advertisement
advertisement
advertisement
DBBL
advertisement
advertisement

মেধার বিচার কেবল পরীক্ষার ফল দিয়ে হয় না

সজীব সরকার
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৭:১৬ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২১:২২
advertisement

অভিভাবকেরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের মেধা যাচাই করেন কেবল পরীক্ষায় নম্বর প্রাপ্তির মানদণ্ডে। ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড ইত্যাদি না হলে সন্তানকে ‘গাধা’ মনে করা হয়। এজন্যে অবশ্য একতরফাভাবে শুধু অভিভাবকদেরই দায়ী করা চলে না; আমাদের দেশের সার্বিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাই পরীক্ষার ফলনির্ভর।

কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলে, মানুষের মেধা এমন একমুখী নয়; কেবল বইয়ের পড়াশোনা আর পরীক্ষায় ভালো ফল করা ছাড়া মানুষের বুদ্ধিমত্তা বিচারের আরও অনেক দিক রয়েছে। সব মানুষের মস্তিষ্ক একভাবে কাজ করে না; একেকজনের মেধা-দক্ষতা-ঝোঁক একেকরকম। দর্শন বা পুরোনো শাস্ত্রগুলোও সবসময় এমনটিই বলেছে। তাই, শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে মানুষের মেধা যাচাই করা ভুল।

আ হিমালয়ান ট্রিনিটি (২০০৩) বইয়ে গ্রন্থকার মার্ক অলিভার দেখিয়েছেন, মানুষের মেধা বা বুদ্ধিমত্তা ৪ রকমের : এক. আইকিউ বা সাধারণ বুদ্ধিমত্তা, দুই. ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, তিন. ফিজিক্যাল ইন্টেলিজেন্স বা শারীরিক বুদ্ধিমত্তা, এবং চার. স্পিরিচুয়াল ইন্টেলিজেন্স বা আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা। স্টিফেন কোভি ও ডানাহ জোহার তাদের পৃথক গবেষণাতেও বুদ্ধিমত্তার এমন বৈচিত্র্যের প্রমাণ পেয়েছেন।

হাওয়ার্ড গার্ডনার তার ‘ফ্রেমস অব মাইন্ড : দ্য থিওরি অব মাল্টিপল ইন্টেলিজেন্স’ (১৯৮৩) বইয়ে ৯ ধরনের বুদ্ধিমত্তার কথা উল্লেখ করেছেন : এক. স্প্যাশাল (স্থানিক বা ব্যাপন-স্থল সংক্রান্ত), দুই. ন্যাচারালিস্ট (প্রকৃতি বিষয়ক), তিন. মিউজিক্যাল (সঙ্গীত বিষয়ক), চার. লজিক্যাল-ম্যাথামেটিক্যাল (যৌক্তিক-গাণিতিক), পাঁচ. এক্সিসটেনশিয়াল (অস্তিত্ব-সম্বন্ধীয়), ছয়. ইন্টারপারসোনাল (আন্তঃব্যক্তিক), সাত. বডিলি-কাইনেসথেটিক (কায়িক), আট. লিঙ্গুইস্টিক (ভাষাগত), এবং নয়. ইন্ট্রাপারসোনাল (অন্তর্ব্যক্তিক)। কেউ কেউ ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতাকে বুদ্ধিমত্তার ভিন্ন আরেকটি ধরন বলে মনে করেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুধু বই পড়া আর পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই তাকে মেধাবী মনে করা আর তা করতে না পারলে তাকে মেধাহীন ভাবাটা ভুল। মনে রাখতে হবে, সবার মস্তিষ্ক একভাবে বা একদিকে কাজ করে না; মানুষের পছন্দ বা আগ্রহ ও দক্ষতার ক্ষেত্র ভিন্ন। এজন্যেই কেউ ডাক্তার হয়, কেউ পুলিশ হয়, কেউ শিক্ষক হয়, কেউ আইনজীবী হয়, কেউ ব্যবসায়ী হয়। কেউ শিল্পী হয়, কেউ বিজ্ঞানী হয়। কেউ খেলোয়াড় হয়, কেউ নভোচারী হয়। প্রত্যেকের মেধা বা দক্ষতার ক্ষেত্র আলাদা; বিষয়টি হলো, নিজের আগ্রহ বা কাজের ক্ষেত্রে সে কতটা ভালো করছে আর কতটা ভালো করা দরকার।

বিজ্ঞানী আইনস্টাইন মেধাবী; তাই বলে গাইয়ে লতা মঙ্গেশকর মেধাহীন নন। কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির বিচারে মেধা মাপতে গেলে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা বিল গেটস-কেউই মেধাবী নন। আমাদের লোকজ সঙ্গীতসাধক লালন ফকির অথবা গাঁয়ের সেই আরজ আলী মাতুব্বর কোনো পড়ালেখাই করেননি; তাই বলে তাদের মেধাহীন বলার কোনো কারণ বা সুযোগ আছে কি? শচীন টেন্ডুলকার বা আমাদের দেশের সাকিব-মাশরাফিরা কি মেধাবী নন? একজন শিল্পী অর্থাৎ যিনি বাঁশি বাজান বা ছবি আঁকেন, তিনি কি মেধাবী নন?

আমাদের সমাজে মেধার বিচার কেবল ‘ভালো ছাত্র’ আর ‘খারাপ ছাত্র’ হিসেবে; এই ভ্রান্ত মূল্যায়ন থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। যে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, তার জীববিজ্ঞান বোঝা দরকার; কিন্তু তার পক্ষে পরীক্ষায় বাংলা সাহিত্যে আশি-নব্বই পাওয়া খুব জরুরি কি? যে বড় হয়ে গাইয়ে কিংবা আঁকিয়ে হবে, সে অঙ্কে অন্তত আশি নম্বর না পেলে তাকে ‘গাধা’ বলা চলে কি? যে বড় হয়ে সফল ক্রীড়াবিদ হবে, তার জন্যে পরীক্ষায় ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া কি খুব জরুরি?

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশেরই এমন অনেক ব্যক্তির কথা আমরা জানি, যারা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কোনো ডিগ্রি নিতে পারেননি বা নেননি অথচ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়া ‘মেধাবীরা’ ওই ব্যক্তিদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানের চাকুরে! তাহলে মেধার সংজ্ঞা আসলে কী?

কে ডাক্তার হবে, কে প্রকৌশলী হবে, কে শিল্পী হবে, কে বিজ্ঞানী হবে, কে ক্রীড়াবিদ হবে-ইত্যাদি বিবেচনায় তাকে সেজন্যে প্রয়োজনীয় বিষয়ে অবশ্যই যথেষ্ট ভালো জানতে হবে। পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া বা ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হওয়া সব পেশার জন্যে জরুরি নয়। আর ক্লাসে ফার্স্ট-সেকেন্ড হলেই সে ওই কাজে ভালো করবে, এটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান যদি নিশ্চিত করা যায়, সেটিই আসলে যথেষ্ট; এতেই শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষার মৌলিক সুফল ভোগ করতে পারবে। আর শিক্ষাব্যবস্থা এমন হওয়া দরকার যেখানে শিক্ষার্থীদের কার, কোনদিকে আগ্রহ ও মেধা রয়েছে, সেটি খুঁজে বের করা সহজ হবে এবং ওই অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের শুরু থেকেই প্রস্তুত করে তোলা হবে।

মনে রাখতে হবে, সবাই আইনস্টাইন-চমস্কি-অমর্ত্য সেন হবে না আর তা না হলেই তাকে ‘মেধাহীন’ বলা যাবে না; কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-লালন-স্টিভ জবস-আব্রাহাম লিংকন কিংবা লতা মঙ্গেশকর হবে। এঁরা কেউই মেধাহীন নন; কোনো বিচারেই না।

সম্প্রতি টিভির একটি বিজ্ঞাপনচিত্রে বাবাকে বলতে শোনা যায়, ‘জিপিএ ৫ পেলি না, আমি কি তোকে কম খাওয়াই?’ সন্তানের প্রতি মায়ের প্রশ্ন, ‘জিপিএ ৫ পেলি না, আমি এখন ভাবিদের কাছে মুখ দেখাবো কী করে?’ আমাদের দেশে যুগে যুগে বাস্তবের চিত্র আসলে এমনই; পাবলিক পরীক্ষার ফল বেরোলে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর বাসায় মিষ্টি কেনার ধুম পড়ে যায় আর ফেল করা শিক্ষার্থী গলায় দড়ি দেয়।

পরীক্ষার ফল নিয়ে সন্তানের ওপর অভিভাবকদের এই চাপ কেবল ভুলই নয়, রীতিমতো অন্যায়ও বটে।

লেখক : সজীব সরকার : সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠাতা : মিডিয়াস্কুল ডট এক্সওয়াইজেড।

advertisement