advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

একুশ সালেও বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভাবনাময়

মাহফুজুর রহমান
১৪ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২১ ২৩:২৯
advertisement

করোনা নিষ্পেষিত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ২০২০ সালে অনেক উত্থান-পতন দেখা গেলেও বছর শেষে অর্থনীতির উল্লম্ফন না হোক, অন্তত ডিগবাজি খায়নি। বিশ্ব অর্থনীতির উদাহরণকে অনুসরণ না করে নিজেরাই উদাহরণ সৃষ্টি করতে পেরেছে। এগিয়ে গেছে আমাদের অর্থনীতির অনেক সূচক। এই দুর্যোগকালে বাংলাদেশের অর্থনীতির এগিয়ে চলা আজ অনেক অর্থনীতিবিদের গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের সময়ে ৫ জানুয়ারির উপ-সম্পাদকীয় পাতায় ‘বিদায় সংকট উৎকণ্ঠার ২০২০ : স্বাগত সম্ভাবনাময় ২০২১’ শীর্ষক নিবন্ধে গত বছরের অভ্যন্তরীণ খাতের অবস্থা, বিশেষ করে দেশে মুদ্রা সরবরাহ, তারল্য ও সুদহার, মূল্যস্ফীতি এবং কৃষি ও এসএমই ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। আজ দেশের বৈদেশিক খাতের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

প্রথমেই আসা যাক রপ্তানি আয় প্রসঙ্গে। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) জুলাই থেকে নভেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত মোট এফওবি রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৩৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি করোনাজব্দ অর্থবছরের একই সময়ে অর্থাৎ জুলাই থেকে নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি পূর্ববর্তী বছর অপেক্ষা শতকরা শূন্য দশমিক ৮৬ ভাগ বেশি। অগ্রগতির পরিমাণ আপাতদৃষ্টিতে যৎসামান্য পরিলক্ষিত হলেও মনে রাখতে হবে, বিবেচনাধীন এ সময়টি ছিল বিশ্বব্যাপী এক কঠিন সময়। কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের ফলে বিশ্বের সর্বত্র লকডাউন পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল। এ সময় উৎপাদক থেকে শুরু করে আমদানিকারী ও ভোক্তা পর্যন্ত সবাই দুর্যোগময় পরিস্থিতির শিকার এবং ক্রয় বা ভোগবিমুখ ছিলেন। মানুষ কেবল জরুরি ও জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ছাড়া অন্য কোনো কিছু কেনার পরিস্থিতিতে ছিল না। বিশ্বের বহু দেশের রপ্তানি আয় এ সময়ে কমে গেছে। এ বিবেচনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় সামান্য হলেও বেড়েছে। তা অত্যন্ত আনন্দের কথা। করোনা ভ্যাকসিন এ মাসেই চলে আসবে এবং করোনাভীতি কিছুটা হলেও ধীরে ধীরে কমবে। একই সঙ্গে ২০২১ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অনেকটাই বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত দেশের এফওবি আমদানি ব্যয় ছিল ২০ হাজার ২৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ২২ হাজার ২০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ বছরের ব্যয় গত বছরের চেয়ে শতকরা ৮ দশমিক ৮৪ ভাগ কম। দেশে কোভিড ১৯-এর প্রাদুর্ভাব ও লকডাউনের কারণে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় আমদানির পরিমাণ কমেছে। এ সময়ে নতুন শিল্প স্থাপন, শিল্প-কারখানার পরিসর বৃদ্ধিকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তেমন অগ্রগতি ছিল না। তাই মেশিনারি আমদানির পরিমাণ কমে যায়। তা ছাড়া বেশকিছু সময় কল-কারখানা বন্ধ থাকায় কাঁচামাল আমদানিও কমে যায়। অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে বিলাস পণ্যাদির আমদানিও কমে। চলতি বছর আমদানির পরিমাণ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

লকডাউনের শুরুতে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এ বছর বৈদেশিক মুদ্রার অন্তঃপ্রবাহ হ্রাস পাবে। তা দেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ঘটনা ঘটেছে ঠিক উল্টো। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৮৯৪ দশমিক ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পূর্ববর্তী অর্থবছরে একই সময় অন্তর্মুখী প্রবাসী রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৭১৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অর্থাৎ পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছর রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা ৪১ দশমিক ১৮ ভাগ। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির এরূপ কারণ প্রধানত, হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার কর্তৃক ২ শতাংশ প্রণোদনা প্রদান। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে চাকরিরত অনেক প্রবাসী সাময়িকভাবে দেশে ফিরে আসার সময় ওখানে জমাকৃত বা নিয়োগকর্তা কর্তৃক প্রদত্ত টাকা দেশে পাঠিয়েছেন কিংবা নিয়ে এসেছেন। প্রবাসীদের ভেতর যারা ফিরে এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপে প্রত্যাগমন করতে শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, বিদেশগামী বাংলাদেশিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপর অধিক জোর প্রদান করা হবে। এসব কারণে ভবিষ্যতে অন্তর্মুখী রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বর্তমান অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস ও রেমিট্যান্সের অন্তঃপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ৪ হাজার ১০৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্বৃত্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী বছরের একই সময় এ খাতে ১ হাজার ৪৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি ছিল। আলোচ্য সময়ে আর্থিক হিসাবে ৯৪৯ মিলিয়ন এবং দেশের সার্বিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ৫ হাজার ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উদ্বৃত্ত পরিলক্ষিত হয়। পূর্ববর্তী বছরের একই সময় সার্বিক বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে ৩০৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি ছিল। চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত বাংলাদেশের অর্থনীতির ললাটে এবারই প্রথম না হলেও এটি বহুল আকাক্সিক্ষত। এই দুর্যোগকালে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকায় অর্থনীতির মেরুদ- অনেকটা শক্ত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।

নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমানে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ উপচিতি (অঢ়ঢ়ৎবপরধঃরড়হ) ঘটেছে। অর্থাৎ টাকার মূল্য সামান্য বেড়েছে। নভেম্বর ২০১৯ শেষে প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল ৮৪ দশমিক ৯০ টাকা। নভেম্বর ২০২০ শেষে ডলারপ্রতি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৪ দশমিক ৮০ টাকা। দেশে অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বেড়ে যাওয়ার ফলে দেশে অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা এসেছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় কমেছে, বিদেশ ভ্রমণ প্রায় নেই বললেই চলে। বিদেশে চিকিৎসা করতে গমনেচ্ছুরাও তা করতে পারছেন না। ফলে ডলারের চাহিদা কমে যাওয়ার কথা। এরূপ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকার মান কাছাকাছি পর্যায়ে বহাল রাখার জন্য প্রয়োজন অনুসারে ডলার কিনে থাকে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে টাকার মান কাছাকাছি বহাল রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক। কারণ এতে আমদানিকারী, রপ্তানিকারী বা রেমিট্যান্স পাঠানোদের কেউই ঝুঁকির সম্মুখীন হন না এবং আগেভাগেই একটি কার্যকর পরিকল্পনা করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য ক্ষেত্রমতো প্রয়োজন অনুসারে বাজারে ডলার বিক্রি করে মূল্যমান স্থিতিশীল রাখে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির সফলতার আরেক সোপান হচ্ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৫তম বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংরক্ষণকারী দেশে পরিণত হয়েছে। নভেম্বর ২০১৯ ও নভেম্বর ২০২০ শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩১ হাজার ৭২৯ মিলিয়ন ও ৪০ হাজার ৮৮৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর বছর শেষে গত ৩০ ডিসেম্বর রিজার্ভ দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ১৭০ মার্কিন ডলারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর ভেতর ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বছর শেষে কমেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রিজার্ভ রক্ষণকারী দেশ হিসেবে ভারত বর্তমানে পঞ্চম, পাকিস্তান ৭১তম, নেপাল ৭৫তম, মিয়ানমার ৯৫তম ও শ্রীলংকা ৯৬তম স্থানে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ১৩ হাজার ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স ও রপ্তানি বৃদ্ধি, আমদানি হ্রাস এবং বৈদেশিক ঋণপ্রাপ্তি ইত্যাদি কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।

নতুন বছরের শুরুতে অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি শুরু হয়েছে ইতিবাচক ধারায়। রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া খাতগুলো, বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে গতিশীলতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবাসীরাও নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে শুরু করেছেন। বন্ধ শিল্প-কারখানাগুলো ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। নতুন নতুন ব্যবসা স্থাপনের জন্য উদ্যোক্তাদের নানাবিধ উদ্যোগও লক্ষণীয় হচ্ছে। সর্বোপরি কারখানা স্থাপন বা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা চোখে পড়ছে। করোনা মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সরকার প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এ বিষয়গুলো অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে সরকারের জোরালো পদক্ষেপ অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। অর্থপাচার রোধে সরকারের কঠোর অবস্থানও অর্থনীতিকে জ্বালানি জোগাবে। আর এই অনুকূল পরিবেশ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ২০২১ সালে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লিমিটেড ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

advertisement
Evaly
advertisement