advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কোরআন অবমাননার প্রমাণ মেলেনি, গুজব রটিয়ে পাটগ্রামে পুড়িয়ে হত্যা

ইন্ধনদাতাকে খুঁজছে পুলিশ

আমাদের সময় ডেস্ক
১ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ নভেম্বর ২০২০ ০০:৩২
advertisement

কোরআন অবমাননার গুজব রটিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মো. শহীদুন্নবী জুয়েলকে গণপিটুনির পর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় প্রতিবেদন দিয়েছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। জুয়েলের বিরুদ্ধে কোরআন অবমাননার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে। ঘটনাটিকে বীভৎস ও মধ্যযুগীয় বর্বরতা আখ্যা দিয়ে প্রতিবেদনে মসজিদের খাদেম, ডেকোরেটর মালিক ও ইউপি সদস্যকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানার ওসিও ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। আর পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাশ ভট্টাচার্য্য মনে করছেন, এ ঘটনায় অন্য কারও হাত থাকতে পারে। পুরো ঘটনাটিকে বের করে সবাইকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওয়াহাব ভূঞা। গতকাল শনিবার দুপুরে উপজেলার শহীদ আফজাল হোসেন হলরুমে আলেম সমাজের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তারা এ কথা বলেন।

হত্যাকা-ের শিকার মো. শহীদুন্নবী জুয়েল রংপুর নগরীর শালবন এলাকার বাসিন্দা ওয়াজেদ আলীর ছেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সায়েন্স বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে জুয়েল যোগ দিয়েছিলেন রংপুর ক্যান্টমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান লাইব্রেরিয়ান হিসেবে। এক বছর আগে একটি ঘটনায় তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর পর থেকে তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্য হারান। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মসজিদ থেকে বের করার পর জুয়েলকে হত্যা করা হয়েছিল। পুলিশ গিয়েও তা ঠেকাতে পারেনি। এ ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহমুদ ফায়জুল কবীরের (জেলা ও দায়রা জজ) নেতৃত্বে দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিটিকে এ বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। নিহতের পরিবার, বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ ও পুলিশ বাদী হয়ে গত শুক্রবার রাতে পৃথক পৃথক মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে নিহত জুয়েলের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা, ইউনিয়ন পরিষদ অফিস ভাঙচুরের ঘটনায় চেয়ারম্যানের দায়ের করা ভাঙচুরের মামলা এবং পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা আরেকটি মামলায় অন্তত ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ওই এলাকার ৫০০ থেকে ৬০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

এদিকে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলে এক বন্ধুকে নিয়ে গত বৃহস্পতিবার সকালে বাসা থেকে বের হন জুয়েল। এর পর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারী স্থলবন্দরের সবচেয়ে বড় মসজিদে গিয়ে তারা আসরের নামাজ আদায় করেন। মানসিক ভারসাম্যহীন জুয়েল মসজিদের খাদেম জাবেদ আলীকে বলেন- মসজিদের সেলফে অস্ত্র আছে, আমি চেক করব। এর পর সেলফে থাকা কোরআন ও হাদিসের বই দেখতে থাকেন। এ সময় জুয়েল অসংলগ্ন কথাবার্তা বলায় খাদেম জাবেদ আলী মসজিদের পাশে থাকা ডেকোরেটর দোকানের মালিক হোসেন আলীকে ডেকে আনেন। মসজিদের খাদেমের কথা শুনে জুয়েলকে মারধর শুরু করেন হোসেন আলী। এর পর তাদের একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।

তখন জাবেদ আলী ও হোসেন আলী প্রচার করতে থাকেন তারা (জুয়েলরা) পবিত্র কোরআন অবমাননা করেছেন। মুহূর্তের মধ্যে এ কথা ছড়িয়ে পড়লে জুয়েলের শার্টের কলার ধরে মারতে মারতে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যান স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম। সেখানে নিয়েও তাকে মারধর করা হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা জুয়েল ও তার সঙ্গীকে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে বুড়িমারীতে অবস্থানরত পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুন্নাহার বেগম এবং পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মোহন্ত ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিকটিমদের উদ্ধারের চেষ্টা চালান। একপর্যায়ে তারাও বিক্ষুব্ধ জনতার রোষানলে পড়েন। পরে ইউএনও এবং উপজেলা চেয়ারম্যান জুয়েলের বন্ধুকে নিয়ে বুড়িমারী স্থলবন্দরে ন্যাশনাল ব্যাংকে আশ্রয় নেন।

অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের কলাপসিবল গেট ও দরজা ভেঙে শত শত জনতা জুয়েলকে বের করে গণপিটুনি দিতে দিতে গলায় দড়ি লাগিয়ে টেনেহেঁচড়ে বাইরে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে তার মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে সেই উত্তপ্ত আগুনে জুয়েলকেও নিক্ষেপ করে। ফলে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান ওই ব্যক্তি। তার পুরো শরীর জ্বলে অঙ্গার না হওয়া পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ জনতা সেখানেই অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এর মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে এসে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলিবর্ষণ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করলে জনতা তাদেরও ধাওয়া দেয়। পরে ওসিসহ পুলিশ সদস্যরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। আহত হন কয়েকজন পুলিশ সদস্য। প্রায় ২ ঘণ্টার আগুনে জুয়েলের শরীর ভস্মীভূত হয়। পরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ততক্ষণে জুয়েলের কয়েকটি হাড় ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের শহীদ আফজাল হল কক্ষে গতকাল আলেম সমাজের সঙ্গে বৈঠক শেষে পুলিশের ডিআইজি দেবদাশ ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘বুড়িমারীতে কোরআন অবমাননার গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে হত্যা ও ভাঙচুরের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তারের বিষয়টি পরে জানানো হবে। ছোট একটি ঘটনাকে রঙ দিয়ে পেছন থেকে কেউ সুযোগ নিতে পারে। তাই পুরো ঘটনাটি তদন্ত করছে একাধিক সংস্থা। একটু অপেক্ষা করুন প্রকৃত রহস্য বের হবে।’ ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকা- মনে করছেন কিনা- উত্তরে ডিআইজি বলেন, ‘আমরা মনে করি, এ ঘটনায় কারও না কারও ইন্ধন রয়েছে। না হলে এমন একটা তুচ্ছ ঘটনা, যেটা কিনা ঘটনাই নয়, সেটা নিয়ে এমন বড় কিছু হওয়ার কথাই নয়। যারাই থাকুক ঘটনার সামনে কিংবা পেছনে, তাদের খুঁজে বের করা হবে।’

এ সময় উপস্থিত ছিলেন রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আবদুল ওহাব ভূঞা, জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা, পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল, ইউএনও কামরুন নাহার, ওসি সুমন কুমার মোহন্ত। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমাম-মোয়াজ্জেমসহ পাঁচ শতাধিক আলেম উপস্থিত ছিলেন।

রংপুর সংবাদদাদা জানান, গতকাল শনিবার দুপুরে শহীদুন্নবী জুয়েলের গায়েবানা জানাজা তার প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সম্পন্ন হয়েছে। এতে জুয়েলের আত্মীয়স্বজন, ভাই, সহকর্মী, বন্ধুসহ দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশ নেন। এ সময় বলা হয়, জুয়েল ছিলেন ধর্মভীরু ও সহজ-সরল। সারাজীবন তিনি মানুষের সেবা করে গেছেন। কিন্তু তাকে এমনভাবে হত্যা করা হলো, যা আমরা মেনে নিতে পারছি না। তার দুই সন্তানও বাবার মরদেহটাও দেখতে পেল না।

এর আগে জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিদ্যালয়ের সামনের প্রধান সড়কের পাশে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। এতে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাফিয়ার রহমান শফি, সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল, বেরোবি শিক্ষক ড. কুহিন ওয়াদুদ, বাসদ নেতা আবদুল কুদ্দুছ, রংপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক রফিক সরকার, ক্লাবের সদস্য সাংবাদিক আরিফুল হক রুজুসহ রংপুর জিলা স্কুলের বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্ররা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম গুজব ছড়িয়ে একজন ধর্মপ্রাণ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যক্রমও দেখা যাচ্ছে না। আমরা চাই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক।

advertisement
Evaly
advertisement