advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সমাজ বিনির্মাণে সুস্থ বিনোদন নিশ্চিত করতে হবে

শাহীন চৌধুরী ডলি
১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২১ ০০:১২
advertisement

আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্জন ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের কারণে মানুষ যে কোনো জায়গায় অবস্থান করেও তার চাহিদার জিনিসটি দেখে নিতে পারেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। ভিনটন জি কার্ফের আবিষ্কার করা ইন্টারনেট ২৬ বছরে গোটা পৃথিবীকে আমূল বদলে দিয়েছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষের রুচি, আমোদ-প্রমোদে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আধুনিককালে মানুষের চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দ্রুতই বদলে যাচ্ছে বিনোদন মাধ্যমগুলো। একটা সময় ছিল, যখন পুরো একটা গ্রামে একটিমাত্র বাড়িতে বসে সদলবলে মানুষ টেলিভিশন দেখত। সেসব স্মৃতি এখন রূপকথার মতন শোনায়। গ্রামেও পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন। এগুলোর ওপর নির্ভর করে বদলে গেছে বিনোদন মাধ্যম। আগামী দিনে টেলিভিশনের আধিপত্য কতটা টিকে থাকবে তা নিয়ে বিবিসি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ২০১৯ সালে। শিরোনাম ছিল, ‘নতুন মোবাইল প্রযুক্তি ৫জি কি টেলিভিশন সম্প্রচারশিল্পকে গিলে ফেলবে?’

প্রচলিত টেলিভিশন সম্প্রচার শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির কারণ হচ্ছে, বৈচিত্র?্যময় কন্টেন্টের ব্যাপক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেছে ৫জি। ভিজুয়াল কন্টেন্টের বিকল্প মাধ্যমগুলো ৫জি প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে টেলিভিশনের চেয়ে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। রেডিও, টু-ইন-ওয়ান, টেলিভিশনের জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হয়েছে গুগল, ইউটিউব, টুইটার, লাইকি, টিকটকসহ আরও বেশকিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মানুষ এখন হাতের মুঠোতে থাকা ডিভাইসে নিজ চাহিদা অনুযায়ী যে কোনো কিছু দেখতে পছন্দ করে। নির্দিষ্ট সীমারেখা টপকে মানুষের দৃষ্টি এখন দিগি¦দিক। পঞ্চম প্রজন্মের যোগাযোগব্যবস্থা ফাইভ-জি আসলে বিনোদন মাধ্যমগুলোকে প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে ব্যক্তি তথ্য, মতামত, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি আদান-প্রদান করতে পারছে মানুষ। ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিশু-কিশোর, গৃহিণী, পেশাজীবী কে নেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে?

মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে গৃহবন্দি জীবনে সারাবিশ্বেই যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে লাইভ ভিডিও স্ট্রিমিং। ফেসবুক জাদুতে দূর হয়েছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা। গণমাধ্যমে তথ্যের বিপণনের সাবেকি প্রথা এখন আর নেই। চারপাশে, দেশে-বিদেশে কী ঘটছে, সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাচ্ছে সবাই। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলো মানবীয় যোগাযোগের সর্বাধুনিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষ মানবীয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্বকে পুরোপুরি দূর করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। প্রযুক্তির পালাবদলে পরিবর্তন এসেছে মিডিয়া জগতে।

শোবিজ অঙ্গনে জায়গা করে নিচ্ছে ‘ওয়েব সিরিজ’। চলচ্চিত্র বা নাটক নির্মাণ করে ইন্টারনেটে বিভিন্ন স্ট্রিমিং সাইটে প্রকাশ করা হয় বলেই এর নামকরণ করা হয়েছে ওয়েব সিরিজ। শুধু অনলাইন বা অনলাইন টিভির জন্য তৈরি ও প্রকাশিত ধারাবাহিক ভিডিও এগুলো। বিনোদনের বদলে যাওয়া মাধ্যম এই ওয়েব সিরিজ। বিভিন্ন কারণে ওয়েব সিরিজগুলো দেশে-বিদেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নির্মাণ ও প্রদর্শনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গল্প, গান, অ্যাকশনের ধারা, লোকেশনের বৈচিত্র?্য ওয়েব সিরিজকে জনপ্রিয় করে তুলছে। এক সময় মানুষ আগ্রহ নিয়ে টেলিভিশন দেখত, এখন দেখে ইউটিউব বা ওয়েব সিরিজ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি মাসে ৮০ কোটির বেশি মানুষ বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিংয়ে প্রবেশ করে। গড়ে প্রতি মাসে কেবল ইউটিউবেই সময় কাটায় তিন বিলিয়ন ঘণ্টারও বেশি। বিশ শতকের শেষদিকে জনপ্রিয়তার সিঁড়িতে ওয়েব সিরিজের উত্থান।

সুস্থ বিনোদনের স্থলে দিন দিন বাড়ছে অপসংস্কৃতির চর্চা। ইউটিউবে বেড়েই চলেছে মানহীন ও অশ্লীল ভিডিও। ইউটিউবে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে প্রচুর মানহীন ও অশ্লীল নাটক, মিউজিক ভিডিও কিংবা শর্টফিল্ম। নির্মাণের সংখ্যার পাশাপাশি ভিউয়ের দিকেও এগিয়ে আছে এগুলো। একটি কনটেন্ট প্রকাশের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে এগুলোতে দেখা যায় ২০ থেকে ৩০ লাখ ভিউ। শর্টফিল্মের নামে বিভিন্ন অশ্লীল সিরিজ ইউটিউবে দেখা যায়। ভালো গল্পের বিপরীতে প্রাধান্য থাকে যৌনতা ও অশ্লীলতার উস্কানি। ইউটিউবে এমন অনেক চ্যানেল আছে অশ্লীলতার কারণে বিতর্কিত হচ্ছে পুরো মাধ্যম। গল্পের মাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা দিতে গিয়ে নেতিবাচক বিষয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণভাবে তুলে ধরছে ওয়েব সিরিজগুলো।

সমালোচনা ও বিতর্ক দিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ওয়েব সিরিজের যাত্রা। রুচিবান দর্শক বিনোদন পাওয়ার বিপরীতে বিরক্ত হচ্ছে। ইতিবাচক নয়, নেতিবাচক দিয়েই ওয়েব সিরিজের যাত্রা। এসব ভিডিও কনটেন্টে অপ্রাসঙ্গিক ও অহেতুক যৌনতা, অশালীন সংলাপ, বাজে অঙ্গভঙ্গি, মাদক গ্রহণের দৃশ্য সংযোজনসহ বিবিধ কারণে সমালোচিত হচ্ছে। দ্রুত সস্তা জনপ্রিয়তা পেতে, বিপুল ভিউয়ার বা সাবস্ক্রাইবার পাওয়ার চেষ্টায় নির্মাতারা যোগ করছে পর্নোগ্রাফি। এগুলো আমাদের দেশের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। দেশের দর্শকরা কখনো ভাবেননি নাটক দেখতে গিয়ে তাদের পর্নো সাদৃশ্য কিছু দেখতে হবে। প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা এমন নগ্ন ও অশালীনরূপে নিজেদের জাহির করবে। ইন্টারনেটে এমন ভিডিওর ছড়াছড়ি। কিশোর-তরুণরা এগুলোতে আকৃষ্ট হওয়ার ফলে সামাজিকভাবে নতুন প্রজন্মের অবক্ষয় ভাবিয়ে তুলছে।

যেভাবে কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট বেড়ে চলেছে এটি আমাদের সংস্কৃতির জন্য মারাত্মক হুমকি। টেলিভিশনে একটা নাটক প্রচার করতে হলে অনেক নিয়মনীতি মেনে নির্মাণ করতে হয়। ইউটিউবে নিয়মের এই বাধ্যবাধকতা নেই বলে নিজেদের স্বার্থে সুযোগের অপব্যবহার করে একশ্রেণির খারাপ মানুষ। দর্শক রুচিশীল কনটেন্ট দেখতে আগ্রহী। ওটিটি প্ল্যাটফরম হলো সাবস্ক্রাইব করে দেখতে হয় এমন একটি ওয়েব প্ল্যাটফরম। একজন দর্শককে চ্যানেলটি প্রথমে ডাউনলোড করতে হবে, তার পর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা খরচ করে সাবস্ক্রাইব করতে হবে। যে কোনো দর্শক ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তিনি ঠিক কোন কন্টেন্টটি দেখতে চান। ওয়েব দুনিয়ায় যেমন ভালো কিছু আছে, তেমন আছে খারাপ কিছু। আমরা কী দেখব আর কী বর্জন করব সেটা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।

যেসব ইউটিউব চ্যানেল থেকে অশ্লীল কনটেন্ট প্রকাশ করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। অবারিত স্বাধীনতার অপব্যবহারে স্বেচ্ছাচারিতার লক্ষণ সুস্পষ্ট। অনলাইনে গান বা ভিডিও প্রকাশে কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়ার বা সেন্সরশিপের ব্যবস্থা নেই। এই সুযোগে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অরাজকতা, অশ্লীলতা বাড়ছে। এসব ঠেকাতে এখানেও এক ধরনের সেন্সরশিপ সিস্টেম রাখাটা খুব দরকার। সংস্কৃতি বা তথ্য মন্ত্রণালয় কাজটা করতে পারে। দেশীয় সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে দেওয়া চলবে না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঠিক সংস্কৃতির চর্চা বাঁচিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

শাহীন চৌধুরী ডলি : লেখক ও প্রাবন্ধিক

advertisement
Evaly
advertisement