advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

সহিংসতা-বর্জনেই ভোট

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২১ ০৮:১৬
advertisement

মাঘের কনকনে শীত ও করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি, জবরদস্তির অভিযোগ ও বিএনপির বর্জনের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে দ্বিতীয় ধাপের ৬০ পৌরসভা নির্বাচন। গতকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টায় শেষ হলেও কয়েক জায়গায় ভোটারদের লাইন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোট চলে। বিচ্ছিন্নভাবে কয়েক জায়গায় সহিংসতা, ভোটার ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও বেশিরভাগ পৌরসভায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণের খবর পাওয়া গেছে।

রাতে সিরাজগঞ্জে জয়ী কাউন্সিলর প্রার্থীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের তথ্য অনুসারে অধিকাংশ পৌরসভায়ই নৌকা সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আওয়ামী লীগ ৩৬, বিএনপি ৪, স্বতন্ত্র ৩ ও জাসদ একটিতে জয়লাভ করেছে। এই ভোটকে অবশ্য অংশগ্রহণমূলক বলতে নারাজ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার।

গতকাল বিকালে আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে লিখিত বক্তব্যে মাহবুব তালুকদার বলেন, আমি সাভার পৌরসভার তিনটি ভোটকেন্দ্রের ১৮টি বুথ পরিদর্শন করি। বেলা ১টা পর্যন্ত ওইসব ভোটকেন্দ্রে ৭ হাজার ৩১১ জন ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ২৩২ জন ভোট দেন। তিনটি বুথে তিনজন বিরোধীদলীয় প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট দেখতে পাই কিন্তু অন্য কোথাও এজেন্ট ছিলেন না। এ ছাড়া সাভার পৌর এলাকায় বিরোধীদলীয় প্রার্থীর কোনো পোস্টার দেখতে পাইনি। এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যায় না। যে কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে তা সিদ্ধ হয় না। একতরফা নির্বাচন কখনো কাম্য নয়।

এ কমিশনার বলেন, পৌরসভার নির্বাচনে ক্রমাগত সহিংসতা বেড়ে চলেছে। সহিংসতা ও নির্বাচন একসঙ্গে চলতে পারে না। নির্বাচন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন না হলে এই সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে সবার ঐকমত্য আবশ্যক। যে কোনো নির্বাচনের চেয়ে মানুষের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তবে সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভালো ছিল বলে দাবি করেছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর। গণমাধ্যমের খবরের উদ্ধৃতি দিয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, সুন্দরভাবে ভোট হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে। আপনাদের যে প্রচারমাধ্যম সেখানে দেখিয়েছেন প্রচুর ভোটার উপস্থিতি। তারা ভোট দিয়েছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। মানুষ সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবার সহযোগিতায় একটি সুন্দর নির্বাচন করা সম্ভব হয়েছে।

সহিংসতা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ইসি সচিব বলেন, দু-একটি ঘটনা যা ঘটেছে তা একেবারেই নগণ্য বলা যেতে পারে। কিছু কিছু এলাকায় দুষ্কৃতকারী কিছু সুযোগসন্ধানী যা সব সময় থাকে। দুষ্কৃতকারীরা চেষ্টা করে নির্বাচনের পরিবেশ ক্ষুণ্ন করার জন্য যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে। তারা নির্বাচনের কাজকে বিঘ্ন করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এটাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তাদের নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

৬০টি পৌরসভার মধ্যে রাজশাহীর বোয়ালমারী পৌরসভার একটি কেন্দ্রে দুষ্কৃতকারীরা ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা ব্যালট পেপার নিয়ে যেতে পারেনি। তবে ব্যালট বাক্স যেহেতু ভেঙে গেছে, প্রিসাইডিং অফিসার ওই নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছেন। কিশোরগঞ্জেও একটি কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, সেটাও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৬০টি পৌরসভার সব কেন্দ্রে সুষ্ঠুভাবে ভোট সম্পন্ন হয়েছে।

নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এমন অভিযোগের জবাবে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আর নিরপেক্ষ নির্বাচন ভিন্ন বিষয়। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। নির্বাচনে যদি কেউ না আসে তা হলে নির্বাচন কমিশনের কিছু করণীয় নেই। নির্বাচনে আসা না আসার বিষয়ে রাজনৈতিক দলের একটি কৌশল হতে পারে।

ভোটের শতকরা হার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত আমরা যে তথ্য পেয়েছি সেখানে ইভিএমে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। ব্যালটে যে তথ্য পেয়েছি, তাতে সর্বোচ্চ ৭৫ পার্সেন্ট এবং সর্বনিম্ন ১৫ পার্সেন্ট ভোট পড়েছে। অবশ্য এটি চূড়ান্ত হিসাব নয়। সার্বিক হিসেবে থেকে ৭০-৭৫ শতাংশ ভোট পড়তে পারে।

দ্বিতীয় ধাপে ৬১টি পৌরসভায় ভোটগ্রহণের পরিকল্পনা থাকলেও নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌরসভার একজন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত করা হয়। বাকি ৬০টি পৌরসভার ৫৬টিতে মেয়র পদে ভোট হয়। নারায়ণগঞ্জের তারাব, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর, পাবনার ভাঙ্গুড়া ও পিরোজপুরে মোট চারটি পৌরসভায় ভোটের আগেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছেন। তাই বাকি ৫২টিতে মেয়র পদে ভোট হয়। এর মধ্যে ২৯টি পৌরসভায় ইভিএমে এবং বাকি ৩১টি পৌরসভায় কাগজের ব্যালটে ভোট হয়।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিরাজগঞ্জ : নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় তরিকুল ইসলাম খান নামের বেসরকারিভাবে জয়ী কাউন্সিলর প্রার্থী প্রতিপক্ষের ছুুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন। তিনি পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডে বিজয় লাভ করেছিলেন। ফল ঘোষিত হওয়ার পর তাকে শহীদগঞ্জ কেন্দ্রে ছুরিকাঘাত করা হয়। একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানেই রাত ৮টায় মারা যান। অভিযোগ রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকরা তাকে ছুরিকাঘাত করেন।

কিশোরগঞ্জ : ওয়ালীনেওয়াজ খান কলেজের দুটি কেন্দ্রে গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীর মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ঘটে। এতে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ সুমন ও জেলা ছাত্রদল সদস্য হিমেলসহ উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জেলা রিটার্নিং অফিসার মো. আশ্রাফুল আলম ওই কেন্দ্র পরিদর্শন করে ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করেন।

মোহনগঞ্জ : নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৯টায় প্রতিপক্ষের হামলায় ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক (গাজর প্রতীক) গুরুতর আহত হন। এতে তার হাত ভেঙে যায়। একই কেন্দ্রে বেলা ২টায় কাউন্সিলর প্রার্থী আল্লাদ মিয়ার সঙ্গে অন্য কাউন্সিলরদের বাদানুবাদের ঘটনার জেরে ভোটকেন্দ্রের বাইরে সংঘর্ষ ঘটে। এতে ছয়জন আহত হন। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্বপন নামে একজনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে পাঠানো হয়। এ ঘটনার পর পরই আদর্শ হাইস্কুল কেন্দ্রের বাইরে প্রতিপক্ষের হামলায় কাউন্সিলর প্রার্থী ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি শফিকুল আলম ও টেংগাপাড়ার শফিকুল ইসলাম আহত হন।

বগুড়া : শেরপুর পৌরসভা নির্বাচনে হিন্দু ভোটার সেজে জালভোট দিতে যাওয়া আবু সাঈদ সরকার নামে এক যুবককে আটক করা হয়। সকাল সোয়া ১০টার দিকে শহরের ডিজে হাইস্কুল ভোটকেন্দ্র থেকে তাকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদ- দেন।

কুষ্টিয়া : কুমারখালীতে জালভোট দিতে গিয়ে দুই কিশোর আটক হয়। সকালে তেবাড়িয়া জয়বাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে তাদের আটক করা হয়। তারা হলো তেবাড়িয়া গ্রামের দুলালের ছেলে মামুন ও লিটনের ছেলে সজল।

কুমিল্লা : চান্দিনা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের হারং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৯টার দিকে কাউন্সিলর প্রার্থী বিল্লাল হোসেনের সমর্থকদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর প্রার্থী নাজমুল হাসানের সমর্থকদের সংঘর্ষ হয়। এতে চারজন আহত হন।

পাবনা : ঈশ্বরদী পৌরসভা নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী রফিকুল ইসলাম হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ করেন। সকালে পৌর এলাকার ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে।

রফিকুল অভিযোগ করেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি ওই কেন্দ্রে এসে লাইনে ছিলেন। এ সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন কর্মী-সমর্থক এসে তাকে শার্টের কলার ধরে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। এতে তিনি হাতে আঘাত পান।

ফেনী : দাগনভূঞা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গণিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের আশপাশে সকাল ১০টার দিকে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে মো. আরিফ নামে এক আনসার সদস্যসহ চারজন আহত হন।

বাগেরহাট : মোংলায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হন।

ঝিনাইদহ : শৈলকুপায় সংঘর্ষে দুজন আহত হন। এ ছাড়া এক মেয়রপ্রার্থীর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।

মাগুরা : শহরের ভিটাসাইর কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে শাওন মীর নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। বিএনপির মেয়রপ্রার্থীসহ একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থী তাদের এজেন্টদের ওপর প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেন।

বগুড়া : সারিয়াকান্দি পৌরসভা নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাহাদৎ হোসেন নামে এক যুবলীগকর্মীকে এক বছরের কারাদ- দেওয়া হয়। শনিবার দুপুরে পৌর এলাকার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে তাকে এই দ- দেন নির্বাচনী এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিষ্কৃৃতি হাকিদার।

বোয়ালমারী : ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌরসভা নির্বাচনে একটি কেন্দ্রের ব্যালট বাক্স ছিনিয়ে নিয়ে আগুন দিয়ে ব্যালট পেপার পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্রটির নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যেরগাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় এ ঘটনা ঘটে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা ও উপজেলা ও থানা প্রতিনিধিরা

advertisement
Evaly
advertisement