advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

যুক্তরাষ্ট্রে মানবপাচারের রুট পেরু-ব্রাজিল

হাসান আল জাভেদ
৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:২৫
পুরানো ছবি
advertisement

লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে বসে মানবপাচার সিন্ডিকেট গড়ার অভিযোগে দেশটিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮ বাংলাদেশি। ব্রাজিলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশকে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজন আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের গডফাদার। দুজনের নামই সাইফুল ইসলাম। একজনের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, অন্যজনের বাড়ি কুমিল্লায়। বাকি ছয় কারাবন্দি মানবপাচারকারী ওই দুই গডফাদারের সহযোগী।

এদিকে আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও মাদকপাচারকারী চক্রের গডফাদারসহ চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনতে এখন ব্রাজিলে বিশেষ অভিযান চলছে। এই অভিযানে বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ ৩২টি দেশের পুলিশ সংস্থার মানবপাচার-মাদকপাচার প্রতিরোধ ও তদন্তে প্রশিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল বর্তমানে ব্রাজিলে অবস্থান করছে। তারা ব্রাজিল পুলিশের সহায়তায় কারাবন্দি বাংলাদেশি ৮ মানবপাচারকারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। এই দলটি মানবপাচারে বাংলাদেশি আরও কারা জড়িত এবং মানবপাচারের রুট ও কৌশল সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া পাচারের শিকার হয়ে ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বক্তব্যও নিয়েছে সিআইডি।

সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ টিমের একজন কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় জনশক্তি রপ্তানির কথা বলে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রটি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা বা ঢাকায় কয়েকটি ট্র্যাভেল এজেন্সির মাধ্যমে তরুণ-যুবকদের ফাঁদে ফেলছে। উচ্চ বেতনের আশ্বাস দিয়ে মানবপাচারের শিকার প্রত্যেকের কাছ থেকে ১২-১৩ লাখ টাকা আদায় করেছে চক্রটি।

পাচারের রুট : বিদেশ গমনের স্বপ্ন দেখা এসব তরুণকে পাসপোর্ট সংগ্রহের পর প্রথমে ট্যুরিস্ট ভিসায় নিজস্ব খরচে ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় নিয়ে যায়। পরে তারা আবার বাংলাদেশে ফেরত আসে। পাসপোর্টে এসব দেশের ইমিগ্রেশনের সিল থাকার সুবিধা নিয়ে তারা বাংলাদেশ থেকে লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুতে ভ্রমণ ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি ১৯ জনের এমন একটি ভুক্তভোগী দল ভ্রমণ ভিসায় বিমানযোগে পেরুর রাজধানী লিমায় পৌঁছায়। সেখানে চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে কয়েকদিন অবস্থান করে। পরে রাতের আঁধারে দলটি পেরু সীমান্ত পেরিয়ে ব্রাজিলে অনুপ্রবেশ করে। সেখান থেকে দুর্গম বন-জঙ্গল, নদী পেরিয়ে লোকালয়ে পৌঁছার পর বাসযোগে সাও পাওলো, ব্রাসিলিয়া বা রিও ডি জেনেরিও শহরে যায়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার সৈয়দা জান্নাত আরা বলেন, ১৯ জনের দলটি পেরু-ব্রাজিল হয়ে এভাবে যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছার সুযোগ পেলেও তাদের মধ্যে তিনজন সে দেশের সীমান্ত পুলিশের হাতে আটক হন। পরে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

ব্রাজিলে পৌঁছানো বাংলাদেশিদের মূল টার্গেট যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় পাড়ি দেওয়া। এক্ষেত্রে পাচারকারী দলের সহায়তা বা নির্দেশনায় ব্রাজিল থেকে কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া, গুয়েতেমালা, মেক্সিকো- এই চারটি দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশের শেষ চেষ্টা করতে হয় বাংলাদেশিদের। অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে তুলনামূলক পিছিয়ে থাকায় দক্ষিণ আমেরিকার এসব দেশ মানবপাচার বা মাদকপাচারের বিষয়ে উদাসীন। এ কারণে স্থানীয় দালালদের ম্যানেজ করে সহজেই যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত পৌঁছানো সম্ভব হয় পাচারের শিকার ব্যক্তিদের।

সিআইডির মানবপাচার প্রতিরোধ টিমের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের গ্রাম পর্যায় থেকে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা গমনেচ্ছুদের বিভিন্ন আশ্বাসের ফাঁদে ফেলে বিশাল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ব্রাজিল পাঠানো হয়। এরপর প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যারা যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি হন না তারা ব্রাজিলের সাও পাওলো, ব্রাসিলিয়া বা রিও ডি জেনেরিও শহরেই থেকে যান।

সিআইডি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ব্রাজিল পুলিশ তাদের তথ্য দিয়েছে সাও পাওলো শহরে বর্তমানে দেড় হাজার বাংলাদেশি অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। ব্রাসিলিয়া, রিও ডি জেনেরিও ছাড়াও আরও কিছু শহরে কয়েক হাজার বাংলাদেশি অবস্থান করছেন। ব্রাজিলে রাজনৈতিক আশ্রয় তুলনামূলক সহজ হওয়ায় সেখানে ইতোমধ্যে অনেকেই এ সুবিধা নিয়েছেন। এই আশ্রয়প্রার্থীদের বেশির ভাগই সেখানে টেইলারিং ব্যবসা করছেন। তারাও একসময় মানবপাচারের শিকার হয়ে সেখানে গেছেন। তবে সম্প্রতি ব্রাজিলের স্থানীয় মুদ্রার (রিয়েল) মান ডলারের তুলনায় অনেক কমে যাওয়ায় তাদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আগে এক রিয়েল সমান বাংলাদেশি ৫০-৬০ টাকা ছিল, এখন তা ১৬.৫০ টাকায় নেমে এসেছে। তারপরও ভিটেমাটি বিক্রি করে অবৈধ উপায়ে দেশ ত্যাগ করা এই বাংলাদেশিরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ব্রাজিলেই থাকতে চান।

কারাবন্দি গডফাদার ও আশ্রয়প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বাংলাদেশ পুলিশ জানতে পেরেছে, পেরু-ব্রাজিল রুট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম গডফাদার জয়নাল আবেদীন নামে একজন বাংলাদেশি। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়নাল আবেদীন একসময় নিজেও অবৈধ পথে ব্রাজিল যান। সেখানে তিনি একপর্যায়ে দ্রুত অর্থকড়ি আয়ের পথ হিসেবে মানবপাচারের সিন্ডিকেটে জড়ান। তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ব্রাজিলেই বাস করছেন। মানবপাচারের টাকায় সেখানে তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন।

সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, যারা এভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় পৌঁছান এক শ্রেণির বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন আইনজীবী তাদের সেসব দেশে জাল কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ করে দেন। এজন্য আইনজীবীদের দিতে হয় বাংলাদেশি মুদ্রায় আরও ২০-৩০ লাখ টাকা। এক্ষেত্রে বেশির ভাগের আবেদনই তথ্য-প্রমাণের সত্যতা না থাকায় বাতিল হয়ে যায়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার অনুপ্রবেশের বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

মানবপাচার দমনে ব্রাজিল সরকারের সঙ্গে চুক্তির আওতায় সে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোয় কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডার পুলিশ অন্য দেশের পাসপোর্ট যাচাই করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে মাদকদ্রব্য উৎপাদন ও পাচারের ক্ষেত্রে শীর্ষ দেশ কলম্বিয়া থেকে মানবপাচারকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে মাদকপাচারের বিষয়েও উদ্বেগে আছে যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রাজিলে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জুলফিকার রহমান আমাদের সময়কে বলেন, মাদক ও মানবপাচার নিয়ে বিশেষ অপারেশন বা বাংলাদেশ পুলিশের অংশগ্রহণের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে মানবপাচার ও মাদকপাচার ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকায় ব্রাজিল ছাড়াও আমেরিকার দেশগুলো এ নিয়ে উদ্বেগে আছে। আমরাও চাচ্ছি বাংলাদেশিরা যাতে মানবপাচারের শিকার না হন।

 

advertisement
Evaly
advertisement