advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

শ্রেণির দুর্লঙ্ঘবৃত্ত

মযহারুল ইসলাম বাবলা
১২ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২১ ০০:২৬
advertisement

প্রত্যেকের প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে পারিবারিক বলয় থেকে। শিশু-কিশোর বয়সীদের সারল্যমনের ওপর প্রভাব বিস্তারে পারিবারিক ভূমিকাকে উপেক্ষা করা যাবে না। তাদেরও মানসিক বিকাশে পারিবারিক প্রভাব, অনুশাসন, নির্দেশনায় শ্রেণি-সংস্কৃতির বৃত্তে আটকে পড়ে। ওই পারিবারিক শিক্ষা তাদের হৃদয়ানুভূতিতে স্থায়িত্ব লাভ করে। পরবর্তী জীবনে ওই প্রভাব ক্রিয়াশীল তো থাকেই। এর পাশাপাশি সামাজিক জীবনের বিভাজনে নিজ শ্রেণিবৃত্তের মধ্যে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে যায়।

প্রত্যেকের আচার-আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা, মানসিকতা ও জীবনাচারে শ্রেণি অবস্থান উন্মোচিত হয়ে পড়ে। শ্রেণিস্বার্থ উপেক্ষা করার কোনো অবকাশই নেই। শ্রেণিস্বার্থে প্রায় সবাই সমান। ভিন্নতা যদি থাকেও, তা হলে সেটি সংখ্যা বিচারে নগণ্য। কতজনই বাস্তবে পারেন শ্রেণিচ্যুত হতে!

আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোর ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে শ্রেণিবিভক্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি সেখানেও বিদ্যমান। ত্রিমুখী শিক্ষাক্রমে তো বিভাজন মোটা দাগে স্পষ্ট। ইংরেজি, মাধ্যমিক ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাঙ্গনে তিন পৃথক ভাষা এবং পৃথক শ্রেণি প্রতিনিধির শিক্ষার্থীরা শিক্ষালাভ করে থাকে। শ্রেণিবৈষম্যের বীজ সেখান থেকেই ডালপালা ছড়িয়ে বিস্তার লাভ করে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাঙ্গনগুলো পর্যন্ত বৈষম্যপূর্ণ। শিক্ষাঙ্গনগুলোর মান বিচারে সেটি দৃশ্যমান বটে। সেখানেও শ্রেণিবিভাজন স্পষ্ট। অর্থাৎ শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক এবং শ্রেণিবৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে শ্রেণিবিভক্তি ও বৈষম্যকে স্থায়ী করা হয়েছে আমাদের সমাজজীবনে। তাই সমাজে শ্রেণিবৈষম্য যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি আত্মকেন্দ্রিকতা সামাজিক মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। সংলগ্ন হওয়ার পথ ক্রমাগত রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মানুষের আন্তঃসম্পর্কগুলোও শ্রেণিভিক্তিক হয়ে পড়েছে।

আত্মকেন্দ্রিকতা এখন চরম সীমায় পৌঁছে দিয়েছে করোনা মহামারী। নিজে বাঁচো। নিকটজন যে কেউ করোনা ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে তাকে শত্রুজ্ঞান করে দূরে ঠেলে দেওয়ার অদ্ভুত সংস্কৃতির প্রচলন ঘটেছে। সামাজিক দূরত্ব ক্রমেই বিস্তার লাভ করে চরম আত্মকেন্দ্রিকতার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে এই করোনাকালে। সমাজ তো রাষ্ট্রাধীন। তাই রাষ্ট্রের পথ ভিন্ন তো সমাজ চলতে পারে না। আমাদের রাষ্ট্র যেহেতু পুঁজিবাদী চরিত্রধারণ করেছে, সেহেতু সমাজও সঙ্গত কারণে ওই পথেই তার অবস্থান সুদৃঢ় করে ফেলেছে। এর প্রভাব সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয়ে একটি বৈষম্যপূর্ণ সামাজিক বলয় গড়ে উঠেছে। পারস্পরিক সম্পর্ক-সম্প্রীতিও শ্রেণিবৃত্তে আটকে পড়েছে। নিকট আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো নিকটবর্তীর বিপরীতে দূরবর্তী করে তোলে ওই শ্রেণিগত অবস্থানের ভিত্তিতে। মানুষের মধ্যকার মানবিক সম্পর্কগুলো অমানবিকতার স্তরে পৌঁছে দিয়ে চরম বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে চলেছে। এ জন্য নিশ্চয় ব্যক্তি দায়ী নয়, ব্যক্তি ব্যবস্থার শিকার। দায়ী বিদ্যমান ব্যবস্থা। ওই ব্যবস্থা পরস্পরকে সংলগ্ন না করে পরস্পরকে বিচ্ছিন্ন করে চলেছে। ব্যক্তিগত উন্নতির ইঁদুর দৌড়ে শামিল করে সামাজিক মানুষকে অসামাজিক হতে বাধ্য করে চলেছে। আটকে ফেলেছে শ্রেণির দুর্লঙ্ঘবৃত্তে।

মানবসভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণিবৈষম্য, শ্রেণিশোষণের সূত্রপাত। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সভ্যতার অগ্রসরমানতার সঙ্গে শ্রেণিবৈষম্য, শ্রেণিশোষণ সমাজে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। আদিম যুগে শ্রেণিবিভাজন ছিল না। ছিল না শ্রেণিশোষণও। প্রকৃতির নানাবিধ প্রতিকূলতা, হিং¯্র বন্যপ্রাণীর আগ্রাসন-আক্রমণ থেকে নিজেদের সংগঠিত উপায়ে রক্ষা করত আদিম মানুষ। একত্রে শিকার করে সমবণ্টনে আহার করত। গুহায় একত্রে বসবাস করত। তাই শ্রেণিসমতার আদিম যুগকে আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা নামে অভিহিত করা হয়। সভ্যতা বিকাশের ধারাবাহিকতায় মানুষের ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাক্সক্ষা, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লাভ, উত্তরাধিকারের নিয়ম ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই শ্রেণিবিভাজন সূচিত হয়েছে। মানব ইতিহাসের নানা পর্বে বিশ্বে অনেক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছে। এক সময়কার ঘৃণ্য দাসব্যবস্থা বদলে সামন্তবাদী ব্যবস্থা এলো। সামন্তবাদীব্যবস্থা বিলোপে ফরাসি বিপ্লবে সাম্য, মুক্তি, স্বাধীনতার দাবি নিয়ে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি এলো- সেটি বুর্জোয়াব্যবস্থা। এ বুর্জোয়াব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় মেহনতি মানুষের সর্বাত্মক অংশগ্রহণেও তাদের স্বাধীনতা, সাম্য, মুক্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। বিপরীতে শ্রেণিশোষণের শক্তপোক্ত ব্যবস্থাই স্থাপিত হলো এই বুর্জোয়া ব্যবস্থাধীনে। এ জন্য ফরাসি দেশে ইতিহাসখ্যাত মেহনতিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় শ্রমিক-কৃষক, মেহনতিশ্রেণির সংঘটিত প্যারিকমিউন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বুর্জোয়াব্যবস্থা উপড়ে ফেলে। কিন্তু আগ্রাসী বুর্জোয়াদের সংগঠিত আক্রমণে প্যারিকমিউনের পতন ঘটে মাত্র ৭২ দিনের মাথায়। অগণিত মেহনতিকে নির্বিচারে হত্যা করে বুর্জোয়ারা তাদের ব্যবস্থাধীনে শ্রেণিশোষণ নিষ্কণ্টক হয়ে যায়। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শ্রেণিশোষণের অবসান ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পূর্ব ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা মহাদেশে এই বিপ্লব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিষ্ঠিত হয় বহু মেহনতির রাষ্ট্র। এই মেহনতিদের রাষ্ট্রও পতন ঘটে ওই শ্রেণি আকাক্সক্ষা-শ্রেণিস্বার্থ কেন্দ্র করে। ব্যক্তিগত মালিকানা, ভোগবিলাস মেহনতিদের রাষ্ট্রের ভেতরকার নেতৃত্ব ও বাইরের (পুঁজিবাদীদের) চাপ, লোভ-মোহে সমাজতন্ত্র থেকে সরে দাঁড়ায় খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নসহ পুবের ব্লকের দেশগুলো। কিন্তু এর দ্বারা প্রমাণ হয় না সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে, বরং বলা যায়- শ্রেণি আকাক্সক্ষায় সমাজতন্ত্র থেকে কতিপয় রাষ্ট্র নিজেরা সরে গেছে। শ্রেণিহীনসমাজ ও রাষ্ট্রের আদর্শ পরিত্যাগে শ্রেণিবৈষম্য, শ্রেণিশোষণ অবিরাম ঘটে চলেছে সাবেক সমাজতন্ত্রী দেশগুলোয়। পুঁজিবাদী লালসার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমপর্ণকারী শ্রেণিস্বার্থ রক্ষায় তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক বিলোপবাদীদের ইতিহাস নিশ্চয় ক্ষমা করবে না। আদর্শ বিচ্যুতিতে ইতিহাসে তাদের স্থান নির্ধারিত হবে।

শ্রেণিস্বার্থ, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মোহ, ভোগবিলাসের তাড়নায় সহজেই মানুষ আকৃষ্ট হয়ে ওঠে। পথভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। শ্রেণির এই আকাক্সক্ষায় আদর্শচ্যুত মানুষের অভাব নেই দেশে কিংবা বিদেশে। তাই শ্রেণিগত বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণিত্যাগ করা আপাত সহজ নয়। শ্রেণিচ্যুতি মানে গরিব হওয়া নয়, শ্রেণিচ্যুতির মূল বিষয়টি হচ্ছে শ্রেণিস্বার্থ পরিত্যাগ করে সমষ্টিগত স্বার্থকে প্রধান করে দেখা। আমাদের ভূখ-ের ইতিহাসে শ্রেণিত্যাগী অনেকেই ছিলেন বটে কিন্তু শ্রেণির টানেই পথভ্রষ্ট হয়েছেন এবং হচ্ছেনও। আমরা একই সমাজে বসবাস করলেও শ্রেণিবৈষম্যের কারণেই পরস্পর নিকটবর্তী হতে পারি না, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। শ্রেণিবিভাজন সামাজিক জীবনেই কেবল নয়, পরিবারের অভ্যন্তরে পর্যন্ত ক্রিয়াশীল। মানুষ শ্রেণিস্বার্থ ত্যাগ করতে না পারার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে বিদ্যমানব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা ব্যক্তিগত মালিকানা ও ব্যক্তিগত উন্নতিতে উৎসাহ জুগিয়ে থাকে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী ব্যাধিতে আমাদের ক্রমান্বয়ে জড়গ্রস্ত করে তোলে। সামষ্টিক চিন্তাচেতনার বিপরীতে কেবলই আত্মকেন্দ্রিকতার বৃত্তে আটকে ফেলার তাড়না দিয়ে থাকে। তাই এর বৃত্ত ভাঙা দুর্লঙ্ঘ বটে। তবে ভাঙা যে একেবারেই অসাধ্য, তা নয়।

বিকাশমান মানবসভ্যতার বিবর্তনের বাঁকে একে একে নানা ধর্মমত এসেছে। কিন্তু শ্রেণিবিভাজন বিলোপে কোনো ধর্মমতেই নির্দিষ্ট অনুশাসন নেই। শ্রেণিবিভাজন-বৈষম্য সহনীয় পর্যায়ের জন্য কিছু সংস্কারের কথা বলা হলেও শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থার পক্ষেই ধর্মমতের অবস্থান নির্ধারিত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যবস্থাটি আরোপিত হয়েছে সনাতন ধর্মের বর্ণাশ্রম প্রথায়। এটি প্রকারান্তে শ্রেণিশোষণের উদ্দেশ্যে আরোপ করা হয়েছিল। বৈদিক যুগে বর্ণভেদ না থাকলেও পৌরাণিক যুগে জাতবৈষম্যকে বংশপরম্পরারূপে স্বীকার করা হয়। আর্যসমাজের ভিত্তিমূলে ছিল বর্ণ প্রথা, জাতবৈষম্য। প্রকারান্তে সেটি শ্রেণিশোষণই বটে।

ঋষি মনু নামক এক বর্ণবাদী জাত প্রথা ধর্মীয় আচারে অন্তর্ভুক্ত করে ‘মনুসংহিতা’ গ্রন্থে বর্ণাশ্রম প্রথাকে ধর্মমতরূপে অভিহিত করেছেন। নিম্নবর্গের মানুষকে ব্রাত্য ও সংস্কারবর্জিত গায়ত্রীভ্রষ্ট বলেছেন। বৈদিক সাহিত্য রামায়ণ ও মহাভারতে যারা পতিত ব্রাত্যশ্রেণি ছিল- আজকের এই যুগেও তারা দলিত হরিজন, অস্পৃশ্য, নমঃশূদ্র, নিম্নবর্গীয়। একমাত্র হিন্দু ধর্মমতেই মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ধারিত। রজক, চর্মকার, নট, বরুড়, মেদ, ভিল্ল ও কৈবত্য- এই সাত পেশাজীবী সমাজে ঘৃণিত ব্রাত্য-নমঃশূদ্র। বর্ণের শ্রেণিবিভাজনে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য উচ্চবর্ণ আর মেহনতি-শ্রমজীবীরা ব্রাত্য-নমঃশূদ্র। অস্পৃশ্যরা বর্ণহীন পা-ব বর্ণবিশেষ। অথচ সভ্যতার চালিকাশক্তি অন্তজশ্রেণির ব্রাত্যরাই উৎপাদকরূপে সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতিতে সর্বাধিক অবদান রাখার পরও তাদের সামাজিক মর্যাদা বলে বাস্তবে কিছু নেই। সমাজের দাস, সেবকরূপে কৃষি ও শিল্প থেকে উৎপাদনে এ ব্রাত্যশ্রেণির মানুষই মানুষের অন্ন, বস্ত্র, আহার জোগান দিয়ে আসছে যুগ-যুগান্তর থেকে। অথচ ধর্মমতে তারা অন্তুজ-ব্রাত্য।

শ্রেণিপার্থক্যই মানুষের প্রতি মানুষের দূরত্বের প্রধান কারণ। কেবল মানুষে মানুষে নয়- নিজ পরিবার, আত্মীয়-পরিজনদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক থাকা, না থাকার ক্ষেত্রেও শ্রেণিগত অবস্থান চরমভাবে ক্রিয়াশীল। শ্রেণিসমস্যা নিরসনের একমাত্র পথটি হচ্ছে বিদ্যমান ব্যবস্থার বদল। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সচল রেখে এই সংকট থেকে উত্তরণের বিকল্প কোনো উপায় নেই।

মযহারুল ইসলাম বাবলা : নির্বাহী সম্পাদক,

নতুন দিগন্ত

advertisement
Evaly
advertisement