advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইউজিসির তদন্ত প্রতিবেদন : পর্ব-২
‘সরকারি কাজে’ কেন অসহযোগিতা করলেন রাবি  উপ-উপাচার্য?

জাকির হোসেন তমাল
২৮ অক্টোবর ২০২০ ১৭:১৫ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২০ ০৮:৫০
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা। ছবি : ফেসবকু থেকে নেওয়া
advertisement

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গঠিত তদন্ত কমিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে বিস্তর তদন্ত করে ২৫টি অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। সেই তদন্তের প্রতিবেদন এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও দুদকে জমা দিয়েছে ইউজিসি। প্রতিবেদনে ২৩টি পর্যালোচনা তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে কীভাবে অনিয়ম হয়েছে, তার চিত্র উঠে এসেছে সেই তদন্ত প্রতিবেদনে। ইউজিসির সেই প্রতিবেদন আমাদের সময়ের হাতে এসেছে। এসব নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনে আজ বুধবার থাকছে দ্বিতীয় পর্ব। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যুগোপযোগী’ একটি শিক্ষক নিয়োগ নীমিতালা ২০১৭ সালে পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মান নিম্নমুখী হওয়ার দরজা উন্মুক্ত হয়েছে। যে কমিটির সুপারিশে এই শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তন করা হয়, সেই কমিটির আহ্বায়ক বা প্রধান ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা। তার নেতৃত্বেই সাত সদস্যের একটি কমিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু থাকা ‘যুগোপযোগী’ শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালাটি ২০১৭ সালে পরিবর্তনের সুপারিশ করে।

ইউজিসির তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ‘যুগোপযোগী’ একটি নীতিমালা পরিবর্তন করে ‘নিম্নমানের’ শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন। এই নিম্নমানের নীতিমালা পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা আগের নীতিমালায় আবেদনের যোগ্য ছিলেন না। 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউজিসির তদন্ত কমিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের  রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে নথিপত্র (অভিযোগ সংশ্লিষ্ট) বিশ্লেষণ করে জানতে পারে, ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত ৪৭২তম সিন্ডিকেট সভার ৪৩ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ ও আপগ্রেডেশন নীতিমালা যুগোপযোগী করতে সুপারিশ প্রদানের জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশসমূহ ২০১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ৪৭৫তম সিন্ডিকেট সভার ১৩ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনুমোদিত হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৭ অনুযায়ী যেসকল বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকাংশই কম যোগ্যতা সম্পন্ন। এর ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিম্নমুখী হয়েছে এবং দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিকে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে।

সরকারি কাজে অসহযোগিতা

ইউজিসি তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘কোন প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সুপারিশ করা হলো, তা জানতে চেয়ে কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহার দালিলিক প্রমাণসহ লিখিত বক্তেব্যর জন্য চলতি বছরের ১২ জুলাই পত্র দেওয়া হয়। এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। এটি একটি বস্তুনিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন তৈরিতে তথা সরকারি কাজে ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসহযোগিতা বলে সুষ্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।’ 

ইউজিসিকে তথ্য দিয়ে কেন সহায়তা করেননি, এ বিষয়ে জানতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠালেও তার কাছ থেকে কোনো উত্তর মেলেনি। তারপর উপ-উপাচার্যের অফিস ও বাসার টেলিফোন নম্বরে ফোন করা হয়, তবুও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসন যখন শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় পরিবর্তন আনেন, তখন অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন। পরে বর্তমান উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের সময় উপ-উপাচার্য হয়ে আনন্দ কুমার সাহা সেই নীতিমালা পরিবর্তনের সুপারিশ করেন।  

শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা নিয়ে ইউজিসির পর্যালোচনা

বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবর্তিত শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পর্যালোচনা করে ইউজিসির তদন্ত কমিটি মত দেয় যে, ২০১৫ সালে প্রবর্তিত নীতিমালাটি সবচেয়ে যুগোপযোগী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। শুধু তাই নয়, এই নীতিমালা দেশের অন্য বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু সেটিকে পরিবর্তন করে ২০১৭ সালে যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, তা সবচেয়ে নিম্নমানের, যা কিছুতেই শিক্ষার মান উন্নয়নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগুলোর মধ্যে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা পরিবর্তনকেই প্রধান হিসেবে উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি।  পর্যালোচনায় বলা হয়, নিম্নমানের এই নীতিমালা প্রণয়ন না করলে বিভিন্ন বিভাগে কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ করার মতো আত্মঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।

ইউজিসি বলছে, ১৯৭৩ সালের অ্যাক্টের মাধ্যমে পরিচালিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার সঙ্গে ২০১৭ সালে পরিবর্তিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা তুলনা করে ইউজসিটির তদন্ত কমিটি। এতে তারা দেখতে পায়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানের প্রচলিত নীতিমালার চেয়ে অনেক উন্নতমানের। এমনকি অপেক্ষাকৃত নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালাও এর চেয়ে উন্নত।

২০১৫ ও ২০১৭ সালের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় যোগ্যতা

আগের নীতিমালায় সকল পর্যায়ে অনুষদের সব বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের আবেদনের ন্যূনতম যোগ্যতা ছিল সনাতন পদ্ধতিতে চারটি পর্যায়েই প্রথম শেণি/বিভাগ। গ্রেডিং পদ্ধতিতে এসএসসি ও এইচএসসিতে ২০০৪ ও তার পরবর্তী সময়ে পাস করা প্রার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫ এবং ২০০১ থেকে ২০০৩ সালের প্রার্থীদের জন্য জিপিএ ৪.০০ থাকার বিধান রাখা হয়। এ ছাড়া স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫ থাকতে হবে। আর বাংলা ও ইংরেজি বিভাগে ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে যেকোনো একটিতে সিজিপিএ ৩.৫ ও অন্যটিতে ৩.২৫ থাকার বিধান রাখা হয়। তবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মেধা তালিকায় প্রথম থেকে সপ্তম মেধাক্রমের মধ্যে থাকতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান দ্বিতীয় মেয়াদে নিয়োগ পেয়ে আগের শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালায় যোগ্যতা কমিয়ে আনেন। নতুন নীতিমালায় বলা হয়, তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে নীতিমালা পরিবর্তন আনা হয়। কলা, চারুকলা ও ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ ক্যাটাগরিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যেকোনো একটিতে সিজিপিএ ৩.০০ ও অন্যটিতে ৩.২৫। সামাজিক বিজ্ঞান, আইন, ব্যবসায় শিক্ষা, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট ও আইইআর পর্যায়ে একটিতে সিজিপিএ ৩.২৫ ও অন্যটিতে ৩.৫০ এবং বিজ্ঞানবিষয়ক অনুষদগুলো ও এ সংক্রান্ত ইনস্টিটিউটগুলোতে সর্বনিম্ন সিজিপিএ ৩.৫০ থাকতে হবে নিয়োগ প্রত্যাশীদের। এর বাইরে আগের নীতিমালায় থাকা প্রথম থেকে সপ্তম পর্যন্ত মেধাক্রমের শর্তটি তুলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এসএসসি ও এইচএসসির ক্ষেত্রেও আবেদনে যোগ্যতা শিথিল করা হয়।

আরও পড়ুন :

উপাচার্যের চাপেই ‘নিম্নমানের’ শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন

advertisement
Evaly
advertisement