advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার বর্ষপূর্তিতে আমাদের প্রার্থনা

অঘোর মন্ডল
২২ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০ ১৪:০৭
advertisement

বর্ষপূর্তিও হয়ে গেল তার। আর এই বর্ষপূর্তিতে তার দেওয়া উপহার ‘নিউনরমাল’ লাইফ! করোনার সৌজন্যে মানুষ এক নতুন জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছ। খানিকটা অস্বাভাবিকতাই এখন মানুষের জীবনে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা ভাইরাসের ছোবলে মানুষের চেনা-জানা যাপিতজীবন হারিয়ে গেছে। প্রতিদিন করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। মানুষ মরছে, সুস্থও হচ্ছে। বছরজুড়ে করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর রেখাচিত্রে

বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বাড়ছে সংক্রমণ। সঙ্গে সুস্থতার হারও বেড়েছে। একই সঙ্গে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গে সংক্রমণ এবং মৃত্যু আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বিশ্বজুড়ে। ইউরোপ-আমেরিকা ও এশিয়ার চিত্রও একই। অন্ধকারাচ্ছন্ন অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে পৃথিবী। মাঝখানে খানিকটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে ‘ভ্যাকসিন’ নামের একটি শব্দে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার করোনা প্রতিরোধে

মানবদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্তত তেমনটি দাবি ওইসব প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের।

গোটা বিশ্ব এখন লড়ছে করোনার বিরুদ্ধে অনেকটা এক হয়ে। বলা যায় জোটবদ্ধভাবে। ওই লড়াইয়ে করোনাকে এখনো পেছনে ফেলা সম্ভব হয়নি, বরং গত এক বছরে পৃথিবীকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে এই অদৃশ্য শত্রু। ঠিক এক বছর আগে এই নভেম্বরে চীনের উহানে প্রথম থাবা বসিয়েছিল করোনা। চীনের সংবাদপত্র ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী গত বছরের ১৭ নভেম্বর চীনের উহানে ৫৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি প্রথম আক্রান্ত হন করোনায়। অর্থাৎ তিনিই ছিলেন পেশেন্ট জিরো। তার পর গত এক বছরে পৃথিবীতে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটি ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১৩ লাখের বেশি। বাংলাদেশেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যাটি একদিন কম থাকলে পরদিন বেড়ে যাচ্ছে। আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে শীতের আগমনীবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় তরঙ্গ চলছে বিশ্বে। বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দ্বিতীয় তরঙ্গও করোনা মহামারীর কেন্দ্রভূমি হয়ে উঠেছে ইউরোপ। বিভিন্ন দেশে আবার শুরু হয়েছে লকডাউন। কয়েকটা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় ইউরোপের অনেক দেশে চলছে যুদ্ধকালীন অবস্থা। সুইজারল্যান্ডে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দুই- বেড়েছে। তা দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যেও করোনা হয়ে ওঠে বড় ইস্যু। সবকিছু দেখে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে শঙ্কিত বাংলাদেশও। ইতিহাসগতভাবে যে কোনো মহামারীর দ্বিতীয়, এমনকি তৃতীয় ঢেউ এসেছে সংক্রমণের।

১০০ বছর আগে ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে যে মহামারী হয়েছিল, এর দ্বিতীয় তরঙ্গ ফিরে এসেছিল শীতে এবং ভয়ঙ্কররূপে বেড়েছিল এর প্রকোপ। ১৯১৮ সালে শীতের শুরুতে ফিরে এসেছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা। এর প্রার্দুভাব ছিল ভয়ঙ্করতম। বছরান্তে এক যুক্তরাষ্ট্রে মারা যায় প্রায় সাত লাখ মানুষ। এবার করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এ বিশ্বে এখন পর্যন্ত যত মানুষ মারা গেছে- জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মৃতের এক-চতুর্থাংশ মারা গেছে দ্বিতীয় ঢেউয়ে। ১০০ বছরের ব্যবধানে দুটি মহামারীর চরিত্রগত পার্থক্য রয়েছে। তবে দুটি মহামারীর গতি-প্রকৃতি ও প্রসারের বিন্যাস প্রায় একই রকম। আর সেটি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বারবার দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়াবহতার কথা বলছেন। সবকিছু দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন বারবার করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন। কেন তিনি বারবার জনসাধারণকে সাবধান ও সতর্ক করছেন।

মহামারীর ইতিহাস তাকে এই দ্বিতীয় তরঙ্গের ভয়াবহতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের সব সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধানের চিন্তায় এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। ব্রিটিশ প্রশাসন জনজীবনে বিধিনিষেধের কড়াকড়ি কেন? উত্তর একটিই- করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ। ফ্রান্স কেন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় লড়ছে কোভিড-১৯ এর বিপক্ষে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর উচ্ছ্বাসের রাশ টেনে জো বাইডেন কেন কোভিড-১৯ টাস্কফোর্স গড়ার কথা বলছেন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের নিয়ে? উত্তর একটিই- করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ। বাংলাদেশে জনজীবনে স্বাভাবিকতার গায়ে সতর্কতা আর সুরক্ষার লেবেল এঁটে দেওয়া হচ্ছে। জোর দেওয়া হয়েছে মাস্ক ব্যবহারে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, ‘নো মাস্ক, নো সার্ভিস।’ কিন্তু জনগণ কেন যেন নিজেরাই এই সুরক্ষা আর সতর্কতাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে রাজি নয়! শীতের সঙ্গে সঙ্গে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যদি বাড়তে শুরু করে, তা হলে এর ভয়াবহতা কী হতে পারে- এটি কল্পনা করা কঠিন।

উন্নত বিশ্বে যেখানে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অধিকতর উন্নত, সেখানে তারাও হিমশিম খাচ্ছেন করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে। এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পক্ষে করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গ সামাল দেওয়া কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বড় হাতিয়ার হতে পারে জনগণের সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলা। না হলে হাসপাতালের বিছানা খালি পাওয়া যাবে না। ডাক্তারের কাছ পর্যন্ত পৌঁছানোর সময় পাওয়া যাবে না। আর এসবের দায় শুধু সরকারকে দিয়ে কোনো লাভ হবে না। কারণ আমরা কেউ করোনাজর্জরিত বাংলাদেশ চাই না।

করোনার দ্বিতীয় বা তৃতীয় তরঙ্গের আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা আমাদের নেই। মাস্ক, মাস্ক অ্যান্ড মাস্ক। মাস্কের ব্যবহার বাড়াতেই হবে। মাস্কের ব্যবহারকে পাত্তা না দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে বিপর্যয় ডেকে এনেছেন। নিজে হাসপাতালে গিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মাস্ক খুলে ফেলেছেন! এর প্রভাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি টের পেয়েছেন কিনা জানি না। তবে করোনা মহামারীর সময় মুখে এই একচিলতে কাপড় অনেক মূল্যবান অন্তত সংক্রমণ রোধ আর স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিবেচনায়।

শুধু স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে একেবারে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থানÑ সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে করোনা। গোটা বিশ্ব এখন অস্বাভাবিকতার মধ্যে স্বাভাবিকতা খুঁজে বেড়াচ্ছে! একই সঙ্গে খুঁজছে করোনার কবল থেকে মুক্তির উপায়। মুক্তির জন্য বিভিন্ন দেশে টিকা তৈরির কাজ চলছে। অনেকে টিকা তৈরিতে সাফল্যের কথাও বলছেন। তবে জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না, কবে মুক্তি মিলবে করোনা থেকে।

লাখো প্রাণ কেড়ে নিয়ে বর্ষপূতি হলো করোনা ভাইরাসের! এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির আগে পৃথিবী কী মুক্তি পাবে করোনার ছোবল থেকে! করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গের চোখ রাঙানিতে আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। এর তৃতীয় তরঙ্গের কথা ভাবতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসবে পৃথিবীর বুক থেকে! করোনাকালের নতুন স্বাভাবিক জীবন মানুষকে খাঁচাবন্দি করে রেখেছে। মানুষ ফিরে যেতে যায় তার ওই পুরনো স্বাভাবিক জীবনে। বুকভরে নিতে চায় প্রশান্তির নিঃশ্বাস। করোনার কালো অন্ধকারের মধ্যে মানুষ অনেকটা দূরে খানিকটা আশার আলো দেখছে ‘ভ্যাকসিন’-এ। মানবদেহে করোনা ভ্যাকসিন প্রয়োগে পৃথিবী মুক্তি পাবে কোভিড-১৯ থেকে। পৃথিবীজুড়ে মানুষের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে কাক্সিক্ষত বস্তু করোনা ভ্যাকসিন। করোনার বর্ষপূর্তিতে আমাদের প্রার্থনা- খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবীকে মুক্তি দাও তুমি। আর ফিরে এসো না বছরান্তে।

অঘোর মন্ডল : সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement