advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এবং আমাদের উল্টো মনোভাব

ইকবাল খন্দকার
২২ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২০ ১৪:০৯
advertisement

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। একবার এক স্কুলে একজন জাঁদরেল শিক্ষক এলেন। জাঁদরেল বলতে সাংঘাতিক জাঁদরেল। বেত ছাড়া ক্লাসে আসতেন না। ধমক ছাড়া কথা বলতেন না। ছাত্ররা তার ভয়ে পুরো ক্লাসটাইম চুপসে থাকত। অন্য কোনো শিক্ষকের পড়া শিখে আসুক বা না আসুক, এই শিক্ষকের পড়া না শিখে আসার কথা চিন্তাও করত না। এভাবেই চলছিল। দেখা গেল, অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরো স্কুলে একটা বড় পরিবর্তন চলে এলো। অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তন। যেসব ছাত্র দুষ্টুমি ছাড়া কিচ্ছু বুঝত না, বই ছুঁয়ে দেখত না, তারাও ভালো রেজাল্ট করল। এর মধ্যে একদিন একটা অঘটন ঘটল। অঘটনটা অনিচ্ছায় ঘটলেও দায়টা ছাত্রদের ওপরই চাপানো যায়। অঘটনটা এমন- ছাত্ররা বিরতির সময় ফুটবল খেলছিল। আর সেই শিক্ষক যাচ্ছিলেন পাশ দিয়ে। হঠাৎ করে বল এসে তার মাথায় লাগে। আর এতটাই জোরে লাগে যে, তিনি পড়ে যান মাটিতে। তার কপালের কাছে একটু কেটেও যায়। এই ঘটনা ঘটার পর ছাত্ররা এতটাই ভয় পেয়ে গেল যে, স্কুল ছেড়ে দিল। প্রায় এক সপ্তাহ স্কুলে এলো না ওই ছাত্ররা, যারা ফুটবল খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। কারণ তাদের এমন ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল- স্যার পিঠে বেত ভাঙবেন। স্যার ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তাই তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন, যেহেতু তারা স্বেচ্ছায় কোনো অপরাধ করেনি, অনিচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনাটা ঘটে গেছে, অতএব তিনি কাউকে কিছু বলবেন না, করবেন না। সুতরাং সবাই নির্ভয়ে ক্লাসে আসতে পারে।

শিক্ষকের ঘোষণায় সবাই আশ^স্ত হলো এবং স্কুলে আসতে লাগল। এই ঘটনার পরম মহৎ বা স্লেহপরায়ণ শিক্ষক হিসেবে ওই শিক্ষকের সুনাম ছড়িয়ে পড়ার কথা থাকলেও ঘটনা ঘটল উল্টোটা। ছাত্রদের ভয় কমে গেল। তাদের মধ্যে এই মনোভাব তৈরি হলো, এত বড় অপরাধ করার পরও যেহেতু স্যার কিছু করেননি, ক্ষমা করে দিয়েছেন, অতএব পড়া শিখে না আসা, ক্লাসে ফিসফাস করা, সর্বোপরি পরীক্ষায় ডাব্বা মারা ইত্যাদি অপরাধও তিনি ক্ষমা করে দেবেন। ব্যস, ওই শিক্ষক স্কুলে আসার আগে ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনার যে দুরবস্থা ছিল, আবার সেটা শুরু হয়ে গেল। আর ওই শিক্ষকও হতাশ হয়ে চলে গেলেন অন্য স্কুলে। এই ঘটনার সঙ্গে আমাদের দেশের করোনা পরিস্থিতিকে মেলানো যায় খুব সহজেই। প্রথম যখন করোনা এলো, তখন আমরা কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম। ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে যাব দূরের কথা, বারান্দায় যাওয়ার আগেও তিনবার ভাবতাম। যে কোনো সময় মারা যাওয়ার ভয়ে কতজন যে বদলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল! কিন্তু যখন দেখা গেল মৃত্যুহার যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল ততটা হয়নি, তখন ভয় কেটে গেল মানুষের। শুরু হলো বেপরোয়া জীবনযাপন। আর যারা বদলে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা ভুলেই গেলেন কী ঘোষণা দিয়েছিলেন, কেন দিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা একটা জায়গায়। ওই শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের আচরণে হতাশ হয়ে অন্য স্কুলে চলে গেলেও মানুষের বেপরোয়া জীবনযাপনে অতিষ্ঠ হয়ে করোনা কিন্তু কোথাও যায়নি, যাবেও না। থাকবে, আছে এবং ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টাচ্ছে। অব্যাহত রাখছে মৃত্যুও। আর দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা তো পুরোপুরি রয়েই গেছে। এবার কথা বলা যাক শিরোনামের ‘উল্টো’ শব্দটা নিয়ে। করোনাকে যখন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত ভয় পেয়ে গেল, তখন এই ভয় কাটানোর জন্য রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পর্যায়ের প্রচারমাধ্যমগুলোতেও এই অভয় বাণী প্রচার করা হলো- আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি। মানুষ বিপদে পড়ে এই অভয় বাণী অনেকটাই মেনে চলল। সুফলও পেল। কিন্তু এখন চলছে উল্টোপথে, উল্টোরথে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কথা শুনে অনেকেই আতঙ্কে আছে।

কিন্তু সচেতনতার বেলায় ঠনঠন। তার মানে ‘আতঙ্ক নয়, সচেতনতা জরুরি’ কথাটা না মেনে মানছে উল্টোটা- ‘সচেতনতা নয়, আতঙ্ক জরুরি’। যা ব্যক্তিকে তো বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেই, ঝুঁকিতে ফেলছে সমাজ এবং রাষ্ট্রকে। মানুষকে অভয় দেওয়ার জন্য আরেকটা কথা বলা হতো প্রায়ই- ‘অযথা হাসপাতালে ভিড় না করে বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিন।’ কথাটা বলার পেছনে যত ভালো উদ্দেশ্যই থাকুক না কেন, সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বরং উল্টোটা হয়েছে। অনেকেই বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিজের শরীরের এতটাই ক্ষতি করে ফেলছেন যে, যখন তারা হাসপাতালে যাচ্ছেন, তখন ফুসফুস অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে। তার মানে আমরা এতটাই অসচেতন যে, কোন পর্যায় পর্যন্ত ঘরে থেকে চিকিৎসা করা যাবে, কোন পর্যায়ে হাসপাতালে যাওয়া বাধ্যতামূলক, তাও জানি না, বুঝি না। দুদিন আগে এক রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম- মাস্ক পরছেন না যে? রিকশাওয়ালা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল- ‘এইগুলার দরকার নাই। গরিবের করোনা অয় না।’ ওই রিকশাওয়ালা নয় শুধু, নিম্ন আয়ের প্রায় প্রতিটি মানুষের ধারণা, গরিবের করোনা হয় না। এটা বড়লোকদের রোগ। অতএব তারা ঝুঁকিমুক্ত। এই অপযুক্তি কেন তাদের মাথায় এলো, বোঝা দুষ্কর। আর এই অপযুক্তির জাঁতাকলে পড়ে কত সুযুক্তি যে হারিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। মানুষ কেবল ব্যক্তিচেষ্টায়ই ভালো অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে না। এর জন্য দরকার পারিপাশির্^ক সমর্থন, সহযোগিতা, উৎসাহ। কিন্তু আমাদের সেটা নেই।

যে মানুষটা মাস্ক পরার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন এবং চেষ্টা করছেন অভ্যাসটা ধরে রাখতে, তাকে যদি আমরা সহযোগিতা করতে পারতাম, তা হলে অবশ্যই তিনি এই অভ্যাসে স্থির হতেন। আর তাকে দেখে অনেকেই অনুপ্রাণিত হতো। কিন্তু আমরা সহযোগিতা করব কী, রীতিমতো অসহযোগিতা করে যাচ্ছি। নইলে মাস্কের দাম কেন বাড়বে? কেন নিম্নমানের মাস্ক বাজারে আসবে? চালের দাম বেড়ে যাওয়া, চালের সঙ্গে পাথর মেশানো- ইত্যাদি অপকর্মের সঙ্গে আমরা পরিচিত।

তবে এসব অপকর্মের প্রভাবে মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ে না। চালের দাম বেড়ে গেছে? ভাত একটু কম খেলাম। চালে পাথর মেশানো হয়েছে? একটু বাড়তি সতর্কতা নিয়ে চালটা পরিষ্কার করে নিলাম। আর কোনো সমস্যা থাকল না। কিন্তু মাস্কের দাম বেড়ে গেলে যদি মাস্কটা মানুষ কম পরে, তা হলে এর প্রভাবে শুধু তার নিজের মৃত্যু নয়, অন্যদের মৃত্যুও নিশ্চিত হতে পারে। আর নিম্নমানের মাস্ক তো আরও ভয়ঙ্কর। এসব ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দূর করার দায়িত্ব যদি কোনো ব্যক্তি নিতে চান, তাতে সমস্যা বাড়বে বৈ কমবে না। কিন্তু যদি রাষ্ট্র বা প্রশাসন নেয়, তা হলে সুফল নিশ্চিত। তবে এখানেও কথা থাকে। আপনি যদি হেলমেট ছাড়া রাস্তায় বের হন, পুলিশ আপনাকে আটকাতে পারে, জরিমানা করতে পারে। কিন্তু আপনি যদি পাড়ার চা-স্টলে মাস্কবিহীন অবস্থায় বসে আড্ডা দেন, তা হলে পুলিশের পক্ষে কি সম্ভব প্রতি মুহূর্তে আপনাকে সতর্ক বা জরিমানা করা? চা স্টল কেন, আপনি তো ঘরে বসেও একদল লোকের সঙ্গে মাস্ক না পরে আড্ডা দিতে পারেন। করোনা ছড়াতে পারেন নির্বিচারে। এর দায়ভার কে নেবে? অবশ্যই আপনাকে নিতে হবে। অতএব ব্যক্তি কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। সব দায় রাষ্ট্র বা প্রশাসনের ওপর তারাই চাপিয়ে দেয়, যারা মূলত গা বাঁচাতে চায়। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, গা বাঁচানোর সময় এটা নয়। আরে, জীবনই যদি না থাকে, গা বাঁচিয়ে আপনি করবেনটা কী?

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

advertisement
Evaly
advertisement