advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

অভিভাবকরা সন্তানের কাছে রোল মডেল হতে পারছেন না

আফরিন আপ্পি
১৪ জানুয়ারি ২০২১ ১৪:৪৯ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২১ ১৫:১১
advertisement

রাজধানীর কলাবাগানে রক্তক্ষরণে কিশোরীর মৃত্যুর ঘটনায় শঙ্কিত অভিভাবকরা। এ ঘটনা প্রমাণ করে কতটা হুমকির মুখে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাধীনতা, বাবা-মায়ের সঠিক প্যারেন্টিংয়ের অভাব, নিষিদ্ধ জিনিসে কৌতুহল, প্রযুক্তির অপব্যবহার তাদেরকে ভুল পথে চালিত করছে।

যৌন শিক্ষার অপর্যাপ্ততা তাদেরকে করে তুলছে যৌন বিষয়ে ধ্বংসাত্মক। যৌনতার মতো স্বাভাবিক বিষয়ে যে ট্যাবু সমাজে প্রচলিত তা অল্প বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে কৌতুহল বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া প্রযুক্তির কল্যাণে অ্যাডাল্ট সাইটগুলো এখন সবার হাতের মুঠোয়, যা তাদেরকে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হতে সাহায্য করছে।

শঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুহম্মদ মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, ‘আমার একটি কিশোরী মেয়ে আছে। এ ঘটনার পর থেকে আমার সন্তানদের নিয়ে আমি ভীষণভাবে শঙ্কিত।’

ফারুকী বলেন, আমরা আমাদের সন্তানদের সঠিকভাবে কাউন্সিলিং করতে পারছি না। কো-এডুকেশনগুলোতে ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনা করছে। এ থেকেও তাদেরকে বিভিন্ন জিনিস শেখানো যায়। যেমন, ছেলেটিকে বোঝানো যেতে পারে বাড়িতে তোমার যেমন একটা বোন আছে; তুমি যার সাথে লেখাপড়া করছো সেও তোমার বোনের মতো‌। ঠিক একইভাবে মেয়েটিকেও বোঝানো যেতে পারে।

ছেলে-মেয়েদেরকে নজরদারিতে রাখা খুব প্রয়োজন। কখন কোথায় যাচ্ছে? কী করছে? সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সেক্স এডুকেশনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদিও আমাদের ধারণা শিক্ষা ব্যবস্থায় এটি অন্তর্ভুক্ত হলে ছেলে-মেয়েরা অল্প বয়সে ইঁচড়ে পাকা হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি তেমন নয়। সন্তানদের অবশ্যই বোঝাতে হবে কোনটা করা যাবে এবং কোনটা করা যাবে না। বড় হলে এমনিতেই শিখবে। আমরা কি শিখি নাই? এগুলো আবার বলার কথা নাকি? এইসব ভেবে আমরা হেলাফেলা করে শারীরিক শিক্ষা, যৌন শিক্ষাকে সিন্দুক বন্দী করে রাখছি বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসক ছাবিকুন নাহার।

দুই সন্তানের এই জননী বলেন, ‘আমাদের হেলথ এডুকেশন আর সেক্স এডুকেশন অতিমাত্রায় অবহেলিত বলেই এডোলেসেন্স জনগোষ্ঠী যৌনতা নিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে। ধৈর্য্য সহকারে সন্তানকে বোঝাতে হবে। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, পাঠ্য বইয়ে সবখানে। ধর্মীয় অনুশাসন মানি এবং মানতে বলি। সন্তানকে দূরে ঠেলে নয়, কাছে টেনেই কঠিনে কোমলে সঠিক শিক্ষাটা দিতেই হবে। লুকিয়ে না থেকে, লুকিয়ে না রেখে সন্তানকে সঠিক শিক্ষাটা দেই। তার শরীরটা চেনাই। কোন কাজ কখন করতে হয়, কখন নয়, এটা বলতে হবে।’

অনেকে আবার মনে করছেন এ ধরনের ঘটনা এখনই নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই নৈতিক স্খলনের এমন নানা নজির রয়েছে। তবে সেগুলো চার দেয়ালের মাঝে বন্দী থাকায় আমরা জানতে পারছি না। একটা চরম মুল্য দিয়ে আমাদের সামনে এসেছে। প্যারেন্টিংয়ের দায়টা এক্ষেত্রে অনেক বেশি বলে মনে করছেন মনোবিজ্ঞানীরা।

মনোবিজ্ঞানী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক উভয় পরিবর্তন খুব দ্রুত ঘটতে থাকে। তাদের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তন আসে। তারা আত্মপরিচয় খুঁজতে থাকে, বন্ধুবান্ধব দ্বারা প্রচন্ড প্রভাবিত হয়, স্বাধীনতা চায়, নিজের পছন্দ-অপছন্দগুলোকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে।হরমোনাল কারণে তাদের মাঝে আবেগের প্রাবাল্য পরিলক্ষিত হয়। এই যে পরিবর্তনগুলো এগুলো নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক বা অন্য যারা আছেন তারা বিষয়গুলো জানলেও সেটা কি করে এই বয়সীদের সুন্দরভাবে শেখাতে হবে তা অনেকেরই অজানা।’

এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, ‘বর্তমানে একটা অস্থির সমাজে আমরা আছি। সেখান থেকে কিশোর-কিশোরীরা পরিবার এবং সমাজ থেকে অস্থিরতা দেখে তার দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। নৈতিকতার শিক্ষা যা পরিবারগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি শেখানো হয়। সেই পরিবারগুলো সন্তানদের কী শেখাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মূলত কিশোর-কিশোরীদের কাছে যে অভিভাবকরা রোল মডেল হওয়া উচিৎ ছিলো সেই অভিভাবকগুলো রোল মডেল হয়ে উঠতে পারছেন না।’

বিষয়টি সমাজ থেকে উদ্ভূত মন্তব্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বলেন, ‘এটি সমাজের ইন্ডিভিজ্যুয়াল ব্যাধি নয়। এটি একটি সমষ্টিগত সমস্যা। এ ঘটনাটি যার প্রকাশিত রূপ। আমাদের ইয়ং জেনারেশনের মধ্যে নারীদের নিয়ে এক ধরনের মিথ কাজ করে। নারী দেহকে তারা সোর্স অব প্লেজার হিসেবে দেখে। পর্নোগ্রাফি থেকেই তারা মোটিভেশনটা পেয়ে থাকে।’

বর্তমানে ভালোবাসার সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একজন ব্যক্তি একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলছেন এবং ছেলে মেয়েদের ক্ষেত্রে যে যত বেশি ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারছে সেটাকে তার ক্রেডিট বলে মনে করছে। এজন্য সমাজ, মিডিয়া, পারিবারিক পরিবেশ অনেকটা দায়ী। আমাদের দেশে প্যারেন্টাল গাইডটা ঠিকমতো হয় না। বাইরের দেশগুলোতে ছোট থেকেই শিশুদের সেক্স এডুকেশন দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সেটি সম্পূর্ণভাবে অবহেলিত। যে কারণে বন্ধুদের দ্বারা মিডিয়া ও পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে তারা এসব বিষয়ে ভুল তথ্য পাচ্ছে এবং ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে।

advertisement
Evaly
advertisement