advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

কালো টাকা ও সাদা টাকার অর্থনীতি

ড. নাজনীন আহমেদ
১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:১২
advertisement

বিগত কয়েক বছরের মতোই ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সুযোগ রাখা হয়েছে কালো টাকা সাদা করার। অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত হিসাবে দেখা যায়, এ পর্যন্ত ৭৪৪৫ জন ব্যক্তি শ্রেণির করদাতা তাদের অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা আয়কর রিটার্নে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এর ওপর কর দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়ায় অর্থনীতির মূলধারায় ফিরেছে ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা। এর ওপর ৯৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা কর দিয়েছেন ওই করদাতারা।

বাংলাদেশে কর-জিডিপির হার ৯-১০ পার্সেন্টের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বেশ অনেক বছর। উন্নয়নের জন্য এই কর-জিডিপি হার বাড়ানোর গুরুত্ব সবাই অনুধাবন করেন। তাই যে কোনো উৎস থেকে রাজস্ব আদায় হলে তা সরকারের বাজেট ঘাটতি কমাতে সহায়ক হয়। তা ছাড়া নানান ধরনের কাজকর্ম, বিশেষ করে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে তা ভূমিকা রাখে- সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তাই কালো টাকা সাদা হলে রাজস্ব আয় বেড়ে স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখবে তাও বোঝা যায় সহজেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে?

করোনা অতিমারীর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি সারা দুনিয়ার অর্থনীতির মতোই চাপে আছে। আর তার ফলে আয়কর কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অর্থনৈতিক চাপের সে প্রভাব কাটিয়ে উঠতে আয়কর দেওয়ার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে সরকার। নতুন এ বিধানের আওতায় করদাতারা জমি, ভবন ও ফ্ল্যাটসহ যে কোনো অঘোষিত সম্পত্তি এলাকার ওপর নির্ভর করে প্রতি বর্গমিটারে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর প্রদানের মাধ্যমে বৈধ করতে পারবেন। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করা যাবে এ অর্থ। তা ছাড়া করদাতারা তাদের আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত আয়ের নগদ অর্থ, ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সম্পদের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদানের মাধ্যমে বৈধ করতে পারবে। গত অর্থবছর পর্যন্ত করদাতারা আয়করবিধি অনুসারে তাদের অপ্রদর্শিত আয় ঘোষণা করতে পারতেন। তবে সরকারের অন্য সংস্থা চাইলে এ আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারত। ফলে বিগত বছরগুলোতে খুব কম মানুষই এ সুযোগ নিয়েছে। এনবিআরের নতুন নিয়মানুযায়ী দেশের প্রচলিত আইনে যাই থাকুক না কেন, ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের চলতি অর্থবছরে আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি বর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা যে কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে কর্তৃপক্ষসহ কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। এই বছর ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণে কালো টাকা, জমিজমা প্রদর্শিত হওয়ার মূল কারণ সম্ভবত এই উৎস না জিজ্ঞেস করার বিধান।

সাধারণত কালো টাকা বলতে সেই অর্থকেই বিবেচনা করা হবে যা বৈধ পথে উপার্জিত, কিন্তু বিশেষ কোনো জটিলতার কারণে অপ্রদর্শিত অবস্থায় রয়ে গেছে, অর্থাৎ সেই টাকার ওপর কোনো কর প্রদান করা হয়নি। আগে যেহেতু উৎস জিজ্ঞেস করা হতো তাতে বোঝা যেত যে, যে অপ্রদর্শিত আয় সাদা করা হচ্ছে তার উৎস বৈধ কিনা। কিন্তু এবারের নিয়মে যেহেতু উৎস জিজ্ঞেস করা হবে না, তাই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না যে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ পথের আয় কিনা। এখানে সুযোগ থেকে যাচ্ছে যে, অন্যায় পথে এমনকি হয়তো অপরাধ করে অর্জিত অর্থ প্রদর্শিত হয়ে বৈধ হয়ে যাওয়ার। আবার এই অপ্রদর্শিত আয় সাদা করতে ট্যাক্সের পরিমাণ স্বাভাবিক হারের থেকে কম।

দেখা যাচ্ছে যে, এই অপ্রদর্শিত আয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১০% হারে কর দিয়ে সাদা করা যাবে, যেখানে নিয়মিত করদাতাদের আয়ের ওপর ভিত্তি করে তাকে আই-এর বিভিন্ন অংশে ২৫% পর্যন্ত হারে কর দিতে হয়। আয়করের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হলো করমুক্ত। এর পরবর্তী এক লাখ টাকার ওপরে ৫ পার্সেন্ট ট্যাক্স দিতে হয়। তার পরবর্তী তিন লাখের ওপরে দিতে হয় ১০% করে ট্যাক্স। এর ওপরের চার লাখের ওপরে ট্যাক্স হলো ১৫ শতাংশ এবং তার পরের আরও পাঁচ লাখের ওপরে ট্যাক্স ২০ পার্সেন্ট। এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, ১৬ লাখ টাকার বেশি আয় হলে সে আয়ের ওপর ২৫ পার্সেন্ট করে ট্যাক্স হওয়ার কথা। এখন এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী ৭৪৪৫ জন ব্যক্তি মোট ১০ হাজার ২২০ কোটি অপ্রদর্শিত আয় সাদা করেছে। তার মানে প্রতিজন গড়ে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা অপ্রদর্শিত আয় সাদা করেছে, এই আয়ের সাত লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ পার্সেন্ট হারে কর হওয়ার কথা। তার পরবর্তী যে ৯৭ লাখ টাকা সাদা করা হয়েছে সেগুলো যারা ঠিকমতো কর দেন সেই নিয়মে কর দিলে ১০ পার্সেন্টের বেশি হারে কর দিতে হতো। সুতরাং দেখা যাচ্ছে সৎ করদাতাদের তুলনায় কম হারে কর দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় (যা বৈধ পথে না অবৈধ পথে উপার্জিত হয়েছে তাও বোঝার উপায় নেই) সাদা করা যাচ্ছে। এটা কি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে না?

যারা কালো টাকা সাদা করছেন তাদের পুরো টাকার ওপর স্বাভাবিক করার এর চেয়ে বেশি হারে কর আদায় করা উচিত। একটু হিসাব করে দেখলাম, যদি সৎ করদাতাদের জন্য বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী কর আদায় করা হতো, তা হলে সরকার এই ১০ হাজার ২২০ কোটি কালো টাকার ওপর থেকে আরও ২ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা বেশি কর আদায় করতে পারত। কাজেই কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে পুরো টাকার ওপর অন্তত ২৫ পার্সেন্ট হারে কর নেওয়া উচিত।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, বিশেষ সময়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে আর সে কারণেই এ বছর কালো টাকা সাদা করার ক্ষেত্রে এত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থে কালো টাকার উৎস জিজ্ঞেস না করার নিয়ম বিশেষ সময়ের বিশেষ প্রয়োজন হিসেবেই তথা সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে থাকা উচিত। আগামী বছরগুলোতেও এমন সুযোগ যদি চলতে থাকে আর অর্থের বা সম্পদের উৎস যদি জিজ্ঞেস করা না হয় তবে দেশে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। এতে ধনী-দরিদ্রের আয় বৈষম্য বাড়বে।

অনেকে মনে করেন বিদেশে টাকা পাচার রোধে দেশে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া দরকার। কিন্তু বিদেশে টাকা পাচার রোধের জন্য আমাদের দরকার মানি লন্ডারিং আইনের সক্রিয় প্রয়োগ, সেই আইন প্রয়োগ যথাযথ না করে দীর্ঘমেয়াদে এরূপ কালো টাকা সাদা করার সুযোগ চলতে থাকলে তাতে অর্থনীতির ভালোর চেয়ে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আর যদি সে কালো টাকার উৎস জিজ্ঞেস না করা হয় তা হলে অবৈধ পথে টাকা অর্জনে উৎসাহ পাবে অনেকে। কালো টাকার উৎস হয়তো কখনো বন্ধ করা যাবে না, যেমন আমরা দেখি উন্নত দেশেও দুর্নীতি রয়েছে, অনেক রকম অনিয়মতান্ত্রিক বিষয় রয়েছে। কিন্তু সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সুষম উন্নয়ন করতে হলে কালো টাকার উৎপাদন এবং তা বৈধকরণ উভয় ক্ষেত্রেই পেনাল্টি হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের ডাক দিয়েছেন সর্বত্র। ধীরগতিতে হলেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিম-লে দুর্নীতির বদনাম ঘোচাচ্ছে। কালো টাকা সাদা করার প্রক্রিয়াতেও এই প্রতিজ্ঞা স্পষ্ট থাকা দরকার।

ড. নাজনীন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)

advertisement
Evaly
advertisement