advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মুক্তিযুদ্ধে গারো সম্প্রদায়
শাড়ির আঁচলের সুতায় মুক্তিযোদ্ধার ক্ষত সেলাই করি

লাবণ্য লিপি
৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ১০:২৩
সন্ধ্যা রানী সাংমা। পুরোনো ছবি
advertisement

বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণের সঙ্গে আদিবাসী সম্প্রদায়েরও ছিল উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। বাদ যায়নি গারো সম্প্রদায়ও। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে তারাও বীরের বেশে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। সম্প্রতি নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার গারো অধ্যুষিত এলাকা ঘুরে এসে মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বপূর্ণ স্মৃতিকথা তুলে ধরেছেন লাবণ্য লিপি

গহিন বনের মধ্য দিয়ে হিংস্র জীবজন্তুর ভয় উপেক্ষা করে যে শিশু স্কুলে যেতে পারে, সে যে পরবর্তী সময়ে যে কোনো ভয়কে জয় করতে পারবে, এরই প্রমাণ দিয়েছিলেন সন্ধ্যা রানী সাংমা। তিনি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অকুতোভয় যোদ্ধা। একাত্তরে যুদ্ধের সময় তিনি সেবিকার দায়িত্ব পালন করেন। অস্থায়ী হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেছেন। অংশ নিয়েছেন দুঃসাহসিক অপারেশনেও। একাত্তরের সেই দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতাই শোনালেন সন্ধ্যা রানী।

“আমার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুরে। আমি ছিলাম আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তখনকার দিনে মেয়েরা তেমন লেখাপড়া করত না। আমাদের আদিবাসীদের মধ্যে এ রেওয়াজ ছিল আরও কম। কিন্তু আমার বাবা বলল, আমার মেয়েকে আমি লেখাপড়া শেখাব। সে শিক্ষিত হয়ে কাজ করবে। আমাকে ভর্তি করে দিলেন জলছত্র মিশনারি স্কুলে। গহিন বনের মধ্য দিয়ে আমি স্কুলে যেতাম। সেসব জায়গায় অনেক ভয়ঙ্কর জন্তু জানোয়ারও ছিল। কিন্তু আমি সেগুলো ভয় পেতাম না। কারণ লেখাপড়ার নেশায় আমার সব ভয় তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে প্রাথমিক পাস করে আমি পাশের গ্রাম ভুটিয়ায় একটা হাইস্কুলে ভর্তি হই। সেখানে কৃতিত্বের সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি পাস করে সেই স্কুলেই শিক্ষকতা শুরু করি। কিন্তু আমার আরও লেখাপড়ার ইচ্ছা ছিল। তাই হালুয়াঘাটের একটা নার্সিং স্কুলে ভর্তি হই। সঙ্গে আমার খুড়তুতো বড় দিদি ভেরুনিকা সাংমাও ভর্তি হয়। আমরা নার্সিং হোস্টেলে থাকতাম। প্রথমবর্ষ পাস করে কেবল দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছি, তখনই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। শুরু হলো পাঞ্জাবিদের নির্যাতন, অত্যাচার, হত্যা। আমার বয়স তখন ১৭ বছর। ওই বয়সী মেয়েদের তো তখন ভয় আরও বেশি। দিদিরও তাই।

যুদ্ধের জন্য হোস্টেল বন্ধ হয়ে গেল। সবাই বাড়ি চলে গেল। কিন্তু আমরা দুই বোন যেতে পারলাম না। কারণ আমাদের পথ নিরাপদ ছিল না। তখন আমার এক দাদা খগেন্দ্র সাংমা ও জ্ঞানেন্দ্র মারাক এ দুজন আমাদের দুই বোনকে নিয়ে ভারতের দিকে রওনা করেন। পথে কত যে কষ্ট হয়েছিল। বারবার রাজাকার, আল বদররা আক্রমণ করেছিল। এই দুই দাদাই আমাদের রক্ষা করেন। অবশেষে আমরা গিয়ে পৌঁছলাম ভারতের মহেন্দ্রগঞ্জ থানার তিন মাইল উত্তরে চাপাহাতি গ্রামে। সেখানে আমার এক জেঠুর বাড়িতে আশ্রয় নিই। আমাদের সেখানে রেখে দাদারা দেশে ফিরে যান। সেখানেই পরিচয় হয় ডাক্তার প্রেমাঙ্কর রায়ের সঙ্গে। আমাদের নার্সের ট্রেনিং আছে শুনে উনিই আমাদের ‘১১ নম্বর সেক্টর ফিল্ড হাসপাতালে’ নিয়ে যান। দেখলাম, ছনের ছাউনি দেওয়া বাঁশের বেড়ার একটা হাসপাতাল করা হয়েছে। আসবাবপত্রও সব বাঁশের। আমরা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতে শুরু করলাম। মহিলা নার্স সেখানে ছিল না। আমরাই দুই বোন গেলাম। তবে কয়েকজন পুরুষ সেবকের কথা মনে আছে। বেলাল উদ্দিন আহমেদ, মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ, ধনঞ্জয়, গগন, সিদ্দিক প্রমুখ। চিকিৎসক ছিলেন ডা. প্রেমাঙ্কর রায়, ডা. নজরুল এবং আরও কয়েকজন। একজন সাংবাদিক ছিলেন। নাম হারুন হাবিব।

কয়েক দিন পর সিদ্ধান্ত হয় আমাদেরও মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে অপারেশনে যেতে হবে। তখন আমাদেরও সেনাবাহিনীর সঙ্গে ট্রেনিং নিতে হয় লুঙ্গি, গেঞ্জি আর গামছা পরে। তার পরই আমরা যাই সেই লোমহর্ষক অভিযানে। ভাঙা কামালপুর নামে একটা জায়গা ছিল। সেখানে ছিল পাঞ্জাবিদের ঘাঁটি। আমরা গেলাম ওদের আক্রমণ করতে। আমাদের দলে ছিল ৪০ জন ভারতীয় সৈনিক, ১০-১২ জনের মতো মুক্তিযোদ্ধা ও আমরা দুই বোন। একটা বিশাল বাঙ্কার থেকে ওরা গুলি ছুড়ছিল। সে আক্রমণের মুখে আমাদের দলের সবাই মারা গেল। আমরা একটু দূরে নিচু হয়ে কোনো রকমে প্রাণ বাঁচালাম। গোলাগুলি থামলে আমরা উঠে দেখলাম আমাদের দলের একজন মানুষ একটু নড়ছে। দিদি আর আমি কাছে গিয়ে দেখি তিনি ভীষণভাবে আহত। পিঠে গুলি লেগে মাংস বের হয়ে গেছে। চামড়া ঝুলছে। মাথা ফেটে মগজ বের হয়েছে। দিদি বললেন, আমি ওনাকে ধরছি। তুই ফাটা জায়গা দিয়ে মগজ ভেতরে ঢুকিয়ে দে। আমি দিলাম। তারপর ওখান থেকেই কুড়িয়ে একটা ঔষধি গাছের পাতার রস দিয়ে দিই ক্ষতে। আমাদের পরনে ছিল সেবিকার পোশাক। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তার মাথা ব্যান্ডেজ করে দিই। কিন্তু চামড়া তো সেলাই করতে হবে। কিন্তু আমাদের কাছে তো সুই সুতা কিছুই নেই। আবার আমরা আমাদের পরনের কাপড়ই কাজে লাগাই। দিদি বলল, সন্ধ্যা গাছের চিকন ডাল ভেঙে সুচালো কর। আর চিকন করে শাড়ি ছিঁড়ে পাকিয়ে সুতা বানা। সেই সুই সুতা দিয়ে সেলাই করি আমরা। পরে তাকে গোহাটি হাসপাতালে পাঠানো হয় চিকিৎসার জন্য। তারপর উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় লন্ডনে। সেখান থেকে ২২ বছর পর তিনি দেশে ফিরে আমার দিদির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু ৭৩ সালে বিয়ে করে আমি নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চলে আসায় আমার সঙ্গে আর দেখা হয়নি।

সেই ঘটনার পর হাসপাতালে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে গেল। সবাই বলল, এরা সত্যিই ভালো নার্সিং জানে। না হলে এমন আহতকে বাঁচাতে পারত না। আমরা সেই অস্থায়ী হাসপাতালেই কাজ করতে থাকি। আহতদের সেবা করি, অপারেশনে সহযোগিতা করি। শত্রুদের ভয়ে আমরা হাসপাতালটা আড়াল করতাম। আলো ছিল না। টর্চলাইট আর হারিকেনের আলোয় অপারেশন হতো। ছুরি কাঁচি ছিল না। কাঁথা সেলাইয়ের সুই সুতা, চুল কাটার সাধারণ কাঁচি গরম পানিতে ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করে আমরা কাজ চালিয়েছি। অথচ ঈশ^রের কৃপায় সেখানে একজন আহত মানুষও মারা যাননি।

ডিসেম্বরের প্রথম দিকে আমরা দেশে রওনা হলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন ডাক্তার, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধারা। রাস্তায় অনেক কষ্ট হয়েছে। শেরপুরে পৌঁছে সেখানে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে আমরা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করি। সেখান থেকে যাই বকশিগঞ্জে। সেখানে একটা ঘটনা ঘটেছিল। রাজাকাররা আমাদের খবর জানতে পেরে শেল নিক্ষেপ করে। কপাল ভালো ছিল আমরা বেঁচে যাই। সেখান থেকে আমরা যাই জামালপুর সরকারি হাসপাতালে। সেখানেও আমরা আহতদের কয়েক দিন সেবা দিই। তার পরই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ঘোষণা হলো। ওই দিনই আমাদের বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। ক্যাপ্টেন মান্নান ও তার স্ত্রী এবং দুলাল উদ্দিন আহমেদ আমাদের জিপ গাড়ি দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। আমার চাচা ভেরেনিকা দিদির বাবা বিশ্বনাথ মারাক, তার হাতে আমাদের তুলে দেন। ‘আমি আমার দুই মেয়েকে বুঝে পেয়েছি’ এই বন্ডে সই করে চাচা আমাদের বুঝে নিলেন। পরে ডাকযোগে জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীর স্বাক্ষর করা মুক্তিযোদ্ধার সনদ এবং ডাক্তার প্রেমাঙ্কর রায়ের স্বাক্ষর করা সেবিকার সনদ আমাদের পাঠানো হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমি গেলাম আমাদের বাড়িতে। গিয়ে শুনলাম আমার বাড়ির লোকেরা ধরেই নিয়েছিল আমি মারা গেছি। এটা ভেবে আমার বাবা জলছত্রী মিশনে গিয়ে ফাদারকে ৩০ টাকা দিয়ে কালোমিশা করান আমার আত্মার শান্তি জন্য। তারা তো আমাকে পেয়ে ভীষণ আনন্দিত হলেন।

আমি কাজ করেছি দেশের স্বাধীনতার জন্য। বিনিময়ে কিছু পাওয়ার জন্য নয়। যুদ্ধের পর অনেক দিন কেউ আমাদের খবর নেয়নি। পরে ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারে। অনেক সম্মাননা আমি পেয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় সম্মাননা আমি পাব দেশটা সোনার বাংলা হলে। বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই সোনার বাংলা হলে। বয়স হয়েছে। আমরা তো চলে যাব। কিন্তু এ দায়িত্ব আমি দিয়ে যেতে চাই তরুণ প্রজন্মকে। তোমরা এ দেশটাকে ভালো রেখ। আর যেন কোনো রাজাকার, আলবদর এ দেশে জন্ম নিতে না পারে। জঙ্গিবাদ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।”

 

 

 

 

 

 

advertisement
Evaly
advertisement