advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

হাওলাদার মাকসুদ
বিদ্যুৎ সুবিধায় স্বনির্ভর বাংলাদেশ

৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ৪ ডিসেম্বর ২০২০ ২৩:৫৭
advertisement

সুইচ টিপলে মুহূর্তে জ্বলে ওঠে আলো, অবিরাম চলতে থাকে যান্ত্রিকবিশ্ব। এই জ্বলে ওঠা ও চলৎশক্তির অন্তর্নিহিত রহস্যের নাম বিদ্যুৎ। আধুনিক মানবসভ্যতার বিনির্মাণ ও বিকাশে বিদ্যুতের ভূমিকা অতুলনীয়। বিদ্যুৎ ছাড়া মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য প্রায় অসম্ভব। বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। এ চাহিদা পূরণে ক্রমাগত বেড়ে চলছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নানা বিজ্ঞানমুখী প্রচেষ্টা। তেল-গ্যাস-কয়লার মতো জ্বালানি পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বাতাসের প্রবাহ, নদীর খরস্রােত, সৌরশক্তি ও পারমাণবিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিজ্ঞানীরা অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করেছেন।

‘লাল-লাল, নীল-নীল বাত্তি দেইখা নয়ন জুড়াইছে/ঢাকার শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে। আশির দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের এই বিখ্যাত গানটির কথা আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি। আলো-ঝলমল শহরের প্রতি তীব্র আকর্ষণের কথা এই গানের মধ্যে ফুটে উঠেছে। বিদ্যুৎ ছাড়া শহর গড়ার স্বপ্ন অবাস্তব। আজকের বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রাম ও শহরের পার্থক্যহীন বাস্তবতা সৃষ্টি করে দিয়েছে বিদ্যুৎ। যেখানে বিদ্যুৎ, সেখানেই আলো, আধুনিকতা ও উন্নতি। বিশ্বকে চমকে দেওয়া বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক উন্নতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনের নেপথ্যে বিদ্যুতের ভূমিকা অগ্রগণ্য।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় মাত্র ২১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ওপর ভর করে পাক-ভূখ-ের যাত্রা শুরু। তার পর সীমাহীন দুর্ভোগ ও সুদীর্ঘ রক্তস্নাত বন্ধুর পথ অতিক্রম করে পরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে অর্জিত হয় বাঙালির কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশকে সুখীসমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার কাজে বিভোর হয়ে ওঠেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সাধ্যমতো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন জাতির এ অবিসংবাদিত নেতা। ফলে ১৯৭২ সালে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ খাতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর থেকে সে দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়। ’৭৫ থেকে ৯৬ সাল। এই সুদীর্ঘ ২১ বছরে রক্তাক্ত কানসার্ট ও দুর্নীতির খাম্বাকাহিনি ছাড়া বিদ্যুৎ খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন দেশবাসীর কাছে দৃশ্যমান হয়নি। ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বঙ্গবন্ধুর আদর্শপুষ্ট দল আওয়ামী লীগের শাসনভার গ্রহণ ও মুজিবকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকরপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশব্যাপী যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের অভূতপূর্ব জোয়ার জাগে। ২০০৯ সালে ৩২৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ওপর ভর করে আজ অবধি প্রায় ২৩৫৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের মজবুত ভিত তৈরির সক্ষমতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ। এই স্লোগান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড সারাদেশে ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং মুজিববর্ষের অঙ্গীকার পূরণে বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মাঝে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্জন করেছে অভাবনীয় সাফল্য। এ সংস্থাটি বর্তমানে সাত হাজার মেগাওয়াট তথা দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গ্রাহকের চাহিদা পূরণে ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। তাই গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিশ্বস্ত ও নির্ভরতার প্রতীকের নাম বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন প্রতিটি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি।

বিদ্যুৎবিহীন সেই অন্ধকারময় অতীতের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের কথা আমরা ভুলে যাইনি। উপজেলা ও থানা শহর ছাড়া এ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হওয়ার ব্যাপারটা ছিল কল্পনাতীত। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সুদূরপ্রসারী বিদ্যুৎনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশজুড়ে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রম বেগবান করার মধ্য দিয়ে সেই কল্পনাতীত কল্পনাই এখন বাস্তবে পরিণত। খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা, ঝোপ-জঙ্গল ও পাহাড় পেরিয়ে বৈদ্যুতিক তারে তারে যুক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিদ্যুৎবহনকারী খাম্বা। কেবল রাজধানী নয়। জেলা, উপজেলা, থানা শহর নয়। রাতের বেলা বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানিতে পুরো দেশটাকেই একটা শহর মনে হয়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর ভর করে এ দেশের আপামর জনগণ এখন প্রাণচঞ্চল, কর্মচঞ্চল। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সুবিধা থাকায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য কুটিরশিল্প স্বমহিমায় সরব হয়ে উঠেছে। জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠতে শুরু করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের শিল্প-কারখানা ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। বাহারি রঙের আলোর পোশাকে সজ্জিত হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত সরগরম থাকে গ্রাম্য হাটবাজারগুলো। বাংলাদেশের প্রতিটা গ্রামগঞ্জে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে অসংখ্য খামারবাড়ি। শুধু তিন ফসলের দিকে তাকিয়ে না থেকে সারা বছর বহুমুখী কর্মকা-ে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎব্যবস্থার কারণে সারাদেশে ইন্টারনেট ব্যবসা এখন তুঙ্গে। সন্ধ্যায় প্রদীপবাতি বা হারিকেন জ্বালানোর স্মৃতি এখন বিস্মৃতপ্রায়। ঘন ঘন লোডশেডিং নেই, নেই হন্তদন্ত হয়ে দোকানে গিয়ে মোমবাতি কেনার বিব্রতকর পরিস্থিতি। লোভোল্টেজের কারণে এসি, টিভি, ফ্যান, মটরের ফিউজ পুড়ে যাওয়ার ঘটনা এখন বিরল। গ্রামের আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তাগুলোতে দিন-রাত বিরামহীন দৌড়ে বেড়ায় সারি সারি ব্যাটারিচালিত ভ্যান ও অটোরিকশা। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল এ বাহনগুলো বেকার যুবকদের হতাশা ঘোচাতে সক্ষম হয়েছে। দেশের কোথাও এখন মঙ্গার দুঃখকাহিনি নেই। এক সময় ক্ষুধায় যাদের মুখে দুবেলা দুমুঠো অন্ন জুটত না, আজ তারা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী ও সুখীসমৃদ্ধ জীবনযাপনে অভাবনীয় সক্ষমতা অর্জন করেছে।

দক্ষিণবঙ্গে অবস্থিত তিন দিকে নদী আর একদিকে সাগর পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলার মতো দুর্গম অঞ্চলেও শতভাগ বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। ভোলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির আওতায় সর্বশেষ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে ৬৫ মেগাওয়াট। ৮টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে ১২০ এমভিএ। ২০২১ সালের জুনের মধ্যে আরও ৩টি নির্মাণাধীন উপকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন হলে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এ অঞ্চলে মোট ৮৮০০ কিলোমিটার লাইন সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক, অগভীর নলকূপ, এলপি, ক্ষুদ্রশিল্প, দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য খাতে মোট ৩,৪৯,৩৭৫টি গ্রাহকসংখ্যা সৃষ্টি হয়েছে। এ ছাড়া এখানকার অভ্যন্তরীণ কিছু দুর্গম চরাঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ১০০ কিলোমিটার সাবমেরিন ক্যাবল লাইন ও ১৩০০ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। বিদ্যুতের এমন পরিসংখ্যান কমবেশি আকারে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিজুড়ে বিদ্যমান, যা আমার এ সীমাবদ্ধ নিবন্ধে তুলে ধরা অসম্ভব।

বিদ্যুৎ আমাদের ঘরে-বাইরে অন্ধকার দূর করে, দৈনন্দিন যাপিত জীবনে সুখ ও স্বস্তি আনে এবং জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা পালন করে। তাই বিদ্যুতের অপচয় প্রতিরোধে ও বিদ্যুৎজনিত দুর্ঘটনা থেকে বাঁচার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারে প্রয়োজন গ্রাহক-সচেতনতা। অবৈধ সংযোগে বিদ্যুৎ চুরি, ট্রান্সফর্মা ও বৈদ্যুতিক তার চুরি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ও বিদ্যুৎ ঘাটতির অন্যতম কারণ। গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সম্মিলিত প্রতিরোধে এ ধরনের অপকর্মের হাত থেকে বিদ্যুতের সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক হীনস্বার্থে বিদ্যুৎ অফিস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী স্থাপনায় হামলা অনেক সময় বিদ্যুৎকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে বিদ্যুৎ বিভাগকে এ ধরনের অপরাজনীতির গ্রাসমুক্ত রাখতে হবে। বিদ্যুতের খুঁটি ও ঝুলন্ত তারের নিচে গাছ লাগানো মোটেই সমুচিত নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বিদ্যুৎকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষার জন্য সাবমেরিন ক্যাবল লাইনের মতো আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দালালমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ অফিস প্রতিটা গ্রাহকের কামনা। বিদ্যুৎ বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্রিটিশবেনিয়া নয়, রক্তচোষক নয়, সেবক। প্রতিটা গ্রাহকের মনে এমন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হলে শতভাগ বিদ্যুতের শতভাগ সার্থকতা অর্জিত হবে।

হাওলাদার মাকসুদ : শিক্ষক, কবি ও পরিচালক, ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি

advertisement
Evaly
advertisement