advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

আমনের ক্ষতিতে জোর রবিশস্য ও বোরোতে

চপল মাহমুদ
২ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ ডিসেম্বর ২০২০ ২৩:২৪
advertisement

সারাদেশে আমন ধান কাটায় ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষক। তবে পর্যায়ক্রমে চার দফা বন্যায় আউশ ও আমন আবাদে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে না বলেই মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে আমন ধানের ক্ষতির পরিমাণটাই বেশি। এ অবস্থায় দেশে চালের চাহিদা পূরণে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৫০ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে আগামী মৌসুমে এ ধান চাষ করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় এ বছর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে রবিশস্যের দিকে। এ ছাড়াও আগামী মৌসুমে আউশ ও আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হবে বলে জানা যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমন উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টন। আর এ বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫৫ দশমিক ৯০ লাখ টন, যা গত অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ১৪ লাখ টন বেশি। কিন্তু বানের জলে আমনের বেশ ক্ষতি হয়েছে এবার। যদিও অভ্যন্তরীণ বাজারে এর তেমন

কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।

অধিদপ্তরের তথ্যে থেকে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৩৯ দশমিক ৯৩ লাখ টন আমন চাল উৎপাদন হয়েছিল। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪০ দশমিক ৫৪ লাখ টনে। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমন উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ৪২ লাখ টন। কিন্তু এ বছর ২০২০-২১ অর্থবছরে আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫৫ দশমিক ৯০ লাখ টন। তাই বন্যায় যদি ৩-৪ লাখ টন চাল কম উৎপাদিত হয় তাতেও আগের বছরের তুলনায় বাড়তি উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে আগামী বোরো মৌসুমে যদি বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তাহলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেই চালের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ জানান, এ বছর বন্যায় বিভিন্ন জেলা মিলিয়ে ৫০ হাজার হেক্টর জমির উফশী জাতের ধান এবং ৫০ হাজার হেক্টর জমির বোনা আমন ধানের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বোনা আমনে এমনিতেই ফলন কম হয়। বোনা আমনে প্রতি হেক্টরে দেড় টন এবং রোপা আমনে ফলন হয় ২.৬ টন। গড়ে যদি আমরা ২ টন করে ধরি তা হলে ২ লাখ টন ধানের ফলন এ বছর কম হবে। বন্যাদুর্গত অঞ্চল বাদে অন্যান্য অঞ্চলে এ বছর আমনের ফলন বেশ ভালো হয়েছে।

আগামী বোরো মৌসুমের উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বছর বোরোতে ২ কোটি ৫ লাখ টন ধানের ফলন উৎপাদনে লক্ষ্য হাতে নিয়েছে। এর জন্য আমরা ২ লাখ হেক্টর জমিতে বেশি হাইব্রিড আবাদ করব। দুই লাখ হেক্টর জমি বেশি আবাদ মানে ২ লাখ টন ফলন এমনি বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ৭৬ কোটির একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যা থেকে আমরা কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের বীজ দেব।

রবিশস্য নিয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক জানান, করোনা, বন্যা এবং আম্পান ঝড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫১টি জেলা রয়েছে। এ সকল জেলায় আমরা পুনর্বাসন ও প্রণোদনা কর্মসূচি দিয়েছি। পুনর্বাসন কর্মসূচিতে বোরোকে রাখা হয়নি। বোরো ছাড়া রবিশস্যের জন্য আমরা ভুট্টা, গম, সরিষা, পেঁয়াজ ও ডালসহ সকল ধরনের বীজ ও সার দিয়ে কৃষকদেরকে সহায়তা দিচ্ছি। অন্যদিকে প্রণোদনা কর্মসূচিতে বোরোসহ সব ফসলকে রাখা হয়েছে।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী আরও জানা যায়, প্রতিবছর দেশের মোট উৎপাদিত চালের অর্ধেকেরও বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে। চলতি অর্থবছরে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ৫ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টন। এর মধ্যে ১১ লাখ ৪ হাজার ৬৩০ হেক্টর জমিতে ৫৪ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০ টন হাইব্রিড জাতের বোরো, ৩৬ লাখ ৫৩ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫০ লাখ ২১ হাজার ৭০০ টন উফশী জাতের বোরো এবং ২৬ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমিতে ৫২ হাজার টন দেশি জাতের বোরো উৎপাদনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

রবিশস্যের বিষয়ে হর্টিকালচার উইংয়ের পরিচালক মো. কবির হোসেন বলেন, দেশের মধ্যে যে অঞ্চলে যে ফসল ভালো হয় সেখানে সে ফসল চাষের ব্যাপারে আমরা জোর দিচ্ছি। যেখানে সরিষা ভালো হয় সেখানে সরিষা দিচ্ছি, যেখানে আলু ভালো হয় সেখানে আলু চাষে জোর দিচ্ছি। কিছু এলাকা সূর্যমুখী ও ডাল জাতীয় ফসল চাষের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করছি। বিশেষ করে বেশি জোর দিচ্ছি মাষকলাই চাষের ক্ষেত্রে। কারণ এটি অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে যায়। পরে সেখানে বোরো ধান আবাদ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে পাতা জাতীয় যে সকল শাক-সবজি রয়েছে, যেমন লাল শাক পালং শাকসহ বিভিন্ন শাক-সবজি চাষের বিষয়ে বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। পাশাপাশি পারিবারিক পুষ্টি বাগানের মাধ্যমে আমরা রাজস্ব খাতের আওতায় প্রত্যেক উপজেলায় সম্ভাবনাময় ফসলের সঙ্গে পেয়ারা, লেবুসহ বিভিন্ন জাতের তিন চারটি করে চারাও দিচ্ছি।

পেঁয়াজের উৎপাদন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বছর বীজ থেকে পেঁয়াজের যে চারা উৎপাদন হয় সেটার বিষয়ে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও যেসব অঞ্চলে পেঁয়াজের বীজ পাওয়া যায় সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে চারা উৎপাদন করে তা কৃষকদের মাঝে বিতরণ করছি। রবিশস্য অনেক সময় বৃষ্টির কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য কিছু কিছু অঞ্চলে আমরা গম, ভুট্টা জাতীয় ফসল আবাদে জোর দিচ্ছি। সরকার কৃষকদের কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি জানান, কৃষকদের আমরা বীজ, সার ও পরিচর্যার জন্য কিছু টাকা দিচ্ছি। সেটা জমির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এবারের আবহাওয়া রবি ফসলের জন্য উপযোগী। কারণ চার দফা বন্যায় কৃষকের জমিতে ফেলে গেছে পলি মাটির স্তর। আর এই পলির স্তরের জন্য এ বছর রবিশস্যের আবাদ ভালো হবে এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা করা করছেন তারা।

সরেজমিন উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ রবি মৌসুমে ৫৮৮৭৩৭ হেক্টর জমিতে ৭.৯৯৮ লাখ টন সরিষা, ২৪৯৯৪০ হেক্টর জমিতে ২৯.৪৬৮ লাখ টন পেঁয়াজ, ৩৫৫৩৬৪ হেক্টর জমিতে ১২.৯৮৮ লাখ টন গম, ৪৭১৫৪৭ হেক্টর জমিতে ৪৮.৮৭২ লাখ টন ভুট্টা, ৩৭৪০০ হেক্টর জমিতে ৭.০৫০ লাখ টন মিষ্টি আলু, ৪৬৮৫২৬ হেক্টর জমিতে ১১৩.৭১০ লাখ টন গোল আলু, ৫৮২৯৬২ হেক্টর জমিতে ১৩৬.৬৫৭ লাখ টন শাক-সবজি, ৬২৬১৯ হেক্টর জমিতে ০.৭১৩ লাখ টন মাষকালাইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার সোনাতলার কৃষক শফিকুল আলম জানান, করোনা ও আম্পানের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই রবিশস্য চাষ করছি।

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার কৃষক জনি ম-ল জানান, এ বছর বন্যায় ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা রবিশস্য চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

advertisement
Evaly
advertisement