertisement
Evaly
advertisement