advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রেশম দেখাচ্ছে কোমল স্বপ্ন

ফয়সাল আহমেদ, গাজীপুর সদর
২২ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০ ০০:১১
advertisement

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার নিভৃতপল্লীর দুটি গ্রাম বরহর ও দিঘিরকান্দা। অধিকাংশ লোকেরই জীবন বাঁধা কৃষির সঙ্গে। কিন্তু যুগ পাল্টাচ্ছে, পাল্টে যাচ্ছে কৃষি উৎপাদনের হিসাব-নিকাশ। তাই সেখানকার কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ রেশম বোর্ড। কৃষকদের পাশাপাশি গাঁয়ের কিষানীদেরও স্বাবলম্বী করতে উদ্বুদ্ধ করেন রেশম চাষে। সরকারের সেই উদ্যোগ কয়েক বছরেই বদলে দিয়েছে ওই গ্রামের নারীদের জীবনধারা। এখন যেন রেশমজালেই আবদ্ধ তাদের সব স্বপ্ন। ওই গ্রামগুলোর বাড়িতে বাড়িতে তৈরি হয়েছে রেশম চাষের পলু ঘর। বরহর গ্রামের জাহেদা আক্তার জানান, তার স্বামী মাঠে কাজ করেন। সংসারের রান্নাবান্নার কাজ শেষে বাড়িতে তাকে অলস সময় কাটাতে হতো। আবার স্বামীর সামান্য রোজগারে তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসারের নানা খরচ জোগাতেও খেতে হতো হিমশিম। তাই পাঁচ বছর আগে তিনি রেশম চাষ শুরু করেন। অবসর সময়ে সেই কাজ করে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা সংসারের জোগান দেন জাহেদা। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করতেও এখন আর কোনো বাধা নেই। সংসারও চলছে সচ্ছলভাবে। একই গাঁয়ের বধূ শিল্পী রানী বলেন, ‘আমাদের হিন্দুুপল্লীতেও এখন রেশম চাষে ঝুঁকছেন নারীরা। ঘরে বসেই একজন নারী হিসেবে বাড়তি আয় করতে পারছেন সবাই। অথচ আগে নিজের বিভিন্ন খরচের জন্য স্বামীর হাতের দিকে চেয়ে থাকতে হতো। এখন নিজের ও সন্তানদের খরচ মিটিয়ে স্বামীর হাতে উল্টো টাকা তুলে দিতে পারি। আর এভাবে নিজের স্বাবলম্বী হওয়াটা আমাকে অন্যরকম আনন্দ দেয়।’

দিঘিরকান্দা গ্রামের কামাল হোসেন জানান, কিছুদিন আগেও অভাবের সংসার ছিল তার। এক সময় স্ত্রী রেশম চাষ শুরু করেন। এতে কয়েক বছরেই সংসারে সচ্ছলতা ফিরেছে। তিনি এখন মাঠে কাজ করেন আর তার স্ত্রী বাড়িতে রেশম চাষ ও গবাদিপশু পালন করেন।

কাপাসিয়া রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের সুপারভাইজার গোলাম ছহুরুল আলম জানান, আঞ্চলিক এই রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের অধীন গাজীপুরের কাপাসিয়া, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকায় রেশম চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে কাপাসিয়ায় হতদরিদ্র পরিবারের নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে এ চাষ শুরু করা হয় বেশ কয়েক বছর আগেই। সমন্বিত প্রকল্পের অধীনে তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে এতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে দুটি গ্রামের ৬৪ নারীর বাড়িতে পলুু ঘর নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। রেশম পোকার খাবারের জন্য স্থানীয় বরদার খালের উভয় পাশে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় রোপণ করা হয়েছে তুঁতগাছ। লাভজনক এ কাজে এলাকার বহু নারী স্বাবলম্বী হওয়ায় অনেকেই এখন এ চাষে ঝুঁকছেন। সরকারি এ কর্মসূচির বাইরেও গ্রামের শতাধিক পরিবারের নারীরা রেশম চাষ করে নিজেদের সচ্ছলতা ফিরিয়েছেন। তাদের সহায়তায় বিনামূল্যে তুঁতগাছ, বাড়িতে বাড়িতে রেশম কীট (লার্ভা) বিতরণ থেকে গুটি তৈরি- সব কিছু তদারকি করে রেশম বোর্ড। পরে উৎপাদিত গুটি কৃষকদের কাছ থেকে কেজি দরে কিনে নিয়ে সুতা উৎপাদন করা হয়। বছরে চারবার রেশম গুটি উৎপাদন করা যায়- ভাদ্র, অগ্রহায়ণ, চৈত্র ও জ্যৈষ্ঠ মাসে।

তিনি জানান, তুঁতগাছ চারা থেকে পরিণত হতে ২ থেকে ৩ বছর সময় লাগে। আর কৃষকদের ডিম দেওয়ার পর কয়েক দিনেই রেশম পোকা তৈরি হয়। পরে তুঁতগাছের পাতা কেটে কুচি কুচি করে দেওয়া হয় পোকার খাবার হিসেবে। সেগুলো খেয়েই পোকাগুলো ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যেই গুটি তৈরি করে। তিন-চারদিন পর তা রোদে শুকিয়ে নিতে হয়, যাতে ভেতরের পোকা মারা যায়। পরে তা বিক্রির উপযোগী হয়। প্রতিকেজি গুটির দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। ওই গুটি থেকেই তৈরি হয় রেশম সুতা। প্রতি ১০ থেকে ১২ কেজি গুটি থেকে এক কেজি সুতা পাওয়া যায়। বর্তমানে এক কেজি সুতা বিক্রি হয় সাড়ে তিন হাজার টাকায়।

গাজীপুরের আঞ্চলিক রেশম সম্প্রসারণ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, গাঁয়ের নারীদের স্বাবলম্বী করতেই রেশম চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ রেশম শিল্প সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় কাপাসিয়ায় প্রায় অর্ধশত সুবিধাভোগী এই কাজ করছেন। প্রতি তিন মাসে তাদের আয় হচ্ছে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা মতো। এর বাইরেও কয়েকশ নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন। নিজ বাড়িতে সংসারের কাজের ফাঁকে রেশম চাষে সামান্য সময় দিয়ে অনায়াশেই তারা বছরে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বাড়তি আয় করতে পারেন। রেশম চাষের মাধ্যমে বিনাখরচে গাঁয়ের কিষানীদের কয়েক মাস পর পর ভালো টাকা আয় রোজগার করতে পারাটাই সরকারের সার্থকতা। পোকার খাবার সরবরাহের জন্য সরকারি বিভিন্ন খাল ও নদীর ধারে তুঁতগাছ রোপণ করা হচ্ছে। এতে কোনো জমিরও অপচয় হচ্ছে না।

advertisement
Evaly
advertisement