advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

হেরে যাওয়াটাকে রফিক-উল হক মেনে নিতে পারতেন না

আহসানুল করিম
৩০ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২০ ২১:৩৯
advertisement

আইন বিষয়ে পড়াশোনা করলেও সত্যিকারার্থে এক সময় আমার আইনজীবী হওয়ার কোনো মনোবাসনা ছিল না। ওকালতি সম্পর্কে আমার একটা নেতিবাচক মনোভাব ছিল। ঘটনাচক্রে ১৯৯৪ সালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। একজন আইনজীবী যে এত মার্জিত হতে পারেন, পোশাক-আশাকে এত রুচিশীল হতে পারে, তার কথাবার্তা এত চৌকস হতে পারে, সেটি তাকে দেখার আগে কখনো অনুধাবন করিনি। তখনই জীবন সম্পর্কে আমার ভবিষ্যত পরিকল্পনা পরিবর্তন করলাম। তিনি তার চেম্বারে আমাকে কাজের অনুমতি দিলেন। আমি তার জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করলাম। তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পরই আইন পেশার প্রতি আমার মনোভাব পরিবর্তন হয়। সেই স্মৃতি আজও আমার কাছে অম্লান। আমি ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে যত দেখেছি, তত আকৃষ্ট হয়েছি। পরবর্তীকলে যখন আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয় তখন তাকে জানিয়েছিলাম তার প্রতি আমার আকর্ষণবোধের কারণ, শুনে তিনি হেসেছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক খুব বদমেজাজি লোক ছিলেন। এমন নয় যে, তিনি তার মতের বিরুদ্ধে কথা সহ্য করতে পারতেন না। স্বভাবগতভাবেই তিনি বদমেজাজি ছিলেন। কিন্তু সেই রাগ তিনি পুষে রাখতেন না। এটা ছিল একেবারে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। এই আসে এই চলে যায়। খুব স্পষ্টবাদী লোক ছিলেন তিনি। কারও মুখের ওপর যে কোনো সত্য কথা বলে দিতে দ্বিধা করতেন না। সে কারও ভালো লাগুক আর না লাগুক। তিনি কখনো মানুষের উন্নাসিকতা পছন্দ করতেন না। তার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রবল। আর এক ধরনের লোককে অপছন্দ করতেন তিনি, যারা কথায় কথায় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। তিনি বলতেন, যে লোক কথায় কথায় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে সে লোকই তোমার বিরুদ্ধে পেছনে নিন্দা করবে।

মামলায় হেরে যাওয়াটাকে তিনি সহজে মেনে নিতে পারতেন না। একটা বিশেষ মামলার কথা বলতে পারি, যে মামলায় হেরে যাওয়ার পর তিনি সত্যি সত্যিই বিমর্ষ হয়েছিলেন এবং বারবার বলতেন এই মামলায় হারাটা তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি। সেটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুটি মামলা যা সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ শেখ হাসিনার বিপক্ষে রায় দিয়েছিলেন। এ মামলা দুটিতে পরাজয়ের পর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বলে গেছেন, ওই দুটি মামলায় পরাজয়বরণ তার পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় হতাশা।

স্যার সব সময় লেখাপড়ার প্রয়োজনীয়তার প্রতি বেশি জোর দিতেন। ধনসম্পদের ওপর নয়। বারবারই বলতেন, তোমার সব অর্জন চলে যাবে। টাকা-পয়সা, বাড়ি-ঘর, সব চলে যাবে। কিন্তু বিদ্যা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তিনি বলতেন, টাকার পেছনে দৌড়িও না, একদিন টাকাই তোমার পেছনে দৌড়াবে। সেজন্য তিনি সব সময় চাইতেন তার আশপাশের সবাই যেন বেশি বেশি পড়ালেখা করে। যে লোকটি যত বেশি পড়ালেখায় আগ্রহী ছিলেন, তিনি তার প্রতি তত বেশি দুর্বল ছিলেন। তার জুনিয়রদের লেখাপড়া করানোর জন্য তার সব ধরনের প্রচেষ্টা ছিল। আমি দেখেছি, কারও ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাকে কীভাবে লেখাপড়ার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা যায়, আকৃষ্ট করানো যায় সে চেষ্টা তিনি সব সময় করতেন। তিনি জুনিয়রদের দিয়ে বিভিন্ন কেসের ডিসিশন (মামলার নজির) বের করাতেন। শুধু ডিসিশন বের করে দিলেই হবে না, ডিসিশনের প্রত্যেকটি শব্দ জানতে হবে আর বুঝতে হবে, আইনের বিষয়গুলো জানতে হবে। তিনি বলতেন, এত আইন তো সব জানা সম্ভব নয়। তবে তিনি ভালো আইনজীবী, যিনি জানেন আইনটা কোথায় আছে। বিদ্যানুরাগী হিসেবে তিনি অসংখ্য স্কুল-কলেজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অসংখ্য গরিব ছাত্রদের তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন।

আমি বিভিন্ন সময় তার রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বলেছি। রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে তিনি অবধারিতভাবে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি সেটা সব সময় প্রকাশ করতেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংযোজিত হওয়াটাকে তার দৃষ্টিতে অনুচিত হয়েছে বলে মনে করতেন। তিনি মনে করতেন এ রাষ্ট্র সবার। রাষ্ট্রের কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম থাকতে পারে বলে তিনি মনে করতেন না। রাষ্ট্র তো মানুষ নয়। মানুষের ধর্ম থাকতে পারে। রাষ্ট্রের নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখতে হবে। তার নিজের রাজনীতির প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনীতিতে তিনি আগ্রহী ছিলেন। একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন তিনি লালন করতেন। তিনি চাইতেন রাজনীতিতে যেন ধর্মের সংস্রব না হয়। রাষ্ট্র চলবে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধার্মিক ছিলেন।

বিগত দিনে বিএনপির শেষ সময়ে বিচারকদের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে তার ক্ষোভ ছিল। পছন্দের লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বসানোর জন্য বিচারকদের বয়স বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাকে বিচলিত করেছিল। তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল এই বয়স বাড়ানোর কারণেই ওয়ান-ইলেভেনের সূত্রপাত হয়েছিল। সে কারণে তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে ¯েœহের চোখে দেখলেও এই বিষয়ে তার সমালোচনা করতেন।

তিনি ব্যাংকিং আইন নিয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সমালোচনা করতেন। তিনি বলতেন, যে পদ্ধতিতে বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং গড়ে উঠেছে, সেটা ‘সুদের বাপ’। তিনি মনে করতেন ইসলামি ব্যাংকিংয়ে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে বলতেন, গ্রামীণ ব্যাংক হলো ‘কাবুলিওয়ালা’। এটা তার ব্যক্তিগত মতামত। তবে ড. ইউনূসের ব্যাপারে তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

জুনিয়রদের তিনি নিজের সন্তানতুল্য মনে করতেন। তার সহকর্মীদের তিনি যে পরিমাণ অর্থ প্রদান করতেন আজও সেটি উদাহরণ হয়ে আছে। রাষ্ট্রকে আয়কর প্রদানের বিষয়ে তিনি উদাহরণ হয়ে থাকবেন। আমাদের তিনি সততার সঙ্গে আয়কর প্রদানের বিষয়ে উপদেশ দিতেন।

বিচারপতি ফজলুল হককে এক সময় তিনি অনেক ভালোবাসতেন। কিন্তু একটা সময় যখন বিচারপতি ফজলুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এবং তার বিভিন্ন ঘটনাবলি মানুষের সামনে উন্মোচিত হলো, তখন স্যার খুব লজ্জিত হন।

সিনিয়র হিসেবে রফিক-উল হক সাহেবের তার জুনিয়রদের শিক্ষা প্রদানের পদ্ধতি অন্য অনেক সিনিয়রদের থেকে ব্যতিক্রম ছিল। তিনি কোনো জুনিয়রদের যা লিখতে দিতেন, সে লেখা তিনি নিজে পরীক্ষা করতেন। কীভাবে ডিসিশন পড়তে হয়, কীভাবে আইনের ব্যাখ্যা দিতে হয় কিংবা প্রয়োগ করতে হয়, ব্যবহারিক বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শিখিয়ে দিতেন। এ কারণে যাদের শেখার আগ্রহ ছিল, তারা সহজেই শিখে ফেলতে পারত এবং অল্পদিনের মধ্যেই নিজেকে একজন যোগ্য আইনজীবী হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠা করতে পারত। সেজন্য ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের অনেক জুনিয়র এখন যথেষ্ট ভালো করছে।

একটা বিষয় না বললেই নয়, যদি কখনো কেউ তাকে নিমন্ত্রণ করেছে, সে যে স্তরের লোকই হোক না কেন, নিমন্ত্রণ পেলে শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সেখানে যেতেন। আর যদি কখনো জেনেছেন কারও জানাজা হবে, আর সেই জানাজায় তিনি যাননি এমনটি আমি কখনো দেখিনি। তিনি বলতেন, যে লোক কারও জানাজায় যায় না তার জানাজায়ও কেউ যাবে না।

জীবনের শেষদিনগুলোতে তিনি খুব নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন। আমি নিজের থেকে যেটি উপলব্ধি করি সেটি হলো আপা (ফরিদা হক) ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি মারা যান। ৭ জানুয়ারি আবার তার ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিমের মেয়ের জন্মদিন। সিনিয়র মানসিকভাবে তার স্ত্রীর সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যু তার জন্য অসম্ভব মানসিক বিপর্যয়ের কারণ ঘটিয়েছিল। আপার মৃত্যুর পর তিনি কোর্টে আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার আপা নাই; আলমারির চাবিটা কার কাছে রেখে আসব।’ যিনি তার নিত্যদিনের সঙ্গি ছিলেন তার চলে যাওয়াটা তাকে খুব একা করে দেয়। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি তার নিজের কষ্টগুলো ভাগ করতেন না। যেমন তার অনেক শারীরিক কষ্ট ছিল। তার ভয়ানক ব্যাকপেইন ছিল, ঘাড়ে সমস্যা ছিল, খেতে পারতেন না। এসব বিষয়ে তিনি কাউকে কিছু বলতেন না।

তার শাশুড়িকে তিনি নিজের মায়ের মতো দেখতেন। সেই শাশুড়ি মারা যান ২০১০ সালে। সেটা তার জন্য খুবই কষ্টের কারণ ছিল। এর কয়েক মাস পরই তার স্ত্রী মারা গেলেন। এই দুটি মৃত্যু তাকে মানসিক যন্ত্রণা দেয়। তা ছাড়া তার যে পরিমাণ সামাজিকভাবে মূল্যায়িত হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে তিনি মূল্যায়িত হননি। এমন একটা সমাজের স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যেখানে কারও সঙ্গে কারও সংঘাত থাকবে না। হিংসা বা বিদ্বেষ থাকবে না। তিনি যখন দেখেছেন তার সেই স্বপ্ন বাস্তাবায়িত হয়নি, তখন তার মধ্যে একটা হতাশার সৃষ্টি হয়েছিল। তার বিষণœতা সৃষ্টি হয়েছিল আগেই তার স্ত্রী ও শাশুড়ির মৃত্যুর পর। এক পর্যায়ে তার নিজের কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে থাকে। তার যে প্রাপ্য সেই প্রাপ্যটা অধরা থেকে গেছে। তার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নের যথেষ্ট ভিত্তি তিনি দেখতে পাননি। তাই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। একটা সময়ে তিনি কারও সঙ্গে দেখা করতেন না, সাংবাদিকদের এড়িয়ে যেতেন। তিনি এক সময় মানুষের সঙ্গে অনেক মিশতেন। কিন্তু জীবনসায়াহ্নে এসে তার চারিত্রিক বৈপরীত্য দেখা যায়। অনেক সাংবাদিক কিংবা ভক্ত দেখা করতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যেতেন। এই অবস্থা শুরু হয় ২০১৬ সালের দিক থেকে। আমি কয়েকবার তাকে বাইরে খাওয়াতে নিয়ে গিয়েছি। আশপাশে আরও অনেক লোক ছিল, কিন্তু কারও সঙ্গে তিনি কথা বলেননি। সব সময় আমার হাত ধরে বসে থাকতেন। একদম শিশুর মতো হয়ে গিয়েছিলেন।

সময় কারও জন্য বসে থাকে না। জীবন জীবনের মতোই নিজের গতিতে চলছে। আদালত, আদালতের কাজ নির্দিষ্ট গতিতে চালিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু তার যোগ্য সন্তানের পদচারণা আর পড়বে না। দীপ্ত কণ্ঠে আইনের বিশ্লেষণ করতে আর তাকে দেখা যাবে না। তিনি চিরতরে দূরে চলে গেছেন। কিন্তু তাকে দেব না ভুলিতে। সবার ভালোবাসার মধ্যে তিনি চিরজাগ্রত হয়ে থাকবেন।

আহসানুল করিম : ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জুনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

advertisement
Evaly
advertisement