advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ভাসানচরে রোহিঙ্গারা : উত্তর নেই যেসব প্রশ্নের

ড. কাজল রশীদ শাহীন
৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ১৪:২৯
জাহাজে চড়ে ভাসানচরে আসছেন রোহিঙ্গারা
advertisement

ভাসানচরে শুরু হয়েছে রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়া। একই সঙ্গে জন্ম হয়েছে কতিপয় প্রশ্নের। তর্ক-বিতর্কের আড়ালে ¤্রয়িমাণ হচ্ছে কিংবা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে উত্থিত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রক্রিয়া। এই লেখায় সেসব প্রসঙ্গ ও প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার চেষ্টা জারি রাখা হবে। তার আগে দেখে নেওয়া যাক, রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা-বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় বারো লাখ কিংবা তারও অধিকসংখ্যক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় অধিবাসীরা এখন হয়ে পড়েছেন নিজ দেশে পরবাসীমতো। তারা এখন শুধু সংখ্যালঘু নয়, কর্মপ্রাপ্তির ক্ষেত্রেও শিকার হচ্ছেন চরম বৈষম্যের। রোহিঙ্গারা যেহেতু শরণার্থী এবং আশ্রয় ক্যাম্পের বাসিন্দা সেহেতু নানারকমের সুযোগ-সুবিধা তাদের জন্য নির্ধারিত ও বরাদ্দ রয়েছে। তাদের এই প্রাপ্তি প্রতুল না হলেও জীবনধারণ ও বেঁচে থাকার জন্য চলনসই। অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় তারা প্রতিদিনের প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না তাদের সঙ্গে। ফলে রোহিঙ্গারা শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি নয়, স্থানীয় মানুষদের কাছেও হয়ে উঠছে বোঝা ও বেদনার কারণ। এ ছাড়া পর্যটন জেলা কক্সবাজারের শ্রীও এসব কারণে ক্রমেই হয়ে পড়ছে লুপ্ত ও বিবর্ণ। এতদ্বিধ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় সরকার রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের প্রক্রিয়ার দিকটা বিবেচনায় আনে, যার অংশ হিসেবে ভাসানচরে স্থাপিত হয়েছে আশ্রয়ণ-৩ নামের আবাসন।

নৌবাহিনীর কমোডর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী ভাসানচর আবাসন প্রকল্পের পরিচালক। তার উদ্ধৃতিতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, প্রথমাবস্থায় এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের পর চাইলে দশ লাখ রোহিঙ্গাকেই সেখানে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। কারণ সেখানে সেই পরিমাণ ভূমি রয়েছে। বলা হচ্ছে, ভাসানচর দ্বীপটি ১৩ হাজার একর। এর মধ্যে এক হাজার ৭০০ একর জমির ওপর বাঁধ দিয়ে গুচ্ছগ্রাম ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে ৪৩২ একরের ওপর এবং নৌবাহিনীর ফরওয়ার্ড বেইজের জন্য নির্ধারিত হয়েছে ৩৫২ একর জমি।

জেনে নেওয়া যাক, ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গারা কী কী সুবিধার আওতায় আসছেন। ১২০টি গুচ্ছগ্রামে বসতঘর রয়েছে এক হাজার ৪৪০টি। ১২টি গৃহ, গৃহপ্রতি ১৬টি কক্ষ এবং কক্ষপ্রতি চারজনের থাকার সুবিধা রয়েছে প্রতিটি গুচ্ছগ্রামে। রান্নাঘর, পানীয় জলের সুবিধা ও নারী-পুরুষের জন্য পৃথক শৌচাগার যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ৩টি মসজিদ, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ২টি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। এমনকি নিকটবর্তী হাতিয়া উপজেলায় গিয়ে চিকিৎসার সুযোগও রাখা হয়েছে। মোট কথা আধুনিক ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য যে রকম ও যত রকমের সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার তার সবটার বন্দোবস্ত করা হয়েছে ভাসানচরে। বরং বাইরের জীবনযাপনে সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি নানাবিধ সমস্যা-সংকট ও হ্যাপার উপস্থিতি প্রবলভাবেই বিদ্যমান থাকে। কিন্তু এখানে তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ যদি যেসব কার্যক্রম গ্রহণ-বাস্তবায়ন ও চলমান রাখা যায়।

নিরাপত্তার প্রসঙ্গটিও দেখা হয়েছে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ শুধু তো রোহিঙ্গারা নয়, এখানে নৌবাহিনীর সদস্য, পুলিশ বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। মানুষের জীবনযাপনের জন্য মৌলিক যে কটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ববহ ও অবশ্যম্ভাবী তার সবটাই রাখা হয়েছে ভাসানচরে। শিশুদের খেলাধুলা-শরীরচর্চার বিষয়টাও বাদ যায়নি গৃহীত এই প্যাকেজ প্রকল্পে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরানুযায়ী, ভাসানচরের এই আবাসন ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে, শরণার্থীদের জ্ঞাত ইতিহাসে বিরল নয়, শুধু কল্পনাতীতও বটে। পৃথিবীর কোথাও কখনই শরণার্থীদের জন্য এমন বন্দোবস্ত করা হয়নি। এমন সুযোগ-সুবিধার জীবন শরণার্থীরা কস্মিনকালেও কল্পনা করতে পারেননি।

প্রশ্ন হলো, এত সুযোগ-সুবিধার পরও ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়ে কেন এই তর্ক-বিতর্ক। কেন কতিপয় প্রশ্নের উত্তর নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। কেন তর্ক-বিতর্কগুলো অবসানের লক্ষ্যে শক্তিশালী ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। প্রশ্নের ডালপালা যদি এভাবে ছড়াতে থাকে এবং ক্রমেই বিস্তর ও বিস্তার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় তা হলে পুরো প্রকল্পটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে। তখন অভিপ্রায়গুলো যতই মানবিক ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নেওয়া হোক না কেন, তাতে কার্যকর ফল লাভ বিঘ্নিত হবে না শুধু ‘হিতে বিপরীত’ হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রও তৈরি হবে। তাই তর্ক-বিতর্কের অবসান করা যদি দুরূহ হয় তা হলে প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্তত দেওয়া প্রয়োজন। তা হলে কিছু তর্ক-বিতর্কের সুরাহা শুধু হবে না, উপরন্তু বিষয়টা সম্পর্কে সবার মাঝে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এখন দেখে নেওয়া যাক সেসব প্রশ্ন কী এবং কতটা মৌলিক ও যুক্তিযুক্ত।

এক. ভাসানচরে এই আবাসন প্রকল্প গ্রহণের উদ্দেশ্য কী শুধু কক্সবাজারকে বাঁচানো ও রক্ষার উদ্দেশ্যে, নাকি অন্যকিছু। কেনই বা এত সুযোগ-সুবিধার বহর দিয়ে তাদের এখানে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলো? ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের এই প্রক্রিয়ায় আনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সরকার মূলত কী বার্তা দিতে চায় বিশ্বকে? এই বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। আমরা কি তা হলে রোহিঙ্গাদের এক প্রকারে স্থায়ী শরণার্থী হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছি? তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে ক্রমেই পিছু হটছি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি।

দুই. রোহিঙ্গারা এ দেশে আসার পর তাদের ফেরত পাঠাতে আমরা কতটুকু চাপ প্রয়োগ করতে পারলাম, আর আমাদের বন্ধু দেশগুলোই বা কতটুকু ভূমিকা পালন করল আমাদের পক্ষে? যদি না করে থাকে তা হলে কেন করল না, তা হলে বন্ধুত্বের নিক্তিতে তাদের ভূমিকাকে আমরা কী হিসেবে চিহ্নিত করব? বন্ধুত্বের সংজ্ঞা কী, বন্ধুত্ব মানেই কি একপাক্ষিক নাকি দ্বিপাক্ষিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে বহুমাত্রিকও। কিন্তু আমরা কেন কোনোমাত্রাই ছুঁতে পারলাম না।

তিন. এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম ও অনপেক্ষণীয়। আবার দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান তদ্রƒপ। অর্থাৎ আয়তনিকভাবে ছোট হলেও ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিশ্বে-এশিয়ায় এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের রয়েছে সবিশেষ গুরুত্ব। কিন্তু সেটাকে যতটা নিজেদের অধিকার আদায়ে ও স্বার্থরক্ষায় প্রয়োগ করা দরকার এবং কূটনৈতিক পরিম-লে চর্চিত হওয়ার দরকার সেটা অজ্ঞাত কারণে উচ্চকিত যেমন নন, তেমনি প্রবলভাবে সচেষ্টও নন। ফলে যেসব রাষ্ট্র আমাদের বন্ধুপ্রতিম তারা কোনো প্রকার অগ্নিপরীক্ষা ব্যতিরেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজেদের স্বার্থটাকেই জিইয়ে রেখেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-আমেরিকা-ভারত-চীন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যাকে পুঁজি করে মিয়ানমারের সঙ্গে নিজেদের বাণিজ্যিক ও আধিপত্যবাদের সুবিধাবাদকে লাভজনক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার দরকষাকষিই করেছে। তাদের বিবেচনায় ‘বাংলাদেশ’ কতটুকু ছিল এবং রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আন্তরিকতা আদৌ ছিল কিনা সেটা যৌক্তিক ও অনিবার্য এক প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। তাদের এই আপন স্বার্থসিদ্ধির প্রয়াস ও প্রচেষ্টা প্রকারান্তরে আমাদেরই ব্যর্থতা কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর তালাশ করা প্রয়োজন।

চার. দুঃখজনক হলেও সত্যি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যেতে পারে কোনো সর্বজনসম্মত রূপরেখা গ্রহণ করা হয়নি আজ অবধি? আমরা এই নিয়ে একটা জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সেমিনার পর্যন্ত করতে পারিনি। অথচ তেমনটা হলে একটা রূপরেখা অন্তত দাঁড় করানো যেত। রোহিঙ্গা সমস্যায় যা কিছু হচ্ছে সবই সরকারি পর্যায়ে এবং সেটাও সুস্পষ্টভাবে কেউই জানে না। এই সমস্যার একটা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনাও আমলে নেওয়া প্রয়োজন। রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতি সবকিছুরই যেমন নিজস্ব একটা মত ও পথ রয়েছে, তেমনি তার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিকে যোগ করারও প্রয়োজন রয়েছে। এমনটা হলে সেটা আর একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আবদ্ধ না থেকে সর্বজনীন রূপ পরিগ্রহ করার অবকাশ পায়।

পাঁচ. ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর করার প্রক্রিয়া হিসেবে ইতোমধ্যে দেড় হাজারের মতো রোহিঙ্গা সেখানে পৌঁছেছে। প্রথম ধাপের এই প্রচেষ্টা সফল হলে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে তা আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি। প্রশ্ন হলো, আমাদের মনোযোগ কি তা হলে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পরিবর্তে ভাসানচরে স্থানান্তরের দিকে গুরুত্ব পাচ্ছে? স্থানান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব তর্ক-বিতর্ক হাজির নাজেল হয়েছে, তা কি আমরা চাইলে এড়াতে পারতাম কিংবা কমানো যেত? জাতিসংঘকেই কেন বা আমরা আস্থায় নিতে পারলাম না, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ নিয়েও কি একটা সেমিনার করা যেত, নিদেনপক্ষে একটা প্রেস কনফারেন্স। উদ্দেশ্য যদি মানবিক-নৈতিক ও যুক্তিগ্রাহ্য হয় তা হলে তা নিয়ে ঢাক ঢাক গুড় গুড় কিংবা অযথা তর্ক-বিতর্কের সুযোগ কেন দেব?

ভাসানচরে রোহিঙ্গা স্থানান্তর নিয়ে সরকারের প্রয়াস ও প্রচেষ্টা যেখানে সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য, শরণার্থীদের মানবিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূমিকা ও কর্তব্যবোধ যেখানে বিশ্বের কাছে তারিফ পাওয়ার নজির, সেখানে তর্ক-বিতর্ক হয়ে উঠছে মুখ্য ও প্রধান আলোচ্য। কেন প্রাসঙ্গিকতার চেয়ে পার্শ্ব প্রসঙ্গ, কেন লক্ষ্যের চেয়ে উপলক্ষ বেশিজনে ও ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসছে, সেসব প্রশ্নের সুলুকসন্ধান যেমন অপরিহার্য তেমনি উত্তর নেই যেসব প্রশ্নের, তার উত্তর খোঁজা জরুরি। তা না হলে, মানবিকতার দায় মেটাতে গিয়ে আমাদের মাসুল গুনতে হতে পারে এত ও এমন কিছু যা উসুল হওয়া সম্ভব তো নয়ই-অচিন্তনীয়ও বৈকি।

ড. কাজল রশীদ শাহীন : সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

advertisement
Evaly
advertisement