advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

উজ্জ্বল নক্ষত্রের গোধূলিযাত্রা

চপল মাহমুদ ও ফয়সাল আহমেদ
২৮ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২০ ১৩:২৬
advertisement

২০২০। এ যেন এক অভিশপ্ত বছর। দিনে দিনে বড় হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। আলো না ফুটতেই সেই মিছিলে যোগ দিলেন আরেক নক্ষত্র। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। গতকাল ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ আমাদের সময়কে বলেন, ‘উনাকে বিদায়ের জন্য জোট থেকে কোনো আনুষ্ঠানিকতার সুযোগ পাচ্ছি না। কারণ তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিলেন।’

আলী যাকেরের মরদেহ বেলা সাড়ে ১১টায় নেওয়া হয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে। সেখানে জানানো হয় শেষ শ্রদ্ধা। গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বেলা আড়াইটা নাগাদ মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানী কবরস্থানে। সেখানেই বাদ আসর জানাজা শেষে চিরনিদ্রায় শায়িত হন বরেণ্য এই সাংস্কৃতিক

কর্মী। তার এভাবে চলে যাওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।

পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বেশ কয়েক বছর ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন আলী যাকের। চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়মিত থেরাপি চলছিল। গত সপ্তাহে শারীরিক সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে সিসিইউতে ভর্তি ছিলেন কিছুদিন। কিছুটা সুস্থ হলে গত শনিবার বাসায় নেওয়া হয়। তবে রবিবার আবারও হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। কোভিড-১৯ টেস্ট করানো হয় সোমবার। ফল হাতে পেলে জানা যায়, তিনি পজিটিভ।

১৯৪৪ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রামের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক মোহাম্মদ তাহের ও রিজিয়া তাহেরের ঘরে আলী যাকেরের জন্ম, চারপাশে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। চট্টগ্রামে জন্ম হলেও তার পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। বাবা মোহাম্মদ তাহেরের বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের চাকরির সুবাদে ছেলেবেলায় এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফেনী, খুলনা, কুষ্টিয়া ঘুরে বাবা যখন প্রাদেশিক সরকারের সচিব হলেন, তখন ঢাকায় থিতু হয় পরিবার। সেন্ট গ্রেগরি থেকে ম্যাট্রিক এবং নটর ডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট করে আলী যাকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই জড়িয়ে পড়েন নাট্যচর্চায়, সেই সঙ্গে ছাত্র রাজনীতিতে। লেখাপড়া শেষ করে করাচিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডব্লিউএস ক্রফোর্ডাসে ট্রেইনি এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে প্রথমে ভারতে গিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। চলচ্চিত্র পরিচালক ও সাংবাদিক আলমগীর কবির তাকে উদ্বুদ্ধ করেন প্রচারযুদ্ধে অংশ নিতে। তিনি যুক্ত হন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটির দায়িত্ব নেন। মৃত্যুর সময়ও আলী যাকের কোম্পানির গ্রুপ চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আলী যাকের। ওই বছরের জুনে তিনি নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন। তখন থেকে নাগরিকই তার ঠিকানা। ‘বাকি ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ম্যাকবেথ’সহ অনেক আলোচিত মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক তিনি। পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেও তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ বহু নাটকে অভিনয় করে দর্শকের মনে দাগ কেটেছেন। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন। অভিনয় করেছেন বেশকিছু চলচ্চিত্রেও। টেলিভিশনের জন্য লিখেছেন মৌলিক নাটক। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন দীর্ঘদিন। প্রকাশিত হয়েছে বইÑ ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। ফটোগ্রাফিও করেছেন শখের বশে। নতুন প্রজন্মের কাছে ছিলেন উজ্জ্বলতম এক বাতিঘর।

আলী যাকের নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির পূর্ণ সদস্য। পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। স্ত্রী স্বনামধন্য অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, ছেলে অভিনেতা ইরেশ যাকের, ছেলের বউ মিম রশিদ, নাতনি নেহা ও মেয়ে শ্রেয়া সর্বজয়াকে নিয়ে ছিল তার সংসার।

বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকেরের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সেই সঙ্গে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বরেণ্য অভিনেতা আলী যাকের ছিলেন দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তার মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য অভিনেতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে হারাল। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ যেন এক অপূরণীয় ক্ষতি।’ প্রধানমন্ত্রী তার শোকবার্তায় বলেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ, দেশের শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আলী যাকেরের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের এই শব্দসৈনিকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীরপ্রতীক, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গাজী মাজহারুল আনোয়ার, বিএনপির সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জল, জাসাস সভাপতি অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক চিত্রনায়ক হেলাল খান।

 

 

 

 

advertisement
Evaly
advertisement