advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মেধার স্ফুরণে যত্ন লাগে

মেজর (অব) সুধীর সাহা
১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:১২
advertisement

ইতিহাসের এককালে ভারতবর্ষের রাজা-সুলতানরা প-িত, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের পোষণ করতেন, লালন করতেন। কেননা তারা ¯পষ্টতই বুঝেছিলেন, মেধার স্ফুরণে যত্ন লাগে। মেধাকে বাইরে আসার পথ করে দিতে হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষককে যদি পাথেয় জোগাড়ের সংগ্রামে বাজারে অর্থস¤পদ উৎপাদনে মনোযোগী হতে হয়, তা ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষকের জন্য কখনো কখনো কল্যাণকর হলেও তা দেশের কিংবা দশের জন্য কল্যাণকর হয় না। তাই শিক্ষককে তার মেধা বিকাশের পথ করে দেওয়ার জন্য তাকে অর্থস¤পদের চিন্তা থেকে দূরে রাখতে হয়। আজ সেই রাজারাও নেই, সেই সমাজও নেই; আবার সেই শিক্ষকও নেই। আর্থিক প্রতিযোগিতার ডামাডোলে পড়ে শিক্ষকরাও আজ হয়ে দাঁড়িয়েছেন অর্থ উপার্জনের কারিগর হিসেবে। তাই সেখানে অর্থ হয়তো কোথাও কোথাও প্রবেশ করছে ঠিকই, কিন্তু মেধা পালিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তো আরও জ্বালা আছে। নতুন বাস্তবতায় কিংবা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ছাত্রসংখ্যা কমে গেলে অগণিত প্রতিষ্ঠানের তৈরি পরিকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হুমকিতে পড়ে। আর এতেও কিন্তু সেই দেশ ও দশেরই ক্ষতিসাধিত হয়।

পৃথিবীর সর্বত্র চলছে করোনা মহামারী যুদ্ধ। তবে তার প্রকারটা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই ভয়াবহভাবে দেখা দিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথম পাঠটিকে যদি বর্ণনা করা যায় ‘থমকে যাওয়া’, তা হলে দ্বিতীয় পর্বের নামটি হবে ‘মানিয়ে নেওয়া’। এই মানিয়ে নেওয়াটাও এক ধরনের যুদ্ধ। ইতোমধ্যে আমরা শিক্ষাজগতে কত কিছুই না দেখলাম। নতুন পদ্ধতিকে বরণ করার জন্য ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবাই যেন হঠাৎ করেই অনলাইনে লেখাপড়া, গান-কবিতা, সংলাপ, বকাঝকা ইত্যাদি বিষয়ে বেশ ওস্তাদ হয়ে পড়লেন। অবশ্য মেধা বিকাশের মানুষগুলো আগেও মাঝে মধ্যে সেমিনারে একটু-আধটু আলোচনা করতেন যে, ভবিষ্যতে অনলাইন বিষয়টি একদিন সামনে আসতে পারে। তবে করোনা এক ধাক্কায় এত তাড়াতাড়ি হাতে-কলমে তা শিখিয়ে দিয়ে যাবে, এমনটি কিন্তু কেউ ভাবেননি। ছাত্র-শিক্ষক উভয়ই হয়তো বুঝেছিলেন এবং সেভাবে আস্তে আস্তে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল, ইউটিউব, অনলাইন ফর্ম, কুইজ, ফাইল, ভিডিও মিট এগুলোও হয়তো শিখেছিলেন। ফেসবুক লাইভ অবশ্য আগে থেকেই ডাল-ভাত ছিল। কিন্তু করোনা এক ধাক্কায় এসব শেখানোর বিষয়কে যেন একেবারে সবার দোরগোড়ায় আছড়ে দিল। এক লহমায় তা শিখে নিতে হবে। কেননা পরিস্থিতিই তেমন। সবাইকে শিখিয়েই ছাড়বে এসব। ভিডিও মিট অ্যাপে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে প্রায় সর্বত্রই। বেশ জমে উঠেছে যেন ব্যবস্থাটি। হিড়িক পড়ে গিয়েছে নতুন করে এটিকে বরণ করে নেওয়ার কাজটি। মনে হচ্ছে, করোনাকালে তো বটেই, করোনা বিদায় হলেও এমন ব্যবস্থাটির সহজে বিদায় ঘটছে না। হয়তো ভবিষ্যৎটি অনলাইন এবং অফলাইন এই মিশ্র ব্যবস্থারই শিকার হয়ে পড়ছে।

অনলাইনের একটি বিরাট সুবিধা আছে। ভিন শহরে কিংবা ভিনদেশের প্রথিতযশা শিক্ষকরা সহজলভ্য হয়ে দাঁড়াবেন। তখন ঘরের এবং বাইরের শিক্ষকদের পড়া ছাত্রছাত্রীদের নতুন মাত্রা দিতে পারে। আমন্ত্রিত বক্তা যেটুকু পড়িয়ে যাবেন, তা তো রেকর্ডিংয়ে আছেই। ঘরের শিক্ষকরা সেটাকে ঘষেমেজে ছাত্রছাত্রীদের তৈরি করতে পারবেন আরও ভালোভাবে। আমার নিজের কথাই বলি। ঢাকা কলেজে বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম। বিজ্ঞান বিভাগের প্র্যাকটিক্যালসহ অন্য ক্লাসগুলো মনের আনন্দে নয়, বরং অনেকটা বাধ্য হয়েই করতাম। সে সময়ে বাংলার শিক্ষক ছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষক আবু সাইদ চৌধুরী। তার ক্লাসে দৌড়ে সবার আগে যেতে চাইতাম। দুটি কারণ ছিল তাড়াহুড়ো করার। প্রচুর আনন্দ পেতাম এবং উপভোগ করতাম তার ক্লাস। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনতাম। দ্বিতীয় কারণটি ছিল, একটু দেরি করে গেলেই হয়তো সামনে কিংবা ভালো আসনে বসতে পারব না। এমনকি দাঁড়িয়েও থাকতে হতে পারে। কেননা তার বক্তৃতা শোনার জন্য সংশ্লিষ্ট ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীই যে শুধু যোগদান করে তা নয়, অন্য ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা এমনকি ভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীরাও ভিড় জমায়। তাই জায়গা পাওয়ার আশায় আগেভাগেই ক্লাসে হাজির হতে ইচ্ছে হতো। সেই দুঃখ এখনকার ছাত্রছাত্রীদের ঘুচতে পারে। আবু সাইদের মতো প্রিয় শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস পাওয়া এখন হয়ে উঠতে পারে সহজ একটি কাজ। যে কোনো কলেজ যে কোনো সময় পেতে পারে এমন প্রথিতযশা শিক্ষকদের ক্লাস নেওয়ার সুবিধা। তবে এ অবস্থায় শিক্ষকদের শিক্ষকতার পেশাটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চ্যালেঞ্জ মূলত দুরকম। প্রথমত, মিশ্র পদ্ধতিতে (অফলাইন এবং অনলাইন) মানিয়ে নেওয়া। প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস, অনলাইনে চব্বিশ ঘণ্টার যে কোনো সময় মিটিং- এসব চাহিদার সঙ্গে শারীরিক ও মানসিকভাবে মানিয়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা। বিশ্বমান, দেশমান এবং প্রথিতযশা শিক্ষকদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেকে তৈরি করা। হয়তো কিছু উদাসীন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতায় দুর্বল শিক্ষকদের সামনে ঘোর বিপদ। এই নতুন পদ্ধতিতে অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। পাঁচ-দশ বছর আগেও যেসব উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা সাধারণ লাইনে ডিগ্রি পাওয়ার আশায় সাধারণ ডিগ্রি কলেজে পড়তে আসত, আজ তারা বেশি অর্থ ব্যয় করে দেশের নামিদামি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এমনকি বিদেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ খুঁজবে। এর বাইরে যে বিশাল সংখ্যার ছাত্রছাত্রী আছে, যারা মূলত প্রথম প্রজন্মের পড়–য়া শ্রেণি, তারাই ভরে রাখবে সাধারণ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনগুলো। খেয়াল করলে দেখা যাবে, সাধারণ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রসংখ্যা তলানিতে। করোনার পর এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে। কলা বিভাগে ছাত্রছাত্রীর আগমন হলেও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগে তাদের খুব একটা দেখা যাবে না। যারা বিজ্ঞান পড়তে মনস্থ করবে, তারা আর সাধারণ কলেজের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে প্রাইভেট কলেজের বৃত্তিমূলক কোর্সে যাওয়ার আগ্রহ বেশি দেখাবে। তাই এটি সহজে বলা যায় যে, করোনা পরিস্থিতির পর মধ্যমানের কলেজগুলোর ছাত্রছাত্রী সংখ্যা কমতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কলেজের বিলুপ্তি ঘটলে অবাক হওয়ার সুযোগ থাকবে না।

কিছু বৈষম্যের সঙ্গে আমাদের সমাজ সব সময় পরিচিত। গ্রাম-শহর বৈষম্য, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু বৈষম্য, ধনী-গরিব বৈষম্য, নারী-পুরুষ বৈষম্য ইত্যাদি অনেক বৈষম্যের ভার বহন করে চলেছে আমাদের সমাজ অনাদিকাল ধরেই। সেই সঙ্গে এবার নতুন আরও একটি বৈষম্য যোগ হতে যাচ্ছে। সব ছাড়িয়ে সেই বৈষম্যটিই বুঝি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। ডিজিটাল ডিভাইড বৈষম্য। ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের সংযোগ এবং স্মার্টফোন বনাম নো নেটওয়ার্ক, নো স্মার্টফোন। অনলাইনের সুবিধা নিতে হলে ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক সুযোগ থাকতে হবে। আর এমন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে স্মার্টফোন হাতে থাকতে হবে। করোনার প্রভাবে মানুষের সামর্থ্য এখন ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য ভালো ইন্টারনেট সংযোগের ভীষণ দরকার। ছাত্রছাত্রীদের সবাই সমান অসহায় নয়। অনেকেরই স্মার্টফোন আছে, আবার অনেকের নেই। অনেকের ল্যাপটপ আছে, আবার অনেকের নেই। এই আছে আর নেই-এর মাঝে সমন্বয় করা গেলেই পড়াশোনা, শিক্ষা, ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকদের উপকার করা সম্ভব হবে। এখানেই এগিয়ে আসতে হবে সামাজিক পাহারা প্রদানের কাজে। রাষ্ট্রকে হাল ধরতে হবে। শিক্ষাবান্ধব কল্যাণকামী রাষ্ট্র পরিচালনার পথে এগিয়ে যেতে পারলে এ ব্যবস্থায় উন্নতি সম্ভব। যাদের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ আছে, যাদের কাছে ইন্টারনেট নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য আছে, তাদের সঙ্গে বৈষম্য কমাতে যাদের এই দুটি সুযোগ নেই তাদের সাহায্য করতে হবে। রাষ্ট্রই পারে এ বড় কাজটি করতে। স্টুডেন্ট লোনই হোক, শিক্ষক লোনই হোক অথবা স্বল্পমূল্যে প্রাপ্তির ব্যবস্থাই হোক- কাজটি করতে হবে সমন্বিতভাবে এবং শক্ত হাতে। তবেই দূর হবে বৈষম্য। তবেই মেধা বিকাশের পথে আর্থিক দৈন্যের কারণটি বড় হয়ে ধরা দেবে না। এ কাজটি যদি ব্যবসায়ীমহলের প্রভাবশালীরা করতে যান, তবে জটিলতা আরও বাড়বে। তারা মাশুল বাড়িয়ে দেবে। তাতে বরং বৈষম্য কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাবে। এটা করতে হবে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্র মেধার বিকাশকে কণ্টকমুক্ত করার জন্য মেধা বিকাশের অন্তরায় হয়ে গরিবের কাছে ধরা দিচ্ছে যে সমস্যা, তা দূর করার কল্যাণমুখী একটি সমন্বিত জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারলেই মেধার স্ফুরণ বাধাগ্রস্ত হবে না। সামাজিক বৈষম্যও হ্রাস পাবে।

মেজর (অব) সুধীর সাহা : কলাম লেখক

advertisement
Evaly
advertisement