advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সরকার মাসুদ
আহমেদ মুজিব ও আমাদের কাব্য উচ্চাশার দিনগুলো

৩০ অক্টোবর ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০২০ ২১:৪৭
advertisement

জীবিকা অন্বেষণ এবং তরুণ লেখক হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠাÑ এ দুই অভিপ্রায় নিয়ে ঢাকায় পদার্পণ করি উনিশ ছিয়াশি সালের মাঝামাঝি। গোড়ার দিকে দুটি জায়গায় কিছুদিন থাকার পর আমার বাসস্থান হয় গাবতলী বাস টার্মিনালসংলগ্ন বাগবাড়ি নামে মহল্লায়। বিকেলে কাঠবডি বাসে করে দেড় টাকা দিয়ে আজিমপুর যেতাম। ফিরতাম রাত এগারোটা/সাড়ে এগারোটায়। ওই সময় আজিমপুর গোরস্তানের প্রধান গেটের নিকটবর্তী একটা টি-স্টলে (আমরা বলতাম ‘জামাইয়ের দোকান’) আমাদের একটা আড্ডা ছিল। তখন কবি আহমেদ মুজিবের বাসাও ছিল আজিমপুরে। সম্ভবত রিফাত চৌধুরীর মাধ্যমেই ওর সঙ্গে পরিচয় হয়। মুজিব সে সময় ‘দ্রষ্টব্য’ নামে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দু-তিনটি সংখ্যা বেরিয়েছিল। লিখেছিলাম একটি সংখ্যায়। কবিতা নয়, কাব্যসংক্রান্ত গদ্য।

আহমেদ মুজিবের কথা মনে হলে সবার আগে এই ছবিটা মাথায় ভাসেÑ ‘শিল্পতরু’ অফিসের এক কোণে টেবিলে ঝুঁকে প্রুপ দেখছেন। আমাকে দেখলে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতেন ‘হাই, সরকার!’ চেয়ার ছেড়ে উঠতেন না, এতটাই ব্যস্ততা ছিল। এক-দেড় ঘণ্টা পর লাঞ্চ আওয়ারে আমরা একত্রিত হতাম। ‘শিল্পতরু’ ছিল সত্তরের প্রজন্মের প্রধানতম কবি আবিদ আজাদ সম্পাদিত মাসিক সাহিত্যপত্রের নাম। নিউজপ্রিন্ট কাগজে ছাপা হতো। অফিস এবং প্রেস দুটোই ছিল; পাশাপাশি। বলছি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯১-৯২ এর বছরগুলোর কথা। আমি সে সময় নরসিংদীর ‘পলাশ শিল্পাঞ্চল কলেজ’-এ পড়াচ্ছি। প্রতিসপ্তাহে ঢাকা আসতাম। প্রায় প্রতিসপ্তাহে দেখা হতো রিফাত ও মুজিবের সঙ্গে। রাজু আলাউদ্দিন, পুলক হাসান, শামসেত তাবরেজি, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, কাজল শাহনেওয়াজ, অমিতাভ পাল প্রমুখের সঙ্গেও কমবেশি দেখা হতো।

মুজিব ছিলেন স্বল্পভাষী কিন্তু আন্তরিক। ফলে আমাদের পরিচয় বছরখানেকের মধ্যেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়। ততদিনে আমাদের আড্ডাস্থল পরিবর্তন হয়ে আজিমপুর ছেড়ে চলে এসেছি নীলক্ষেত-বাবুপুরা এলাকায়। নীলক্ষেত বস্তির মুখেই আমাদের একটা ঘর ছিল। আমরা ওটা ভাড়া নিয়েছিলাম প্রধানত নেশা করার জন্য। ওই ঘরে প্রবেশাধিকার ছিল পাঁচ-সাতজনের। প্রচুর আড্ডা হতো। পানি-তামাক খাওয়া হতো। সাহিত্যের আলাপও হতো। আহমেদ মুজিব অবশ্য নীলক্ষেত বস্তির ওই আড্ডায় শামিল হতেন না। তার সঙ্গে কথা হতো কাঁঠালবাগানের ঢালে, যেখানে শিল্পতরুর অফিস ছিল; শাহবাগের আজিজ মার্কেটে, মোহাম্মদপুরে তার বাসায়। কবিতা বা সাহিত্যের অন্য মাধ্যম নিয়ে মুজিব খুব একটা কথা বলতেন না। বরং এ ব্যাপারে তিনি অপ্রতিভই ছিলেন। কদাচিৎ তাকে কোনো লেখকের গদ্য বা কবিতা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে শোনা গেছে। তবে তার কবিতা পড়লে বোঝা যেত, ভেতরে ভেতরে তিনি কতটা সিরিয়াস ছিলেন। কাব্যের নতুন প্রকাশরীতি এবং নতুন বিষয়বস্তুর কথা ভাবতেন, আমার সঙ্গে শেয়ার করতেন। সেসবের প্রভাবও পড়ত তার কবিতায়। মাঝে মধ্যে জিজ্ঞেস করতেন, কী পড়ছি-কী লিখছি এসব। ফলে দেখা গেছে, কম্পোজিটর, পোকা, সিলিংফ্যান, কালো কালি, করল্লা ক্ষেতের পাখি, মতিঝিল প্রভৃতি বিচিত্র থিম নিয়ে লিখতে পেরেছেন তিনি। ‘মতিঝিল’ কবিতাটি তো এক কথায় অসাধারণ। ছাপা হয়েছিল পাক্ষিক ‘শৈলী’তেÑ এক পৃষ্ঠাজুড়ে। মনে আছে কবি, কথাসাহিত্যিক ইকবাল আজিজ (‘শৈলী’র তৎকালীন কবিতা সম্পাদক) কবিতাটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছিলেন, বলেছিলেন কবি হিসেবে মুজিবের উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথাও। তো মুজিবের আরও অনেক কবিতা পড়ে আমরা সত্যিই খুশি হয়েছিলাম; পাঠক হিসেবে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে। ১৯৯২-৯৩ সালের দিকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, আহমেদ মুজিবের কবিতা ক্রমে নিজত্বচিহ্নিত হয়ে উঠছে। একাধিক সিনিয়র সাহিত্য সম্পাদকের সুনজরে পড়ে গেছেন তিনি। লিটল ম্যাগাজিনের পাশাপাশি সুপ্রতিষ্ঠিত তিন-চারটি দৈনিকেও তার কবিতা নিয়মিত বেরোতে আরম্ভ করেছে। একটু একটু করে তার কবি পরিচিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার ভালো লাগত। আমি আমার আনন্দটা শেয়ার করতাম অন্যদের সঙ্গে।

গোড়া থেকেই স্বাতন্ত্র্যসন্ধানী ছিলেন মুজিব। সাধ্যমতো ক্ষমতার প্রয়োগও করে গেছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বভাবতই তার ভাবনা-কল্পনা পরিচ্ছন্ন হয়েছে। শব্দ ব্যবহারে সতর্ক হয়েছেন। তার ‘প্রেসের কবিতা’-পরবর্তী পাঁচ-সাত বছরের কবিতাগুলো একত্রিত করা সম্ভব হলে দেখা যেত, আলাদা একটা মেজাজ আছে। কবিকল্পনার বিশিষ্ট ভুবন আছে। কিন্তু ‘শিল্পতরু’ প্রেসে কাজ করার সময় মুজিবের মাথায় খুলে গিয়েছিল কবিতার সেই নতুন দিগন্ত। আমরাও তো কতবার প্রেসে গিয়েছি। কিন্তু ছাপার মেশিন, কম্পোজিটর, কালি, প্রুফ, নিউজপ্রিন্ট এগুলো নিয়েও যে কবিতা লেখা যায়, আর তা সফল কবিতা হয়ে উঠতে পারে, তা আমাদের মাথায় আসেনি। প্রেসে কাজ করতে করতে মুজিব ভেবেছেন সেসব। তলেতলে লিখেও ফেলেছেন ব্যতিক্রমী একগুচ্ছ কবিতা, যা পরে ‘প্রেসের কবিতা’ নামে বই হয়ে বেরোয়। বাংলা ভাষায় প্রেস উপজীব্য করে হয়তো কবিতা রচিত হয়েছে কিন্তু এ বিষয়ে পুরো একটা বই লেখা মানে রীতিমতো একটা ভাবপরিম-ল সৃষ্টি করার ব্যাপারটা যদ্দুর জানি, এই প্রথম। দুই ফর্মার চটি গ্রন্থটিতে আছে ছাব্বিশটি কবিতা। অনেকগুলোই সার্থক রচনা বলে মনে করি। একটি কবিতায় মুজিব লিখেছেনÑ ‘মরা ডাল থেকে শাদা বাল্ব-ফুল আলো ছুড়ে দেয়।’ লক্ষ করুন, ‘বাল্ব-ফুল’ শব্দটি। ‘দ্বন্দ্ব’ শিরোনামের কবিতাটি শুরু হয়েছে এভাবে ‘প্রজাপতি তুমি উড়ন্ত ইজেল’। এখান থেকেই মুজিবের কবিকল্পনার নিজস্ব ধরনটি বুঝে নেওয়া যেতে পারে। আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাজির করছিÑ

ক. আহা কি সুন্দর হাওয়া/টেবিলের মধ্যখান দিয়ে যায়/আর আমার চুল ছোঁয়/আর আমার কান্না ছোঁয়।/ কয়েকটি কান্না যায় গড়িয়ে, ঐ কোথায়?

খ. তুমি ব্যথা পেয়েছো ভোর মেশিনের চাপে,/এজন্য তুমি আজ বাঁকা, অন্ধ।/তোমার হাত মেঘের ব্যান্ডেজে শক্ত করে বাঁধা,/চুঁইয়ে পড়ছে রক্তের মন, তাই একটু লাল।

গ. ঢালো রঙ প্রকৃত মনে পাটাতনে/কালো রঙ রাত্রির খোপে;/শাদা হলো দিন/আর লাল আমারই রক্ত/সূচ দিয়ে গাঁথা বই।

সৃষ্টিশীল কবিকল্পনার পাশাপাশি আহমেদ মুজিব সৃষ্টি করেছিলেন আলাদা কাব্যভাষা। সাদামাটা আটপৌরে গদ্যকে একজন কবি কতটা সক্ষমতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারেন, তার উজ্জ্বল উদাহরণ মুজিবের কবিতা। এই গদ্য নমনীয়, প্রচল অর্থে অকবিতাসুলভ ও হৃদয়গ্রাহী। হ্যাঁ, এসব লেখা, বিশেষত প্রেসের কবিতাসমূহ, একান্ত ব্যক্তিক অনুভূতির নির্জনতম এলাকা থেকে উৎসারিত। কবিতার কালোত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হচ্ছে, ব্যক্তিগত ভাবনা নৈর্ব্যক্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া। তার কবিতা আরও বেশি স্বাতন্ত্র্যদীপ্ত এবং আরেকটু যোগাযোগসক্ষম হয়ে ওঠার আগেই আহমেদ মুজিব চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। আশির প্রজন্মে এসেছিল একঝাঁক বৈচিত্র্যসন্ধ কবি। বিচ্ছিন্নভাবে ভালো কবিতা লিখেছেন অনেকেই। কিন্তু কবিতা ভাষায় অনন্যতা অর্জন করেছেন কিংবা তীব্রভাবে সেই পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এ রকম গুটিকয় শক্তিমন্ত কবির একজন অবশ্যই আহমেদ মুজিব। বাংলাদেশের আশির প্রজন্মের সহজ-গভীর কবিতার পরিম-লে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্যের জোগান দিয়েছে তার কবিতা। তার অকাল তিরোধান আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এই কষ্ট এবং সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টি আমাদের তাড়িত করবে আমৃত্যু।

আহমেদ মুজিবের কবিতা

কালো কালি

রাত নামলো গরম ট্রেডেল মেশিনে আর ছেঁড়া কাগজের ব্যথায়,

তুমি কি জানো, রাত নামলো লোহার চাকার গুঁড়োয় আর

অন্ধ ইঁদুরের মনে?

রুমের মধ্যে গ্রামের কাঠ, তার কিছুটা ক্ষত,

মুখ গোঁজার মতো অনেক ময়লা লতা; আর

হাইডেলবার্গের নিচে নিয়মিত প্রুফ-কাটা জঙ্গলের পর

মবিল-তেলের ছোট্টো জলাশয়। দেখো,

তার কাদায় বুঝি শাপলার বীজ, শামুকের গান।

রাত নামলো কাঁপা পানির শব্দে

তুমি কি জানো, তা থেকে হাওয়া এসে আমার কানে লাগে?

রাত নামলো হুগলির খালি কৌটায় কালি কালি ভরতে।

তুমি কি জানো, ছাপা-গল্পের একটা কুকুরের হাঁটুতে রাত নামলো

শুধু একটি সকালের জন্য?

(প্রেসের কবিতা; ১৯৯১)

কানচাবি চাঁদ

আপার-সিলিন্ডারে একফালি কানচাবি চাঁদ

মনে হয় ধুলো ও জং-এ-ধরা

জেগে আছে শহরে, এইখানে, এই দামহারা প্রেসের আকাশে।

শাদা বালুর মধ্যে দিয়ে যখন সূর্য গেল, একাকী একবার।

আর আচমকা বিদ্যুতের তারগুলো কালো

বীণা সেজে

এক থাম থেকে আরেক থামে, সরু ও থমথমে।

তখন পাড়ার ছোট্টো ছেলেরা গেঞ্জি বদল করে,

চাঁদ খুঁড়লো নিজেদের চোখ দিয়ে

যেখানে ছাদে এক কিশোরি-কন্যার

ভিনদেশের দূরবীনে, ছানি-পড়া দাদার হাসি ও কালো রঙ

শেষ চিল, কিছু জ্বলা মেঘ ও হাওয়া ধরে থাকে।

আর দূরে চাঁদ মিথ্যে নয়Ñ বাঁকা হয়ে আছ ফাঁকায়

কোনো এক নারীর চোখের মতো ভেজা, দীর্ঘ ও পাপড়ির।

কিন্তু কোনো চাঁদই উঠলো না, কাঁচের কিংবা তামার এবং আমার।

এইখানে, একফালি কানচাবি চাঁদ।

ধুলো ঝেড়ে বল্টুর সাথে, জং-এ ও পাথুরে রঙিন।

(প্রেসের কবিতা; ১৯৯১)

advertisement
Evaly
advertisement