advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জঙ্গিবাদ ছেড়ে আলোর পথে ওরা ৯ জন

হাবিব রহমান
১৪ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২১ ১৩:৪৮
প্রতীকী ছবি
advertisement

স্বামী প্রকৌশলী, স্ত্রী চিকিৎসক। তাদের ফুটফুটে দুটি সন্তান। জঙ্গিবাদের ভয়াল থাবা হানা দেয় এ সুখের সংসারে। তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে সুখ-শান্তি। এর পরও স্বস্তিদায়ক বিষয় হচ্ছে- পরিবারটি অন্ধকারে পুরোপুরি নিমজ্জিত হওয়ার আগেই তাতে আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে র‌্যাব। ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়ার আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন প্রকৌশলী-চিকিৎসক দম্পতি। দীর্ঘদিন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের মস্তিস্ক থেকে ঝেড়ে ফেলা হয়েছে উগ্রবাদ।

উগ্রবাদ থেকে স্বাভাবিক জীবনে অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসার সহজ পথ পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থা র‌্যাবের সাম্প্রতিক উদ্যোগ ডি-রেডিক্যালাইজেশন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার ৯ জঙ্গি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করবে র‌্যাবের কাছে। এ আনুষ্ঠানিকতায় থাকছে ওই প্রকৌশলী-চিকিৎসক দম্পতিও।

জঙ্গিবাদ অথবা উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ তথা নির্মূলে কোমল পন্থা বা সফ্ট অ্যাপ্রোচের ওপর বরাবরই গুরুত্বারোপ করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা, যেখানে ডি-রেডিক্যালাইজেশন শব্দটি সর্বাধিক উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কঠোর পন্থার অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গিবাদ অথবা উগ্রবাদ ঠেকানো যাবে না। কারণ এটি একটি আদর্শিক লড়াই। মগজ ধোলাইয়ের

মাধ্যমে টার্গেট ব্যক্তিকে উগ্রবাদের অন্ধকার পথে নিয়ে যাওয়া হয়। তাই যেমন অসুখ, তেমন ওষুধ হিসেবে অভিযানের পাশাপাশি ডি-রেডিক্যালাইজেশনের মাধ্যমে উগ্রবাদের কথিত আদর্শিক বিষয় মোকাবিলা করতে হবে।

মার্কিন একটি গবেষণা জার্নালে দেখা গেছে, জঙ্গিবাদ নির্মূলের ক্ষেত্রে আভিযানিক কার্যক্রম মাত্র ২৫-২৬ শতাংশ। বাকি পুরো প্রক্রিয়া জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আদর্শিক ও সামাজিক লড়াই, যার সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যুক্ত থাকেন।

বিশে^র বিভিন্ন দেশের আদলে বাংলাদেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডি-রেডিক্যালাইজেশন ইউনিট শুরুর উদ্যোগ নেয় র‌্যাব। বিশেষায়িত এই ইউনিট উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। এই প্রক্রিয়ার আওতায় প্রথম ধাপে ৯ জঙ্গি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য রয়েছে।

‘নব দিগন্তে প্রত্যাবর্তন’- এই সেøাগান সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার র‌্যাব সদর দপ্তরের শহীদ লে. কর্নেল আজাদ মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত এ আত্মসমপর্ণ অনুষ্ঠানে থাকবেন একাডেমিশিয়ান, ইসলামি স্কলার, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

র‌্যাব জানায়, এর আগে পাইলট প্রকল্পের আওতায় সাত জঙ্গিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের মধ্যে একজন হিযরত করে ঘরছাড়ার পর র‌্যাবের পাইলট প্রকল্পের আওতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার নজির রয়েছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ওই ব্যক্তি অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য দেবেন। তবে ৯ জঙ্গির মধ্যে একজনের নামে মামলা থাকায় আত্মসর্পণের পর তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উগ্রবাদের নির্দিষ্ট একটি সীমা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত ডি-রেডিক্যালাইজেশনের সুযোগ রাখা হচ্ছে। ওই সীমা পার হলে তার জন্য আইনিব্যবস্থা অবধারিত। সাধারণত ৫টি পর্যায়ে একজন মানুষ উগ্রপন্থার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে সহিংস কর্মকা-ে অংশ নেন। প্রাথমিকভাবে টার্গেট ব্যক্তি উগ্রপন্থার প্রতি সহমর্মী থাকেন। দ্বিতীয় ধাপে তিনি উগ্রবাদের সমর্থকে পরিণত হন। পরবর্তীকালে তৃতীয় ধাপে তিনি উগ্রবাদী কার্যক্রমে অংশ নেন। চতুর্থ ধাপে এসে নিজেকে উগ্রপন্থি হিসেবে পরিণত করেন। সর্বশেষ ধাপে সহিংস উগ্রবাদী কর্মকা- চালান।

র‌্যাব জানায়, আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া জঙ্গিদের পুনর্বাসনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের জন্য মানানসই পেশায় ফিরতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া এক তরুণী পড়তে বিদেশে যান। কিন্তু তিনি জঙ্গি দলে ভিড়ে দেশে ফেরৎ এসেছেন সেটি তার পরিবার জানতেন না। এখন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পর তার পড়ালেখা শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এভাবে কাউকে কৃষিকাজের জন্য গরু, কাউকে আবার পাওয়ার ট্রিলার মেশিন কিনে দেওয়া হচ্ছে।

র‌্যাব জানায়, ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেব আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া ৯ জঙ্গি ব্যক্তিভেদে ছয় মাস থেকে দুই মাস পর্যন্ত র‌্যাবের তত্ত্বাবধায়নে ছিলেন। প্রথমে ভিকটিম পরিবারের আগ্রহের ভিত্তিতে র‌্যাব তাদের ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়ায় আনার কার্যক্রম শুরু করে।

সূত্র জানায়, মূলত তিনটি ধাপে উগ্রপন্থায় পা দেওয়া ব্যক্তিদের ডি-রেডিক্যালাইজেশনের আওতায় আনা হয়। প্রথমত তাকে ভয় দেখানো হয়। মানে অন্ধকার জীবন ছেড়ে না এলে ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে তা বোঝানো হয়। দ্বিতীয়ত তাকে সব জঙ্গি নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তৃতীয়ত মোটিভেশনের মাধ্যমে তার উগ্রবাদী চিন্তা-চেতনা বা আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা হয়।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার আমাদের সময়কে বলেন, আমরা ভেবে দেখেছি উগ্রপন্থায় যুক্ত হওয়া ব্যক্তিদের আইনের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া আর কী করা যায়। শুধু অভিযানের মাধ্যমে তাদের গুঁড়িয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা কঠিন। কারণ জঙ্গিবাদ মানুষের মস্তিস্কে থাকে। অপারেশনাল কার্যক্রমের পাশাপাশি জঙ্গিবাদ সমূলে উৎপাটনের জন্য ডি-রেডিক্যালাইজেশন কার্যক্রম শুরু করেছে র‌্যাব। এ জন্য আমরা সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে যুক্ত করেছি। এটি কিন্তু র‌্যাবের একার কাজ নয়; সবার সমন্বিত উদ্যোগের ফলে জঙ্গিবাদের কথিত আদর্শকে ঝেড়ে ফেলা সম্ভব হবে বলেও মনে করেন র‌্যাবের এ কর্মকর্তা।

২০১৬ সালে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজানে নৃশংস জঙ্গি হামলার ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত র‌্যাবের কাছে ৭ জন জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেছে। মূলত সরকারের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় র‌্যাব তাদের কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে এখানে সফলতা পাওয়ার পর এটি স্থায়ী রূপ দিতে কাজ করছে র‌্যাব।

উল্লেখ্য, ডি-রেডিক্যালাইজেশন প্রক্রিয়া শুরু হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটির উগ্রবাদে যুক্ত ব্যক্তিদের বিচারিক কাজে নিয়োজিত বিচারক মিকাইল ডেভিস প্রথমে ডি-রেডিক্যালাইজেশনের কার্যক্রম শুরু করেন। পরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ বিশে^র বেশ কিছু দেশে সরকারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডি-রেডিক্যালাইজেশন সেন্টার বা ইনস্টিটিউট গড়ে উঠছে। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার জঙ্গিকবলিত দেশ পাকিস্তানেও রয়েছে এ ধরনের উদ্যোগ।

advertisement
Evaly
advertisement