advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

ভারতে বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাবে শঙ্কিত পোলট্রি খামারিরা

রেজাউল রেজা
১৪ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২১ ০০:২৩
ভারতে দেখা দিয়েছে বার্ড ফ্লু, চিন্তার ভাঁজ বাংলাদেশি পোল্ট্রি খামারিদের কপালেও
advertisement

প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বার্ড ফ্লুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলগুলোতেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় বিপুলসংখ্যক পোলট্রি মুরগি মারা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশেও রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন দেশীয় পোলট্রি খামারিরা। সংক্রমণ রোধে ইতোমধ্যেই আগাম প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

করোনার মধ্যে নতুন এ ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র পোলট্রি খামারিরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি এমন পরিস্থিতিতে বার্ড ফ্লুসহ অন্যান্য ভ্যাকসিন এবং ওষুধের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা। তাই ভ্যাকসিনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন খামারিরা।

জানা গেছে, গত ৪ জানুয়ারি ভারতের মধ্য প্রদেশে বার্ড ফ্লুর প্রকোপ দেখা দেয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে হরিয়ানাতেও। এতে হারিয়ানায় ৪ লাখের বেশি পোলট্রি মুরগি মারা যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেরালা, হিমাচল প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, কর্ণাটক, তামিলনাড়ুতে সতর্কতা জারি করে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। অপরদিকে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ডসহ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে বার্ড ফ্লু এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস (এইচ৫এন৮)। মূলত অতিথি বা পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে এ ফ্লু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল ড. মঞ্জুর মোরশেদ খান আমাদের সময়কে বলেন, ভারতের পরিস্থিতি দেখে বার্ড ফ্লু নিয়ে দেশের পোলট্রি খামারিরাও উদ্বিগ্ন। এমনিতেই করোনা মহামারীতে খামারিরা বিপর্যস্ত। এর মধ্যে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়লে উদ্যোক্তারা মহাবিপদের সম্মুখীন হবেন। তিনি আরও বলেন, এর আগে ২০০৭ সালে বার্ড ফ্লুর থাবায় পোলট্রি খাতে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। যদিও এবার অনেকটাই প্রস্তুত আমরা। তবুও করোনার মধ্যে দেশে বার্ড ফ্লু ছড়ালে পোলট্রি খাতে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তা ছাড়া নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়বেন অনেক উদ্যোক্তা।

বার্ড ফ্লু নিয়ে মাঝারি ও ছোট উদ্যোক্তারা বেশি শঙ্কায় রয়েছে উল্লেখ করে এমআর পোলট্রি অ্যান্ড চিকসের কর্ণধার আহম্মেদ রাজু বলেন, বড় খামারগুলোতে মুরগি থাকে বেশি, তাদের পুঁজিও বেশি। সাময়িক ক্ষতি হলেও তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেন। কিন্তু আমাদের মতো মাঝারি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের দশ হাজার মুরগি মারা গেলে গোটা ব্যবসাটাই বন্ধ হয়ে যায়।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের তরুণ এ উদ্যোক্তা আরও বলেন, আমার এলাকায় খামারগুলোতে সোনালি, সোনালি হাইব্রিড, ফাউমি, গলাছিলা, টাইগার, খাকী ক্যাম্বল, বেইজিংসহ বিভিন্ন জাতে মুরগি ও মুরগির বাচ্চা তৈরি করা হয়। ভারতের পরিস্থিতি দেখে আমরা ইতোমধ্যেই নানা প্রস্তুতি নিচ্ছি। তবে ভাইরাসের ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ার ভয় কাজ করছে খামারিদের মনে।

বরিশাল ঝালকাঠি থানার আলোকদিয়া গ্রামের খামারি আবু বকর খানও বলেন, সরকারি ভ্যাকসিন সহজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে কোম্পানির ভ্যাকসিনের দাম বিভিন্ন সময় ওঠানামা করে। ফ্লু জাতীয় রোগের জন্য বাজারে আরই-৬, ভেকটোরমিউন +এইচভিটিসহ আরও কিছু ভ্যাকসিন রয়েছে। মহামারীর সুযোগ নিয়ে এগুলোসহ অন্যান্য ভ্যাকসিন ও প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রের বাজার যাতে অস্থির না হয়ে ওঠে সরকারের কাছে আমরা এ দাবি জানাই।

জানা গেছে, দেশের মানুষের প্রয়োজনীয় প্রাণিজ আমিষের ৪০ শতাংশ আসে পশুপাখি থেকে। পশুপাখি থেকে আসা মোট প্রাণিজ আমিষের এক-তৃতীয়াংশই আসে পোলট্রি থেকে। বর্তমানে পোলট্রির সংখ্যা প্রায় ৩১ কোটি। এর ৬০ শতাংশই নিবিড় ও আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে প্রতিপালিত খামারের পোলট্রি। বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি টাকার পোলট্রির বাজার গড়ে উঠলেও করোনার কারণে এ খাত ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে সারাদেশে পোলট্রি খামারির সংখ্যা বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ হাজার।

বার্ড ফ্লু রোগের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সরকারও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশে এ রোগের সংক্রমণ ও বিস্তাররোধে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে হাঁস-মুরগি ও পাখিজাতীয় প্রাণী যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সার্বিক বিষয় বিবেচনায় রেখে এ রোগের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধ এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে যাতে এ হাঁস-মুরগি এবং পাখিজাতীয় প্রাণী প্রবেশ করতে না পারে সে বিষয়ে নজর রাখতে চিঠি দিয়েছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নির্দেশনায় দেশের সীমান্তবর্তী জেলাসহ অন্যান্য জেলায় প্রতিদিন বার্ড ফ্লু রোগের অনুসন্ধান এবং সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক নজরদারির ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি-বেসরকারি খামারে নিবিড় তত্ত্বাবধানের জন্য চিঠিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো মৃত বা সন্দেহজনক হাঁস-মুরগি বা পাখি পাওয়া গেলে নমুনা সংগ্রহ করে দ্রুত কাছাকাছি ল্যাব থেকে পরীক্ষা করে ফল অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এ চিঠিতে।

পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা ভেটেরিনারি হাসপাতাল ও গবেষণাগারে পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষার কিট ও পিপিই জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ, খামারে জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষক ও খামারিদের সতর্ক করতে ব্যাপক প্রচার চালানো, বার্ড ফ্লু প্রতিরোধে এর টিকার বর্তমান মজুদ যাচাই করে দ্রুততার সঙ্গে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা গ্রহণেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে এ চিঠির মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, ইতোমধ্যেই আমরা জেলা পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতির নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। পাশাপাশি সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে এবং ফ্লু সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা মন্ত্রণালয়কে তাৎক্ষণিকভাবে জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, খামারিদের বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি বাংলাদেশে এ ফ্লুর সংক্রমণ ততটা হবে না। তারপরও পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে ভাইরাস আসতে পারে, তাই সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি আমরা।

 

 

 

advertisement
Evaly
advertisement