advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

যেখানে রাঁধেন সেখানেই ঘুমান

মো. আব্দুস ছাত্তার, ফুলবাড়িয়া
৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৫ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:১৬
advertisement

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার হাসিনা খাতুন যেই ঘরে রাঁধেন, সেই ঘরেই ঘুমান। পলিথিন ছাউনির কুড়েঘরে এভাবেই কেটে গেছে তার ২৫ বছর। সকালে ঘরেই তিনি দেখা পান সূর্যের আলোর। তার সংসারে রান্না ঘর, গোয়াল ঘর অথবা বাড়ি সুরক্ষার জন্য কিছুই দরকার হয় না। অসহায়, অস্বচ্ছল ও ভূমিহীন হাসিনা খাতুনের সঙ্গে আলাপ চারিতায় উঠে এসেছে তার সংসার জীবনের গল্প।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে ভবানীপুর ইউনিয়নের বড়জয়না গ্রাম। পাহাড়ি লাল মাটি বেষ্টিত উঁচুনিচু টিলা। কান্দানিয়া যমুনারপাড় রাস্তা পাশেই তার কুড়েঘর। ১২ হাত লম্বা ঘরের তিনদিকে মাটির দেয়াল। সামনের অংশ বাঁশের ফালি দিয়ে চাঁটাইয়ের মতো করে মাটির প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে কাঠের মতো একটা অংশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যেখানে রাখেন জুতা (পাদুকা)। দরজায় ঝুলছে ছোট্ট একটা তালা। ঘরের চালে উইপোকার বাসা। ঘরটির পলিথিন ছিঁড়ে যাওয়ায় অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে সূর্যের আলো ও রাতের তারা দেখা যায়। হঠাৎ পথচারী নারী পারুল বেগমের সঙ্গে দেখা। বয়স ৫০। পাশেই হাজী বাড়িতে তিনি থাকেন। তার ভাষ্যমতে, ‘লতু মাস্টার তাদের (হাসিনা) থাকবার জায়গা দিয়েছে। হেরা (তারা) আমাদের আত্ময় এবং প্রতিবেশী। হেগর (হাছিনাদের) দুই পুলা (পুত্র)। একটা রুহুল আমিন, ঢাকা গার্মেন্টেসে থাহে (থাকে)। আহে (আসে) না। আরেকটা জহিরুল, ভ্যান চালায়। হেরা (তারা) খুব সহজ-সরল মানুষ। না খাইয়া থাকলেও কেউরে (কাউকে) জানবার (জানায়) দেয় না। বলতে বলতে পারুল উচ্চস্বরে ডাকাডাকি শুরু করলেন গেন্দার মা নামে। অল্প কিছুক্ষণ পর গেন্দার মা আসলো। জানা গেল তিনিই হাছিনা খাতুন ওরফে গেন্দার মা।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে দ্রুত গেন্দার বাপেরে (মো. নেশর আলী) ডেকে আনেন হাসিনা। নেশর বললেন, ‘এল্লা আন্নেরা (আপনারা) বহুন (বসেন)।’ কিন্তু বসার কিছুই নাই, পিড়ি আছে একটা। দাঁড়িয়ে কথা হলো হাসিনা এবং নেশরের সঙ্গে। কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে হাসিনা বললেন, মোস্তুর বাড়ী পাহাড়া দিতাছিলাম। আর গেন্দার বাপ বাঁশের কঞ্চি দিয়ে খাঁচা বুনাইতে ছিল। খাচা বুনিয়ে দৈনিক একশ-দেড়শ টাকা পাই। ঐডা দিয়াই চলে। বাড়ি পাহারা দিলে একশ ট্যাহার মতো দিবো।

সরকার বার বার ঘরের তালিকা করলেও আপনাদের নাম দেয়নি? জবাবে হাসিনার সরল জবাব- ‘কয়বার কইরা নাম নিল, আইডি কার্ড নিলো, কিন্তু কাজ হইল নাহ!’

নেশর আলী বলেন, ‘ছয়কাঠা জমি ছিল, বিক্রি কইরা পুলাপাইনের (সন্তানদের) খাওয়াইছি। ২৫ বছর ধরে মাইনসের (অন্যের) জমিতে থাহি (থাকি)। খাবার-ই পাইনা। শরীর চলে না, মাইনসেরে কামলাও দিতে পারি না। পুলাপাইন তাগরই চলে না, আমগরে কইথ (কোথা) থেকে দিবো। তারপরও গার্মেন্টেস কইরা ও ভ্যান চালাইয়া কিছু কিছু দেয়। চলতাছি আর কি? আইডি কার্ড করার সময় বুঝতে পারি নাই, বয়স কম হইয়া গেছে, এহন বয়স্ক ভাতা ও ভিজিডি ভাতা কোনটারই বাও (পাই না) নাই।’

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শাহীনুর মল্লিক জীবন বলেন, আমার ইউনিয়ন ও উপজেলার শেষ বাড়ি এইটা। তিনি একজন ভূমিহীন আমার জানা ছিল না। জানার পর উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। সরকারের সহযোগিতায় আমার মেয়াদেই তার ঘর করা সম্ভব হবে বলে মনে করি। আর যদি এ সময়ে সম্ভব না হয়, তাহলে নিজে উদ্যোগেই সেটি করার চেষ্টা করবো।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল ছিদ্দিক বলেন, বিষয়টি আমি নাজির সাহেবের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। যাদের জমি আছে, ঘর নেই সেই তালিকায় তার (নেশর) নাম অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সে একটি আধা পাকা ঘর পাবেন।

advertisement
Evaly
advertisement