advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

দেশি বিমানের টিকে থাকার লড়াই

তাওহীদুল ইসলাম
২৯ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২০ ০৯:৫১
advertisement

করোনা ভাইরাসের করালগ্রাসে সর্বপ্রথম এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রিজ ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সারাবিশ্বের আকাশপথ লকডাউন অবস্থায় ছিল। ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ থাকলেও কর্মীবাহিনীর বেতন, লিজে আনা উড়োজাহাজের ব্যয়, ঋণের কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ সবই বহন করতে হয়েছে। করোনার প্রকোপ আবার বাড়লে দেশি বিমান সংস্থার অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এমনিতেই একে একে ৭টি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে।

তাই কোভিড-১৯ মহামারীতে লোকসান পোষাতে বিকল্প চিন্তা করছে এয়ারলাইন্সগুলো। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ছাড়াও ইউএস বাংলা, নভো এয়ার ও রিজেন্ট এয়ার নামে বিমান সংস্থা রয়েছে। দেশের এয়ারলাইনস ব্যবসা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে বাজার দখল করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। যাত্রী পরিবহন কিন্তু বন্ধ হবে না। এ জন্য উদ্যোগী হতে হবে সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষকেই।

এয়ারলাইনস ব্যবসায় প্রথমত গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে। উড়োজাহাজ কেনা ও গন্তব্য বাছাই করার সঙ্গে ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির বিষয় সম্পৃক্ত। এ ছাড়া বলা হয় উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম তুলনামূলক বেশি; মেরামতের জন্য বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত হ্যাঙ্গার না থাকা, অতিরিক্ত অ্যারোনটিক্যাল চার্জ এবং যন্ত্রাংশের আমদানি জটিলতার বিষয় তো রয়েছেই।

এ নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ- বেবিচক বলছে, এরই মধ্যে তারা অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ মওকুফ করেছে। কমিয়েছে নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জও। দুই বছর আগে হ্যাঙ্গার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে এর সমাধান হতে পারে। ল্যান্ডিং চার্জ কমালে বিমানবন্দরের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তবে জ্বালানির দাম কমাতে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলো। এক্ষেত্রে তাদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। বাকি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ দেবে সরকার।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন, দেশীয় এয়ারলাইনস টেকাতে সব ধরনের চেষ্টা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবেই চার্জ মওকুফ ও কিছু ক্ষেত্রে চার্জ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়া হ্যাঙ্গার নির্মাণ করা হচ্ছে শাহজালাল বিমানবন্দরের উত্তর দিকে। জুনে চালু হতে পারে। এতে করে এয়ারলাইন্সগুলো রক্ষণাবেক্ষণসহ সব কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।

বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শিকদার মেজবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা, জেট ফুয়েল খরচকে আন্তর্জাতিক মানদ-ে নিরূপণ, প্যাসেঞ্জার এয়াররলাইনসের জন্য হ্যাঙ্গার সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আশা করি, বেবিচক এটি করছে।

সঠিক রুট পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এয়ারলাইনসের জন্য রুট পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার তথা সিভিল এভিয়েশন অথরিটির অনুমতিক্রমে প্যাসেঞ্জার এয়ারক্রাফটগুলোকে সাময়িকভাবে কার্গো এয়ারক্রাফটে রূপান্তর করে আয়ের পথকে কিছুটা সচল রাখার চেষ্টা করেছিল ইউএস-বাংলা। নতুন বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গন্তব্য দুবাই ও আবুধাবিতে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। তা ছাড়া শ্রীলংকার কলম্বো ও মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে ফ্লাইট চালুর সিদ্ধান্তও নিয়েছে।

বর্তমান ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান বহরে ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, ৬টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০সহ মোট ১৩টি এয়ারক্রাফট রয়েছে। গত ১ জুন থেকে ধারাবাহিকভাবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে সংস্থাটি। ৬টি ব্র্যান্ডনিউ এটিআর ৭২-৬০০ ও তিনটি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, যশোর, সৈয়দপুর, রাজশাহী ও বরিশাল রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এ ছাড়া বোয়িং ৭৩৭-৮০০ দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটেও ফ্লাইট পরিচালনা করছে। গত ২৮ অক্টোবর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এয়ার বাবল চুক্তির অধীনে ঢাকা থেকে কলকাতা ও চেন্নাই এবং চট্টগ্রাম থেকে চেন্নাই রুটে ফ্লাইট চলছে।

১৭ নভেম্বর থেকে সিলেট থেকে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট মাস্কাটে পরিচালনা শুরু করেছে ইউএস-বাংলা। বর্তমানে ঢাকা থেকে কলকাতা, চেন্নাই ছাড়াও মাস্কাট, দোহা, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর ও গুয়াংজু রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে মাস্কাট, দোহা ও চেন্নাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে ইউএস-বাংলা।

অন্যদিকে যাত্রীর অভাবে কিছু রুটে ফ্লাইট চালু করেও বন্ধ করতে বাধ্য হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। আবার ৫ রুটে স্থগিতের মেয়াদ বাড়িয়েছে কোভিডের কারণে। কোভিড-১৯ শুরুর সময় গত মার্চ মাস থেকে ব্যাংকক, ম্যানচেস্টার, কাঠমান্ডু, মদিনা ও কুয়েত- এ পাঁচ আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের ফ্লাইট স্থগিতের সময় কয়েকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ফ্লাইট স্থগিত রয়েছে।

সেটি এখন ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা মহামারীর কারণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী চলাচলের হার আন্তর্জাতিক রুটে ৭০ শতাংশ ও অভ্যন্তরীণ রুটে ৩৫ শতাংশ কমেছে। এই কমানোর হার ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা রয়েছে। চলমান করোনায় বেসরকারি তিন এয়ারলাইনসের মধ্যে রিজেন্ট ছাড়া সবাই সীমিত আকারে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

এমনিতেই দেশের বিমান পরিবহন খাতের ৭০ শতাংশ বিদেশি বিমান সংস্থার দখলে। বাকি ৩০ শতাংশ দেশীয় এয়ারলাইনসের দখলে, যারা বছরে প্রায় আট হাজার ৪০০ কোটি টাকার বাজার নিয়ে কাজ করে। স্থানীয় বিমান সংস্থা টিকে না থাকলে দেশের এভিয়েশন খাত বিদেশিদের হাতে চলে যেতে পারে।

করোনাকালের আগে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে প্রতিদিন দেড়শর মতো ফ্লাইট পরিচালনা করত বিমান, ইউএস-বাংলা, নভো এয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। এই চারটি এয়ারলাইনস বছরে ৫০ লাখের মতো যাত্রী বহন করে। চলতি বছর আরও বেশি যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল তাদের। এ জন্য বহরে নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করা ও ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে গেছে।

এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১২-১৩ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী ছিল সাড়ে ৬ লাখ, ২০১৫ সালে বেড়ে হয় সোয়া ৯ লাখ। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ মিলে আকাশপথের যাত্রী সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৭ হাজার। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ ফ্লাইট চলাচল করেছে। ওই বছর আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রী ছিল প্রায় ৮৫ লাখ ৯৬ হাজার এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ৪৪ লাখ ৮২ হাজার।

আগের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী ছিল ৮২ লাখ ৬৪ হাজার এবং অভ্যন্তরীণ রুটে ছিল ৪১ লাখ ২৫ হাজার। তবে এ বছর মার্চে চীন ও যুক্তরাজ্য ছাড়া সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আকাশপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মে মাস থেকে যুক্তরাজ্যের সঙ্গেও ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। জুন থেকে সীমিত পরিসরে ফ্লাইট চলাচল শুরু হওয়ায় আয়ের পরিমাণ কিছুটা বাড়তে থাকে। তবে তা আগের তুলনায় অনেক কম।

স্বাধীনতার পর চালু হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ১৯৯৫ সালে বেসরকারি এয়ারলাইনস ব্যবসা শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে লাইসেন্স পাওয়া ১১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি এখন টিকে আছে। দেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইনস হিসেবে লাইসেন্স পায় অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইনস। ১৯৯৭ সালে তারা যাত্রী পরিবহন শুরু করে। এক বছরও সেটি টেকেনি। এর পর একে একে বন্ধ হয়ে যায় জিএমজি এয়ারলাইনস, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, জুম এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার ও রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইনস। অব্যাহত লোকসানের মুখে বেশিদিন ডানা মেলতে পারেনি এসব বিমান সংস্থা।

advertisement
Evaly
advertisement