advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

রাজধানীতে সার্কুলার রেলের পরিকল্পনা
সমীক্ষার ২৪ কোটি টাকাই জলে

তাওহীদুল ইসলাম
২৮ জানুয়ারি ২০২১ ০০:০০ | আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২১ ০৮:৪৫
পরিকল্পিত সার্কুলার রেল
advertisement

যানজট এড়িয়ে রাজধানী ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের লক্ষ্যে এ নগরীকে ঘিরে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি অর্থায়নে এ সংক্রান্ত প্রকল্পের লক্ষ্যে একটি সমীক্ষাও করা হয়েছে। কিন্তু এ সমীক্ষার অনেক তথ্য-উপাত্তই বাস্তবসম্মত নয়, বরং হাস্যকর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সমীক্ষায় যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কার্যত তা জলে গেছে।

গতকাল বুধবার রেল ভবনে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এ প্রতিবেদন সম্পর্কে মতামত জানাতে সরকারের অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদেরও সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইতোমধ্যেই ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয় হওয়া সেই সমীক্ষায় ঢাকাকে ঘিরে ৮০ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দূরত্বের ইলেকট্রিক রেলপথ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়েছে ৭১ হাজার কোটি টাকা। আকাশচুম্বী এ অর্থ ব্যয়ে রেলের সামর্থ্য রয়েছে কিনা, বিপুল অঙ্কের প্রাক্কলন ব্যয়ের তথ্যে এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ তো শুধু শুরু। সমীক্ষার আরও অনেক বিষয় নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, এ পথে রোজ সাড়ে ১০ লক্ষাধিক যাত্রী যাতায়াত করবেন। অর্থাৎ বছরে ৩৯ কোটি যাত্রী পরিবহন করবে সার্কুলার রেলপথ। সারাদেশের ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে সারাবছরে যাত্রী হয় সাকুল্যে সাড়ে নয় কোটি। বর্তমান প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হারে বাড়লেও ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪০ কোটি যাত্রী হবে না রেলে। আর ৮০ কিলোমিটার বৃত্তাকার রেলপথে বছরে ৩৯ কোটি যাত্রীর পরিকল্পনা আকাশকুসুম ভাবনার মতোই, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পে যে ব্যয় হবে, তা কীভাবে উঠে আসবে? এ প্রশ্নের যে সমাধান দেওয়া হয়েছে সমীক্ষায়, সেটিও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন অনেকেই। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ২০৩৫ সালকে ভিত্তিবছর ধরে দেখানো হয়েছে, বছরে ৩ হাজার ১৬০ কোটি টাকা আয় হবে। বলা হচ্ছে, এটিও মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

রেলের কর্মকর্তারা বলছেন, সারাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে রেল বছরে দেড় কোটি টাকার মতো আয় করতে পারে। আর একটি লাইন থেকে ১৫ বছর পর বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব নয়। সবকিছু মিলিয়ে সাড়ে ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে করা সমীক্ষার অনেক তথ্যই বাস্তবতার নিরিখে করা হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে।

বৃত্তাকার রেলপথের সম্ভাব্য রুট নির্ধারণ ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে সিয়ুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেড যৌথভাবে এ সমীক্ষা করেছে। সরকারি অর্থায়নে এ সমীক্ষা করা হয়।

গতকালের বৈঠকে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশাধিকার ছিল না। সূত্রের খবর, বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) সার্কুলার রেলপথ নির্মাণের কথা জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। জানা গেছে, ২০১৯ সালে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর এখনো এ প্রকল্পে আগ্রহ দেখায়নি কোনো প্রতিষ্ঠান।

সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে বলা হয়- সার্কুলার রেলপথ নির্মাণে ৮ দশমিক ৩৭ কোটি বিলিয়ন ডলার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা টাকার হিসাবে ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতি কিলোমিটারে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থাৎ ৮৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বৃত্তাকার রেলপথে ২০৩৫ সালে দৈনিক ১০ লাখ ৬৫ হাজার এবং ২০৫৫ সালে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার যাত্রী হবে। বছরে ৩৯ কোটি যাত্রী পরিবহন করবে সার্কুলার রেলপথ। তবে এ সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

রেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সারাদেশে ২ হাজার ৮০০ কিলোমিটার রেলপথে সারাবছরে সাড়ে নয় কোটি যাত্রী হয়। বর্তমান প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী বাড়লেও ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪০ কোটি যাত্রী হবে না রেলে। আর ৮০ কিলোমিটার বৃত্তাকার রেলপথে বছরে ৩৯ কোটি যাত্রীর পরিকল্পনা রেলের। সমীক্ষায় রেলপথ নির্মাণের ব্যয় তুলে আনার পথ দেখানো হয়েছে। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ টাকা ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে যোগ হয়ে ভিত্তি ভাড়া হবে ৩০ টাকা ৬ পয়সা। সব মিলিয়ে বৃত্তাকার রেলপথের পুরোটায় ভ্রমণ করলে ৩৩৭ টাকা ভাড়া আসবে। ২০৩৫ সালে বছরে ৩ হাজার ১৬০ কোটি টাকা আয় হবে। যদিও এ অঙ্ককে আকাশকসুম বলছেন রেলের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, সারাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহন করে রেল বছরে দেড় কোটি টাকার মতো আয় করতে পারে। আর একটি লাইন থেকে ১৫ বছর পর বছরে ৩ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব নয়। তারা বলছেন, ৭১ হাজার কোটি টাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো অবস্থা রেলের নেই।

এদিকে রাজধানী ঘিরে একই পথে ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ)। সড়কের পাশ দিয়ে রেলপথ নির্মাণ করতে চায় রেলওয়ে। প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের স্টেশনগুলো হবে- ধউর, উত্তরা, চিড়িয়াখানা, চিড়িয়াখানা দক্ষিণ, গাবতলী, মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, সদরঘাট, পোস্তগোলা, পাগলা, ফতুল্লা, চাষাঢ়া, চিত্তরঞ্জন, আদমজী, সিদ্ধিরগঞ্জ, ডেমরা, ত্রিমোহনী, বেরাইদ, পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল উত্তর, ত্রিমুখ, টঙ্গী ও বিশ্ব ইজতেমা মাঠ। অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা মাঠ থেকে শুরু হয়ে ঢাকাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ফের বিশ্ব ইজতেমায় এসে শেষ হবে এ রেলপথ। গাবতলী, সদরঘাট ও পোস্তগোলা স্টেশন হবে পাতালে। গতকাল রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, বৃত্তাকার রেলপথ হলে ঢাকা শহরের ভেতর প্রবেশ না করেই যাত্রীরা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবেন। তাদের যানজটের দুর্ভোগ পোহাতে হবে না। রাজধানীর অভ্যন্তরে যাত্রী প্রবেশ না করায় শহরের যানজটও কমবে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সার্কুলার রেলপথের ৭০ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে এলিভেটেড (উড়াল)। বাকি ৯ দশমিক ৯ কিলোমিটার রেলপথ হবে পাতাল। প্রস্তাবিত এ রেলপথে ২৪টি স্টেশন হবে। এর মধ্যে ২১টি এলিভেটেড এবং তিনটি হবে পাতাল। ১১টি স্টেশন যুক্ত হবে মেট্রোরেলের সঙ্গে। একটি যুক্ত হবে সদরঘাটের সঙ্গে। সার্কুলার রেলপথ নির্মাণে ৮ দশমিক ৩৭ কোটি বিলিয়ন ডলার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা টাকার হিসাবে ৭১ হাজার কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এর মধ্যে ৪ দশমিক শূন্য ৬৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে শুধু রেলপথ নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিতে। অন্যান্য খরচ যাবে ১ দশমিক ২৯৩ বিলিয়ন ডলার। ট্রেন কেনায় অর্ধবিলিয়ন ডলার এবং রেলপথ নির্মাণে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বাকি খরচ ধরা হয়েছে পরিচালনা ও বিবিধ ব্যয়ে। নির্মাণকাজ শুরুর পর ছয় বছর সময় লাগবে সার্কুলার রেলপথ তৈরিতে। তবে কবে নাগাদ সার্কুলার রেলপথের কাজ শুরুর পর্যায়ে রেলওয়ে পৌঁছাতে পারবে, তা নিশ্চিত নয়।

 

 

 

 

 

advertisement