advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

৪০ বছরে কতটা এগিয়েছে মঞ্চ নাটক

আজ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশান দিবস

চপল মাহমুদ
২৯ নভেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২০ ০৯:২০
বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের কয়েকজন পথিকৃৎ। পুরোনো ছবি
advertisement

বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের ৪০ বছর পূর্তি আজ। ১৯৮০ সালের ২৯ নভেম্বর বাংলাদেশের মঞ্চ নাট্যদলগুলোর সম্মিলিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনকে বিকশিত করার প্রত্যয়ে গঠিত হয়েছিল এই ফেডারেশান। সংগঠনটি গঠনের ৪০ বছর অতিক্রম করলেও নাট্যচর্চায় এখনো আসেনি পেশাদারিত্ব এবং নাট্যচর্চার গণ্ডি অনেকটা কেবল ঢাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সংগঠনটি বাংলাদেশের নাট্যচর্চা এবং দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে নাট্য আন্দোলনের গতি বাড়লেও এর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে খুব একটা এগোতে পারেনি। বিশেষ করে দেশব্যাপী মঞ্চনাটকে প্রসার ও প্রচারে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারেনি গ্রুপ থিয়েটার।

বাংলাদেশের নাট্যচর্চা তথা সাংস্কৃতিক আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বলে আসছে ফেডারেশান। কিন্তু জেলাভিত্তিক কতিপয় সংগঠন নাট্যচর্চা চালিয়ে গেলেও মফস্বলে নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ঢাকা শহরেরও দু-একটি দল ছাড়া বেশিরভাগ নাট্যদলের নাটক মঞ্চায়নে দর্শক সংকটে ভুগছে। চলমান করোনাকালের কারণে বর্তমান সময়ে সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে ছোট দলগুলো বরাবরই অবহেলিত হয়ে থেকে যাচ্ছে। এ ছাড়া ছোট দলগুলো তিন-চার মাস, এমনকি বছরেও হল বরাদ্দ পায় না। ফেডারেশানের হস্তক্ষেপেও এমন বৈষম্য কমানো যায়নি। মঞ্চ সংকট, দর্শক সংকট নিরসনে কার্যকর তেমন কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না। তবে নানা অভিযোগ আর সমালোচনা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে তারুণ্যনির্ভর এ সংগঠনটির কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও বাংলাদেশের বাংলা নাটকের নিজস্ব আঙ্গিক পুনরুদ্ধার তথা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের কাছে যথাযথ উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাধীনতার পরই গ্রাম থিয়েটার, মুক্তনাটক আন্দোলন আর থিয়েটার ফেডারেশান মিলে যেভাবে রাজধানী-শহর-উপশহর-গ্রাম পর্যায়ে থিয়েটারচর্চা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। এ সময় নতুন নতুন থিয়েটার দল গড়ে উঠেছিল, পূর্ণ উদ্যমে নানা রঙে-ঢঙে-ভঙ্গিমায় নাট্যকর্মশালা, নাট্যনির্মাণ, নাট্যপ্রদর্শনী, মিটিং, সেমিনার, উৎসব মিলে দেশজুড়ে যেন থিয়েটারের যজ্ঞ শুরু হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম দশকেই এই ঘটনাগুলো ঘটা শুরু হয়ে তুঙ্গে উঠেছিল। এখন তো থিয়েটারচর্চাটা শুধু শহরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন আসতে পারে- বাংলাদেশে এখন কি ভালো থিয়েটার হচ্ছে না? অবশ্যই হচ্ছে। শুধু গত ২০ বছরের ঢাকার মঞ্চের থিয়েটার প্রযোজনাগুলোর দিকে যদি দৃষ্টি দিই, তা হলে দেখতে পাব কতসব বৈচিত্র্যপূর্ণ নাট্য প্রযোজনা এসেছে দর্শকের সম্মুখে, নানা রঙের এবং স্বাদের থিয়েটার দেখেছি আমরা ঢাকার মঞ্চে। ঢাকার বাইরেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক থিয়েটার হয়েছে। এ কথা সত্যি যে, একটি-দুটি থিয়েটার হল নির্মাণ কিংবা বার্ষিক সামান্য পরিমাণ থোক বরাদ্দ দিয়ে থিয়েটারের উন্নয়ন কখনই সম্ভব নয়। হাতেগোনা কিছু ভালো মঞ্চ প্রযোজনা তৈরি হচ্ছে বটে, কিন্তু তার সবই হয় ব্যক্তি কিংবা সাংগঠনিক উদ্যোগে। এখানে রাষ্ট্রের কিংবা সরকারের কোনো সহযোগিতা নেই। জাতীয় নাট্যশালা কিংবা মহিলা সমিতিতে নাট্য প্রদর্শনীর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটা ভর্তুকি রয়েছে বটে, তবে এটাও মনে রাখা দরকার, যৎসামান্য অনুদান দিয়ে থিয়েটারচর্চা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

একটা অভিযোগ রয়েছে তরুণ নাট্যকর্মীদের বিরুদ্ধে। এখনকার তরুণরা থিয়েটারে আসতে চায় না, থিয়েটারে এলেও ঠিকমতো সময় দেয় না। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে থিয়েটারে কি পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছি? সেটার উত্তর কী? আবেগ দিয়ে অনেক কিছুই তো বলা যায়, কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন।

রাজধানীর থিয়েটারচর্চার প্রসঙ্গই যদি ধরি, ১৯৭১-পরবর্তী যে দলগুলো গ্রুপ থিয়েটারচর্চা শুরু করেছিল, সে দলগুলোর বেশিরভাগের বর্তমান অবস্থা কী? পূর্বের সেই জৌলুশ ধরে রেখে কি তারা নাট্যচর্চা করতে পারছে? নাকি ছাড় দিতে দিতে টিকে থাকার লড়াই চলছে? গত শতকের নব্বই-পরবর্তী সময়ে তরুণ নাট্যকর্মীরা নতুন নতুন নাট্যদল গড়ে তুলেছে। বর্তমান সময়ে তারুণ্যনির্ভর নাট্যদলগুলো যেমন- প্রাচ্যনাট, পালাকার, প্রাঙ্গণেমোর, বটতলা, স্বপ্নদল, জাগরণী থিয়েটার, বুনন থিয়েটার, সুবচন নাট্য সংসদ, জীবন সংকেত, মণিপুরি থিয়েটার, অপেরা, বাতিঘর ইত্যাদি তাদের প্রযোজনা নিয়ে মঞ্চ মাতিয়ে রেখেছে।

পুরনো দলগুলোও তরুণদের ওপর ভর করেই এগোচ্ছে। গত শতকের আশির দশকে পথনাটক যেমন করে স্বৈরশাসককে অস্থির করে তুলেছিল, তেমন উদাহরণ কিন্তু তার পর আর লক্ষ করা যায়নি। এখন নাট্যদলগুলোর বেশিরভাগই নিয়ম রক্ষার মতো পথনাটক করে থাকে। অন্যদিকে থিয়েটারচর্চায় পেশাদারিত্ব আনার জন্য পথিকৃৎ নাট্যজন মামুনুর রশীদ ‘বাঙলা থিয়েটার’-এর যাত্রা শুরু করেছিলেন। ‘বাঙলা থিয়েটার’-এর প্রদর্শনী শেষে প্রযোজনাসংশ্লিষ্ট সবাই পরিমাণে কম হলেও সম্মানী পেতেন। বাংলা থিয়েটারের প্রযোজনা নির্মাণ এবং প্রদর্শনী একেবারেই অনিয়মিত ছিল। তাই এই উদ্যোগের মাধ্যমে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

স্টুডিও থিয়েটারচর্চা

স্টুডিও থিয়েটারচর্চার ক্ষেত্রে বরিশালে সৈয়দ দুলালের নেতৃত্বে ‘শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটার’ বাংলাদেশের থিয়েটার অঙ্গনে নক্ষত্রের মতো। স্টুডিও থিয়েটার স্পেসকে মাথায় রেখেই শব্দাবলী তার নাট্যপ্রযোজনা নির্মাণ করে। প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত সেখানে দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনীও হয়। নিজস্ব জায়গা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা শব্দাবলীর জন্য কাজটি অনেক সহজ করে দিয়েছে। জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক থিয়েটারচর্চাকে মেলানোর মতো চমৎকার আয়োজন করে গেছে দলটি।

শিল্পকলা একাডেমির যাত্রা শুরু

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা যাত্রা শুরু করে মূল মিলনায়তন এবং এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার মিলনায়তন নিয়ে। বেশ কয়েক বছর পর বিকল্প এবং ইনটিমেট থিয়েটারচর্চার লক্ষ্যেই স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনটি আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো নাট্যদলগুলো এই স্টুডিও হলটির উপযোগী করে মঞ্চ প্রযোজনা নির্মাণ করে না। স্টুডিও থিয়েটারের প্রকাশভঙ্গি আলাদা, তাই নাট্যদলগুলোর এই মিলনায়তনটিকে বিবেচনায় রেখে নাট্য নির্মাণ করা উচিত। সাধারণত দেখা যায়, নাট্যশালার মূল মিলনায়তন কিংবা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার মিলনায়তনে যখন দর্শক কমে যায়, তখন সেই নাটকটি স্টুডিও থিয়েটারে মঞ্চায়িত হয়। যেহেতু বেশিরভাগ নাট্যপ্রযোজনা স্টুডিও থিয়েটার মিলনায়তনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয় না, সেহেতু সেই আবেদনটা দর্শকের কাছে পৌঁছায় না।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি এই মিলনায়তনের যথাযথ ব্যবহারের জন্য দলগুলোকে উৎসাহিত ও আগ্রহী করে তুলতে পারে। অনুদান ও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রসঙ্গ বর্তমানে থিয়েটারের প্রায় সবাই স্বীকার করেন যে, থিয়েটারের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সরকারি সহযোগিতার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, পাশাপাশি বেসরকারি-করপোরেট প্রতিষ্ঠানেরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

advertisement
Evaly
advertisement