advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে মাতৃভাষার প্রচলন অপরিহার্য

প্রদীপ্ত মোবারক
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২২:৫৮ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২২:৫৮
advertisement

যেকোনও জাতির জন্য তার মাতৃভাষা বিশাল গুরুত্ব বহন করে। গুরুত্ব কতটা তার প্রমাণ ১৯৫২ সালের রক্ত ঝরানো ভাষা আন্দোলন। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলার তরুণরা মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব-পতাকা ওড়াচ্ছে বিশ্বময়। মাতৃভাষাকে ভালবেসে বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মদানে সিক্ত আমাদের বর্ণমালা। একুশ শব্দটি তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়, একুশ বাঙালির আত্মপরিচয় আর অহংকারেরও প্রতিচ্ছবি। মানুষের মনের ভাব, আনন্দ-বেদনা, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা সবকিছু স্বদেশী ভাষা তথা মাতৃভাষাতেই যথার্থভাবে প্রকাশিত হয়। তাই যেকোনো জাতির সামগ্রিক উন্নয়নে সর্বস্তরে সে জাতির মাতৃভাষার প্রচলন অপরিহার্য।

আমি মনে করি সর্বস্তরে বাংলা চালু শুধু আবেগের বিষয় নয়, দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সঙ্গেও এটি সম্পৃক্ত। গণতান্ত্রিক রীতিপদ্ধতি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে অফিস-আদালত ও জনতার ভাষার মধ্যে সাযুজ্য থাকা জরুরি। বিচার প্রার্থী সাধারণ মানুষ আদালতের ভাষা বুঝতে না পেরে অতিরিক্ত খরচ ও হয়রানির স্বীকার হয়, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক একই রকমভাবে, বিদেশি ভাষায় বর্ণিত জ্ঞান কিংবা রচিত গ্রন্থ যতই মূল্যবান ও তথ্য সম্বলিত হোক না কেন তা নিতান্তই অর্থহীন, যদি তা মাতৃভাষায় অনূদিত হয়ে শিক্ষার্থীর মস্তিষ্কে না পৌছায়। অর্থাৎ উপলব্ধির জন্য শেষ পর্যন্ত মাতৃভাষার সাহায্য নিতেই হয়। শুদ্ধ স্বদেশি সাংস্কৃতিক চর্চা ও উন্নয়ন, একটি আত্মনির্ভরশীল ভাষাগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্বের বুকে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার অতিব জরুরি। সর্বোপরি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্বল্প ব্যবহৃত জগাখিচুড়ি বাংলা ভাষা নয়, একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত ভাষা রেখে যেতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করতে হবে এখনই।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, আমি ঘোষণা করছি আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পায় বাংলা। সমগ্র বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা এখন সমাদৃত। এ ভাষার মর্যাদা আজ পৃথিবীজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। জাতিংসঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী ২১ ফেব্রুয়ারি তথা শহিদ দিবস “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে’র মর্যাদায় অভিষিক্ত। বাংলা ভাষা ও ভাষা শহিদের সম্মানে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর সংস্থাটি এ ঘোষণা দেয়। মাতৃভাষা সংগ্রামের ইতিহাস জাতি হিসেবে যেমন আমাদের গর্বিত করেছে তেমনি অন্যদেরকে করেছে অনুপ্রাণিত। মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার জন্য এমন আত্মোৎসর্গের ইতিহাস সত্যিই বিরল।

আইন-আদালত সংক্রান্ত পরিভাষার জটিলতা সর্বস্তরে মাতৃভাষার ব্যবহারে ক্ষেত্রে প্রধানতম অন্তরায় বলে মনে করা হয়। বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিষয়ক পরিভাষার অভাবকে ও এক্ষেত্রে দায়ী করা হয়। অথচ চীন-জাপান তাদের চিত্রলিপির দুর্ভেদ্য ভাষা দিয়েই উচ্চশিক্ষায় জায়গা করে নিয়েছে। চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এমনকি প্রতিবেশী নেপালেও তাদের নিজস্ব ভাষায় আদালত চলছে। খোদ বাংলাদেশেও কতিপয় ভাষাপ্রেমিক বিদ্বান বিচারপতি আদালতে পুরোপুরি বাংলা ভাষা ব্যবহারের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মহান ভাষা দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করেন বিচারপতি এবাদুল হক। এরপর বিচারপতি আব্দুস সালাম ও বিচারপতি খায়রুল হক বাংলা ভাষায় রায় প্রদান করে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার মর্যাদাকে সু-উচ্চে তুলে ধরেন। উচ্চ আদালতে সর্বাধিক বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে অমর হয়ে আছেন চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান শ্রদ্ধেয় বিচারপতি আব্দুস সালাম মামুন। এছাড়া বিচারপতি মোহাম্মদ হামিদুল হক, বিচারপতি আব্দুল আওয়াল, বিচারপতি মোহাম্মদ আবু তারিক, বিচারপতি এস. এম জিয়াউল করিম প্রমুখের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বেশকিছু পরিভাষা পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। আইন-আদালত ও উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলা প্রচলনের কার্যকরী উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় বাংলা আইন শব্দকোষ রচিত হয়েছে। বর্তমান কথোপকথন, সংবাদপত্র ও পাঠ-পুস্তুকসহ প্রায় সর্বক্ষেত্রেই চলিত ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধুমাত্র অফিস-আদালতে সাধু ভাষার ব্যবহার এখনও রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রেও চলিত ভাষার প্রচলন হলেও বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও বৃদ্ধি পাবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও ভাষার সার্বিক উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ কিছু সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শুদ্ধ উচ্চারণ ও বাচিক উৎকর্ষের পাশাপাশি এসব সংগঠন বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে সমস্যা ও তা থেকে উত্তরণের জন্য ভাষাসৈনিকসহ দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীগণ দিকনির্দেশনামূলক সুপারিশ ও মতামত প্রদান করেছেন। নিম্নে কতিপয় সুপারিশ ও মতামত তুলে ধরা হল। বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন না হবার পেছনে রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং সরকারি উদ্যোগহীনতাকেই দায়ী মনে কনেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। স্কুল-মাদ্রাসায় ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থার এই বিভাজনও তাঁর মতে সমভাবে দায়ী। এ থেকে উত্তরণের জন্য তিনি বলেন- “সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রচলন করতে হবে। একই দেশে তিন ধরণের শিক্ষা পদ্ধতি নয়, ধনী-দরিদ্র সবার জন্য একধরণের শিক্ষা চালু করতে হবে। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় প্রচুর সাহিত্য লেখা ও গবেষণা করতে হবে যাতে ভাষা আরো সমৃদ্ধ হয়। সব ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহারে সবচেয়ে বড় বাধা হীনমন্যতা। এমন কিছু নেই যা বাংলায় প্রকাশ করা যায় না। তারপরও দীর্ঘ চেষ্টার পর সব ক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন করা যায়নি। এমন মন্তব্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের। আহমদ রফিকের মতে, সর্বক্ষেত্রে বাংলা প্রচলন না হওয়ার পেছনে শ্রেণিস্বার্থ দায়ী। ভাষা সৈনিক সুফিয়া আহমেদ মনের করেন, বাংলা একাডেমি বা এ ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক যতটা কাজ করা উচিত ততটা করছে না।

শিক্ষাবিদ, গবেষক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁর বাংলা ভাষাসংক্রান্ত গবেষণায় বাংলা ভাষার যে আদি গবেষকের কথা বলেছেন, তাকে আলোচনায় আনতে হবে। বাংলা ভাষার ইতিহাসের যথার্থতা অনুসন্ধান করতে হবে। শহীদুল্লাহর এই গবেষণাকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারলেই বাংলা ভাষার যথাযথ সম্মান, মর্যাদা এই জাতি রক্ষা করতে পারবে বলে আমি মনে করি।

বাংলা ভাষার যথাযথ মর্যাদা রক্ষা না করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এটাকে আমরা ইংরেজি তারিখে পালন করি। অন্তত এই একটি দিন অর্থাৎ ৮ ফাল্গুনকে যদি আমরা বাংলা তারিখে পালন করতাম, তাহলে কিছুটা হলেও এর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা যেত বলে আমি মনে করি। বাংলা ভাষার জন্মদিন বাংলা তারিখেই হওয়াটা যথাযথ বলে আমি মনে করি।

অমর একুশের চেতনা বাঙালি জাতির কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বুকের রক্ত দিয়ে গেছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ আরো অনেকে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষা। আন্তর্জাতিকভাবে আজ এই ভাষা স্বীকৃত। আজ আমাদের ভাষা দিবস বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়, যথাযোগ্য মর্যাদায় উদ্‌যাপিত হয়। এর চেয়ে গৌরবের আর কী থাকতে পারে। কিন্তু আমরা এখনো এই ভাষার মর্যাদা যথাযথভাবে দিতে পারিনি। ১৯৮৭ সালে দেশে আইন করা হয় যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজির ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদা নষ্ট করে দিচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে তা মোটেই সুখকর নয়। এখনো দেশের বিজ্ঞজনদের অনেকেই সভা-সমিতিতে ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করেন। তাঁদের কথা যে সবাই বুঝতে পারছে না, সেটা জেনেও তাঁরা তা করেন। এর মাধ্যমে আমাদের চেতনার মধ্যে ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। বছরের এই একটিমাত্র দিনে আমরা বাংলা ভাষার মর্যাদা, ভাষাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা নিয়ে অনেক কথা বলে থাকি। শহীদ মিনার রং করি, আলপনা আঁকি, শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রভাতফেরি করি। আর সারা বছর এর কোনো সম্মান রক্ষা করি না।

আমরা চাই যাঁদের জন্য আমরা এই মায়ের ভাষার প্রতিষ্ঠা পেয়েছি তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে। আর বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে ব্যবহার ও প্রয়োগ করা নিয়ে হাইকোর্টের যে সিদ্ধান্ত, সেটাও প্রয়োগ করার দিকে নজর দিতে হবে। ভাষা শহিদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষা ও বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন অপরিহার্য।

 

লেখক : প্রদীপ্ত মোবারক

(কবি ও গবেষক)

advertisement
Evaly
advertisement